ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

সেদিন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসছিলাম ‘সোনার বাংলা’ট্রেনে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আমার নিয়মিত যাতায়াত থাকলেও বিরতিহীন ‘সোনার বাংলা’ট্রেন-এ এটা ছিল প্রথম যাত্রা। এর কারণ অবশ্যই এই ট্রেনটির অসুবিধাজনক সময়সূচী আর শনিবার-এ ট্রেনটির সাপ্তাহিক বিরতি অথচ এদিনই ঢাকামূখী মানুষের চাপ থাকে বেশি যেহেতু রবিবার থেকে অফিস। বৈশাখ মাসের প্রচন্ড দাবদাহে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্নিগ্ধা বা শোভন চেয়ার-এ টিকেট না পেয়ে বাধ্য হয়ে টিকেট করেছিলাম প্রথম শ্রেণীর। তিনজনের আসন বিশিষ্ট একটিকেবিন-এ তিনজন যাত্রী। কেউ কারো পরিচিত নয়। প্রথম শ্রেণী হলেও নন-এসি বগি। ফ্যান চললেও প্রচন্ড গরম পড়ছিল। তারওপর লক্ষ্য করলাম, উত্তর দিকের জানালার শাটার খোলা যায় না। উপস্থিত এ্যাটেনডেন্টকে বলার পর তিনিও চেষ্টা করে সেই জানালা-শাটার খুলতে পারলেন না।

যা হোক, বিকাল ৫টায় ঠিক নির্ধারিত সময়েই চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে নতুন সবুজ রঙের ট্রেনটা ছাড়ল। ট্রেন ছাড়ার মিনিট পাঁচেক পরেই কেতাদুরস্ত এক তরুণ এসে টিকেট চাইলেন। রুমে তিনজন যাত্রী ছিলাম। একে একে সবার টিকেট দেখে, দাগ দিয়ে টিকেট ফেরত দেওয়ার সময় দিল একটা করে ফুড বক্স ও হাফ লিটার পানি যা ছিল টিকেটের সাথে কমপ্লিমেন্টারি। বাহ্, বেশতো! দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

তিন যাত্রী টুকটাক কথাবার্তা বলছিলাম। রুমে ২ টি ফ্যান চলছে কিন্তু তাপদাহও প্রবল। প্রচন্ড গরম। প্রায় আধঘন্টা পর এ্যাটেনডেন্ট এসে আমাদের কাছে জানতে চাইলেন, স্যার, কোন সমস্যা নেই তো? মুগ্ধতার পালা। বাংলাদেশ রেলওয়েতে ভ্রমণ করছিতো! বললাম, না কোন সমস্যা নেই তবে সেই জানালা খোলার কোন ব্যবস্থা করতে পারলে ভাল হতো। প্রয়োজনে ট্রেনের টেকনিশিয়ানের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। তিনি চলে গেলেন। প্রায় ১০/১৫ মিনিট পর সেই এ্যাটেনডেন্ট আবার এসে বললেন, পাশের বগিতে এসি কম্পার্টমেন্টে একটা রুম খালি আছে, চাইলে আপনারা সেখানে চলে আসতে পারেন। তৎক্ষণাত এক যাত্রী খুব একসাইটেড হয়ে বললেন, খুবই উত্তম প্রস্তাব, যাওয়া যাক বলেই তিনি উঠতে চাইলেন। আমি ও অপর যাত্রী কিছুটা দ্বিধান্বিত। ঠিক তখনই সেই এ্যাটেনডেন্ট বললেন, আপনারা কি তিনজন এক সাথে? পূর্ব পরিচিত না হলেও বললাম, হ্যাঁ। একসাথে যেতে চাই। এবার চমক দিলেন এ্যাটেনডেন্ট। তিনজনই যান বা একজন, পুরো কেবিনটাই পাবেন যা তিনজনের জন্য। এজন্য মোট বারোশত টাকা লাগবে মানে জন প্রতি চারশত টাকা।

