ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

আজ দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ‌‌‌’ভণ্ড পীরের কাণ্ড’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত সংবাদে বলা হয়েছে, বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় মুরিদের বাড়িতে দাওয়াত খেতে গিয়ে কথিত পীর খোকা মিয়া (৮০) ধর্ষণের অভিযোগে এখন কারাগারে। গাবতলীথানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের ভাষ্যমতে, উপজেলার কামারচট্ট গ্রামের খোকা মিয়ার এলাকায় বহু ভক্ত ও মুরিদ রয়েছে।কয়েক দিন ধরে তিনি ভক্তদের বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে বেড়াচ্ছিলেন। গত ৪ জুন গাবতলী উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের একটি গ্রামে এক মুরিদের বাড়িতেজিকিরের আসর বসার কথা ছিল। এ উপলক্ষে তিনি সকালে ওই মুরিদের বাড়িতেদাওয়াত খেতে যান। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর বিশ্রামের জন্য একটি ঘর চান তিনি। ভক্ত অন্ধবিশ্বাসে নিজের ঘরেই বিছানা পেতে দেন। তিনি বিশ্রামে গেলেবাড়ির লোকজন নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই সুযোগে তিনি গৃহকর্তার চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া ৯ বছর বয়সী নাতনিকে ঘরে ডেকে নেন এবং তাকে ধর্ষণ করেন। শিশুটির আর্তচিৎকারে লোকজন ছুটে এসে শিশুটিকে উদ্ধার এবংবগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। আর খোকামিয়াকে গাছের সঙ্গে বেঁধে গণধোলাই ও মাথা ন্যাড়া করে দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেন।
আমি সংবাদটি পড়ে খুবই মর্মাহত হয়েছি। ৮০ বছরের বৃদ্ধা ভণ্ড পীর অবুঝ ও নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণ করেছে। এটি যে জাগ্রত বিবেক শুনবে তার হৃদয় ব্যথিত হবে। এ বিষয় নিয়ে নিচে আলোকপাত করা হলো।

নাঈমা জাহান (ছদ্মনাম) একজন কিশোরী। বাবা চাকুরিজীবী এবং মা গৃহিনী। বাপ-দাদা পূর্ব পুরুষের নিয়ম চলে আসছে পীরকে সম্মান করা। পীরের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। মাঝে-মধ্যে পীর সাহেব তাদের বাড়িতে আসে। বাড়িতে আসলে মা ও সে ভক্তের কদর না করেই পারে না। রান্না-বান্না সেরে পীর বাবার সেবা শ্রশুষা করতে ব্যস্ত থাকে। পীরের হাত-পা টিপে দেওয়া, বাতাস করা ও মজাদার খাবার প্রদান করা যেন পূর্ণের কাজ। বাবা চাকুরি করে সংসারের তেমন খবর নিতে পারে না। তাছাড়া অন্ধবিশ্বাস অন্তরে ঢুকে পড়েছে। পীর বাবার কদর করলে বহুত ফায়দা হবে। পীর বাবাও মাঝে মধ্যে নাঈমার শরীরে হাত বুলায়। নাঈমা লোক লজ্জার ভয় ও মা কর্তৃক পাওয়া পীরকে কিভাবে অসম্মান করবে ভেবে কূল পাচ্ছিল না। তবুও মাঝে মধ্যে বিরক্ত প্রকাশ করতো। একদিন তার মাকে বলে যে, আমি তোমার পীর বাবার সেবা করতে পারবো না। মা বলল, এ কথা মুখ দিয়ে আর কোন দিন বের করো না। পীরকে সম্মান করলে এ জীবনে উপকৃত  হতে পারবে অন্যদিকে আখিরাতেও নাজাত পাবে। একদিন সে তার বাবার সামনে ঘটনাটি খুলে বলে। বাবা পীরকে বাড়ি থেকে স্ব-সম্মানে বের করে দেয়। এরপর থেকে কোন দিন সে পরিবারে কোন পীর আসতে পারেনি। কিন্তু কোন শাস্তি দেওয়া হয়নি পীরকে লোকলজ্জার ভয়ে। বেশ কয়েক বছর আগে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতীতে থানা পুলিশ ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালি থানার গোপদিয়া গ্রামের সাইফুল ইসলাম (৩৫) নামের এক ভণ্ড পীরকে গ্রেফতার করে। এ সংবাদ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছিল।

