ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

 

বাংলাদেশে মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী। আমাদের দেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ প্রতিবন্ধীর মধ্যে ৭০ লাখ প্রতিবন্ধী নারী রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ বিবাহযোগ্য প্রতিবন্ধী নারী রয়েছে।
জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নারীদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্খা হচেছ একজন সুন্দর পাত্রের সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং সন্তানের মা হবার । ফলে প্রতিবন্ধী নারীরাও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এই স্বপ্ন একসময় আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপের মত থাকলেও, বিভিন্ন প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলোর সচেতনতা মূলক কার্যক্রমের ফলে সমাজের পূর্বের সেই চিন্তাধারার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। অনেক যোগ্য প্রতিবন্ধী নারীর বিয়ে হয় যোগ্য পাত্রের সাথে বটে। কিন্তু যৌতুকের জন্য শশুর, শ্বাশুড়ি,ননদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। অনেক প্রতিবন্ধী নারীর ঘরও ভেঙ্গে যায়। আবার অনেকে সামাজিক কুসংস্কার ও পরনির্ভরশীলতাসহ নানা বাঁধা অতিক্রম করে আত্নপ্রত্যয়ে বলিয়ান হয়ে স্বামীর সংসার করছে। নিম্নে শুনা যাক বিবাহিত কিছু প্রতিবন্ধী নারীর কেস স্টাডি :

(ওদের নাম প্রকাশের অনুমতি না পাওয়ায় প্রকৃত নামের পরিবর্তে ছদ্মনাম ব্যবহার করলাম তবে ঘটনাগুলো সত্য)

কেস-স্টাডি-১:মোসাঃ আলেয়া (ছদ্মনাম) একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী। আকর্ষনীয় চেহারা ও মিষ্টি ভাষী এই প্রতিবন্ধী নারী হুইল চেয়ারে চলাফেরা করে। বর্তমানে একটি বে-সরকারি সংস্থায় ফ্রন্টডেক্স এ্যাসিসটেন্ট হিসেবে কর্মরত। তার বিয়ে হয়েছে একজন অপ্রতিবন্ধী সুদর্শন ডিপে¬ামা ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের সাথে। তিনি জানান- স্বামী, শশুর, শাশুড়িসহ পরিবারের সকলেই তাকে খুব ভালোবাসে। তিনি আরো জানালেন, আজকাল প্রতিবন্ধী নারীদের অপ্রতিবন্ধী যোগ্য পাত্রের সাথে বিয়ে দেয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। আবার বিয়ে হলেও সংসারে নানা লাঞ্চনা-বঞ্চনা সহ্য করতে হয়। তবে একজন প্রতিবন্ধী নারী নিজের পায়ে দাড়ালে সমাজে যোগ্য পাত্র পাওয়া সম্ভব ।

কেস-স্টাডি-২: কোহিনুর বেগম(৩৫) একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী। প্রতিবন্ধী হলেও দেখতে খুবই সুন্দরী। বিয়ে হয়েছে সমভ্রান্ত পরিবারের এক অপ্রতিবন্ধী যোগ্য পাত্রের সাথে। স্বামী সৌদী আরবে কর্মরত। তিনি জানান- আমার স্বামীর পরিবারের লোকজন কে কি বলে সেদিকে আমার কান দেয়া প্রয়োজন মনে করিনা। কারণ যার সাথে ঘর বেধেছি, সে আমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিচ্ছে কি না তা দেখার বিষয়। স্বামীর সহযোগিতায় একটি বে-সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছি।

কেস-স্টাডি-৩: মোসাঃ আসমা খাতুন (২০) একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও এতিম নারী। লেখা-পড়া তেমন জানেনা মাত্র চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত । স্বামী অপ্রতিবন্ধী এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে চাকুরি করেন। তার শশুর-শাশুড়ি যৌতুকের জন্য মাঝে-মাঝে নির্যাতন করে থাকে। কিন্তু স্বামী খুবই আদর করেন বলে জানান।

কেস-স্টাডি-৪: এ্যাডঃ আঞ্জুমানয়ারা বেগম একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী নারী। কানে হিয়ারিং এইড সহায়ক উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন। বিবাহের সময় একটি জাতীয় বে-সরকারি সংস্থা’ তে চাকুরি করেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলো। বর্তমানে স্বপরিবারে আমেরিকায় অবস্থান করছেন। ভালো আছেন সেখানে এক মেয়ে নিয়ে। তিনি বললেন ভিন্ন কথা- একজন প্রতিবন্ধী নারী স্বাবলম্বী তথা আত্ননির্ভরশীল হলে যোগ্য পাত্র পিছন-পিছন ঘুরবে।

কেস-স্টাডি-৫: নাফিসা আকতার (ছদ্মনাম) একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী। ক্রাচ সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করে চলাফেরা করে। তার বাবা একজন অভিনেতা। বিয়ে হয়েছে অপ্রতিবন্ধী এমবিএ পাত্রের সাথে। স্বামীর পরিবারের লোকজন ভালো না বাসলেও স্বামী খুবই ভালোবাসেন বলে তিনি জানান।

অভিভাবকদের মতামত: ঢাকা মালিবাগের শাহ নেওয়াজ নান্নু নামের একজন অভিভাবক জানান, প্রতিবন্ধী মেয়ে যোগ্য হলে ছেলেদের সাথে বিয়ে দিলে কোন মর্যাদার হানি হয়না। ওরাও মানুষ। যে কোন মানুষ দূর্ঘটনার শিকার বা রোগাক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধিতার শিকার হতে পারে। তবে ছেলেরা সম্মত না হলে অভিভাবকদের কিছুই করার নেই।

ছেলেদের মতামত: গোলাম মোর্তজা হোসেন মিলন নামের এক স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী যুবক বলেন, প্রতিবন্ধী নারীরা মানুষ। তারা যোগ্য হলে বিয়ে করা যায়। কামরুল হাসান নামের এক ছেলে বলেন, যে পাত্রীর বাবা আমাকে প্রতিষ্ঠিত করবে সেই পাত্রী আমার প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী অপ্রতিবন্ধী নারী বুঝি না। স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করে চাকুরি পাচ্ছি না। আমার প্রয়োজন টাকা।

প্রতিবন্ধী নারীদের মতামত: কোন ধরনের পাত্র চাই এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঢাকা শহরের কয়েকজন বিভিন্ন ধরণের উচ্চ শিক্ষিত চাকুরিজীবী প্রতিবন্ধী নারী জানান, পাত্রকে হতে হবে যোগ্য। আমরা প্রতিবন্ধী হলেও আমরা সংসারের প্রয়োজনীয় কাজ-কর্ম করতে পারি। আমরা শিক্ষিত অপ্রতিবন্ধী পাত্র চাই।

বিশেষজ্ঞদের মতামত: এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস) এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক জনাব আব্দুস সাত্তার দুলাল জানান- প্রতিবন্ধী নারীরা শিক্ষা-দীক্ষা, চাকুরি সহ বিভিন্ন আর্থসামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে দেশের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রাখছে। ফলে পূর্বের ধ্যান- ধারণা পাল্টে যাওয়ায় প্রতিবন্ধী নারীদেরও অপ্রতিবন্ধী যোগ্য পাত্রের সাথে বিয়ে হচ্ছে। তবে প্রতিবন্ধী নারীদের নিজের পায়ে দাড়াতে হবে।