চুপসে গেলেন সেই উৎসাহী যাত্রী যিনি সবার আগেই চাইছিলেন ট্রান্সফার হতে। আমরা কেউ আর আগ্রহ দেখালাম না অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সিট চেঞ্জ করার জন্য। ইতোমধ্যে ট্রেন ফেনী স্টেশন অতিক্রম করল। সেই এ্যাটেন্ডডেন্ট একজনকে বললেন, জনপ্রতি তিনশত করে নয়শত টাকা দিলেই তিনি এসি বগিতে সিট ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করে দেবেন। একজন যাত্রী বললেন, নাহ! প্রচন্ড গরম পড়ছিল তাই একজন যাত্রী বললেন, দুইশত করে দেব তাছাড়া অলরেডি ফেনী ক্রস করে এসেছি। এ্যাটেনডেন্ট চলে গেল। আমাদের মধ্যের একজন যাত্রী গিয়ে সেই রুম-সিট কোথায় দেখে আসলেন – যা ছিল পাশের বগিতেই।

কিছুক্ষণ পর আবার এসে এ্যাটেনডেন্ট বলল, আপনার যে যাচ্ছেন না পরে কিন্তু পস্তাতে হবে, আফসোস করবেন। সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। গরমের মাত্রাও যেন কিছুটা কমে আসছিল। যাই হোক ট্রেন সম্ভবত লাকসাম ষ্টেশন পার হয়ে কুমিল্লার কাছাকাছি। দক্ষিণ দিকের খোলা জানালা দিয়ে সুড়সুড় করে ঢুকছিল পোকার ঝাঁক। উপায়? জানালা লাগাতে হবে। জানালার উপর বড় করে লেখা – জানালার সাটার খোলা বা নামানোর জন্য কর্তব্যরত এ্যাটেনডেন্টের সহায়তা নিন। আশপাশ খুঁজেও এ্যাটেনডেন্টের দেখা মিলল না। নিজেরা মিলে বেশ কসরত করে মাঝের নেটের শাটারটা ফেলে দিলাম। পোকা আসা বন্ধ হলো। তখন আমরা বুঝলাম কেন সেই এ্যাটেনডেন্ট বলেছিল, পরে কিন্তু পস্তাতে হবে, আফসোস করবেন।

ট্রেন আখাউড়ার কাছাকাছি আসতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো যা বিরামহীনভাবে চলছিল। বেশ ঠান্ডা বাতাস বইতে লাগল এবং স্বভাবতই সেই তীব্র গরম তখন উধাও। সেই এ্যাটেনডেন্টকেও আর দেখা যায়নি। ট্রেনের ষ্টাফদের সার্ভিস নিয়ে যাত্রা শুরুর প্রথম দিককার মুগ্ধতাও উধাও। আমাদেরও আর জানা হয়নি সেই এ্যাটেনডেন্ট সেই রুম পরে অন্য কারো কাছে দিয়েছিলেন কিনা। আর এই যে বাড়তি টাকাটা তা নিশ্চয় রেল কর্তৃপক্ষ পায় না। তাদের পকেটেই যায়। আর সাধারণ যাত্রী কষ্ট করে লাইনে দাঁড়িয়েও ট্রেনের টিকেট পায় না বলে বিকল্প পথ বাসে ভ্রমণে বাধ্য হয় আর রেলওয়ে বছর বছর লোকসান গুনে।

ও হ্যাঁ, সেই ফুড বক্সের ব্যাপারে একটু বলি। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেল সৈকতের ফুড বক্সে ছিল, ১টি আপেল, ১ টি স্যান্ডউইচ, ১টি কাটলেট, ১টি চিকেন ফ্রাই ও ১ টি টিস্যু। হাফ লিটার পানিতো ছিলই। কাটলেট পাথরের মত শক্ত হয়ে ছিল যা ছিল পুরো খাওয়ার অযোগ্য। টিকেটের সাথে বাড়তি পয়সা নিয়ে যাত্রীদের জোরপূর্বক এই খাবার না দিলেন কি নয়?

রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে ট্রেনটি মাত্র পৌণে ৫ ঘন্টায় ঢাকার এয়ারপোর্ট এসে থামল। ধন্যবাদ রেলওয়ে এক্ষেত্রে পেতেই পারে। যাত্রীদের মধ্যে অসাধারণ অনুভূতি! এত দ্রুত চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা!! অথচ যানজট (বিশেষত ইপিজেড এলাকার) ঠেলে চট্টগ্রাম এয়ারপোর্ট থেকে নিউমার্কেট এলাকায় পৌছাতেই লেগে যায় প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘন্টা !