ভণ্ডপীর সংশ্লিষ্ট এলাকায় রাকিবুল হাসান ওরয়ে রোকনের বাসায় আত্মীয়তার সুবাদে বেশ কিছু দিন যাবত অবস্থান করছিলো। সেখানে এক মহিলা দালালের মাধ্যমে বাসার পার্শ্ববর্তী গোল্ডেন হাইস্কুলের মেসের ছাত্রীদের পীরের তরিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করে। ওই ভন্ডপীর ছাত্রীদের বাইয়াত গ্রহণ করে কারো কাছে না বলার জন্য সতর্ক করে দেয়। পীরের কোন কথা বললে তি হবে। এ সব কথা বলার পর ভন্ড পীর তার হাত পা টিপে দেওয়ার জন্য ছাত্রীদের বলে। এমনকি অসামাজিক কর্মকান্ডের প্রস্তাব দেয়। ছাত্রীরা এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করে স্কুল শিকদের জানায়। পরে শিকরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানা পুলিশকে জানালে পুলিশ ভণ্ড পীরকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়।

এ ধরনের ঘটনা দেশে ঘটেই চলেছে। যা মিডিয়ায় প্রকাশিত হয় না। অন্য দিকে গ্রামের মানুষ নিজেদের মান ইজ্জতের ভয়ে ঘটনাটি প্রকাশ করে না। আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগেও গ্রাম-গঞ্জের মানুষ কুসংস্কার থেকে বের হতে পারে নি। পীরের নাম শুনলে দল বেঁধে যায় পীরের নিকট চিকিৎসা ও আগাম ভবিষৎবাণীর জন্য। এতে ভন্ডপীর বাবা সুন্দরী নারী দেখলে নানা ভাবে যৌন হয়রানি করে থাকে। অনেক নারী লোক লজ্জার ভয়ে তা বলতে পারে না। অথচ ওই ভণ্ড পীরদের অধিকাংশ ধর্মীয় জ্ঞান সম্বন্ধে অজ্ঞ। নামায পড়ে না। রোজা রাখে না। শুধু গাঁজা খায়। গান গায়। তাবিজ কবজ বিক্রি করে অনেক টাকা হাতিয়ে নেয়। ওরস শরীফ ও দরবার তৈরীর নামে অনেক টাকা কথিত ভক্তদের নিকট থেকে বিভিন্ন কায়দায় নিয়ে থাকে। বেশির ভাগই ঠকে নারীরা। তৃণমূল পর্যায়ের কতই না নারী কথিত পীরদের হাতে প্রতিদিন বিভিন্ন কায়দায় নির্যাতিত হচ্ছে। এসব খবর কে রাখে? আর নারীরা তো অসহায়। একদিকে নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করলে স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার ভয় রয়েছে। অন্যদিকে ভণ্ডপীরের ভক্তরা ওই নির্যাতিত নারীকেই উল্টো ভৎসনা করবে। এমনকি প্রাণেও মেরে ফেলতে পারে। ভণ্ড পীরদের ভক্তের অভাব নেই। রাজনীতিবিদ থেকে ধনাঢ্য পরিবারের অনেক মানুষ ভণ্ডপীরদের শ্রদ্ধা ও ভক্তি করে । ভণ্ডপীরেরা অনেক সময় বিভিন্ন নামে সমিতি ও সংস্থা গঠন করে ভক্তদের নিকট থেকে অনেক টাকা হাতিয়ে নেয়। ২৪ মার্চ ২০০৮ ইং তারিখে ঢাকা রিপোটার্স এসোশিয়সনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ৩০ জন প্রতারণার শিকার নারী লালবাগের তথাকথিত পীর রেশমা ও তার সহযোগীদের গ্রেফতারের দাবি জানান এনজিওর নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে। (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫ মার্চ ২০০৮)।

আমরা কাজী ইমদাদুল হক রচিত ‘আবদুলাহ’ উপন্যাসে সে যুগের ভণ্ড পীরদের বাস্তব চিত্র দেখতে পাই। এ যুগেও সে সময়ের চিত্র ফুটে ওঠছে। বর্তমানে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ভণ্ড পীরদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অথচ মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআন শরীফে স্পষ্ট বলেছেন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত বন্দেগি করবে না। কারো মুখাপেক্ষি হবে না।

সাধারণ মানুষকে এ ভণ্ড পীরের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রয়োজনে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা গণ নাটক ও ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে ভণ্ড পীরের কুফল সম্বন্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পারে। মসজিদের ইমামগণও জুমআর নামাযের খুতবার সময় এ বিষয়ে বক্তব্য রাখতে পারে ন। আসুন আমরা সবাই এ বিষয়ে এক যোগে কাজ করি। সকলকে মনে রাখতে হবে, এদেশে ভণ্ড পীরদের কোন স্থান নেই।এদেশের মানুষ ধর্মভীরু, ধর্মান্ধ নয়।

আজমাল হোসেন মামুন

(ব্লগার ও সিটিজেন সাংবাদিক)

সহকারী শিক্ষক
হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।