ক্যাটেগরিঃ সালতামামি

আমাদের জীবন থেকে চলে গেল আরও একটি বছর৷ প্রতিটা সময় মানুষের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান, যেমনটা ব্যক্তি জীবনে তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রেও৷ ২০১২ সাল ছিল নানাবিধ চরাই উতরাই এর মধ্যে৷ নানা কারনে গেল বছরটি আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে বারবার৷ বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনাবলী আমাদের হৃদয়ে দাগ কেটে গেছে৷ হয়ত কোনটা বেশী আর কোনটা কম৷

২০১২ সালের ১১ ফেবু্রয়ারী সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন ঢাকাস্থ পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া ফ্ল্যাটে নির্মমভাবে খুন হয়৷ পরবর্তীতে তত্‍কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন খুনীদের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতার করা হবে বলে জানালেও আজ পর্যন্ত এই ঘটনার কোন প্রকৃত খুনী ধরা পড়েনি৷ আমাদের সাংবাদিক সমাজ এ বিষয় নিয়ে এখনও আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছে৷ কিন্তু কবে নাগাদ তদন্ত শেষ করে আসল খুনীদের জনসম্মুখে তুলে ধরা হবে তা কারও জানা নেই৷

১৭ এপ্রিল ২০১২ রাতে ঢাকাস্থ বনানীর রাস্তা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা ইলিয়াছ আলী ও তার গাড়িচালক আনসার আলী৷ কিন্তু আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী আজ পর্যন্ত তাদের কোন হদিস বের করতে পারল না৷ আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা কর্তৃক এটি সাধারন ডায়েরী ছাড়া কোন মামলাও হয়নি৷ তারা বেঁচে আছে না মারা গেছে এ বিষয়টিও আমাদের কাছে ধোয়াশাই রয়ে গেছে৷

কঙ্বাজারের রামুতে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঘটে যায় ইতিহাসের ন্যাক্কারজনক ও কলঙ্কজনক ঘটনা৷ ঐ দিন রাতে রামুর বৌদ্ধপল্লিতে হামলা চালায় দুবৃত্তরা৷ মুহুর্তের মধ্যে ১২ বৌদ্ধ বিহার ও ২৬ টি বসতঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং আরও ছয়টি বৌদ্ধ বিহার ও শতাধিক বসতঘরে লুটপাট চালানো হয়৷ পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের পটিয়ায় আরও ৮টি বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালানো হয়৷ এরপর শুরু হয় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের রশি টানাটানি৷ যা মোটেও কাম্য ছিল না৷ যদিও পরবর্তীতে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং অনেকে গ্রেফতারও হয়েছে৷ কিন্তু আজও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মনের ক্ষত শুকায়নি৷ তারা এখনও আস্থাহীনতায় ভুগছে৷

বাংলাদেশে রপ্তানী আয়ের সিংহভাগই আসে পোশাকখাত থেকে৷ কিন্তু শুরু থেকেই এই খাতের শ্রমিকরা কখনই তাদের ন্যায্য অধিকার পায়নি৷ এ নিয়ে শ্রমিকরা বিভিন্ন সময় আন্দোলন সংগ্রামও করেছে৷ কিন্তু এতে লাভ হয়েছে নিতান্ত সামান্যই৷ এরইমধ্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দূর্ঘটনায় প্রাণ কেড়ে নেয় শত শত শ্রমিকের৷ তেমনি গত ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর অদূরে আশুলিয়াস্থ নিশ্চিন্তপুর তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন লেগে প্রায় ১১১ জন শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারায় এবং প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিক আহত হয়৷ নিহত শ্রমিকের আত্মীয়-স্বজনরা নিহতদের লাশও সনাক্ত করতে পারেনি আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাবার কারনে৷ যদিও ডিনএ টেস্টের মাধ্যমে পরবর্তীতে তাদের লাশ বুঝিয়ে দেয়ার কথা৷ আহত ও নিহতের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেবার কথা থাকলেও আজও অনেকে কিছুই পায়নি৷ তাছাড়া যাদের অবহেলায় আগুন লেগেছে তারা কি শাস্তি পাবে ???? একমাত্র উপর ওয়ালাই বলতে পারবেন৷

উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হলে নগরীতে যানজট কমবে, জনজীবনে স্বস্তি আসবে ও দুর্ভোগ কমবে৷ কিন্তু আমাদের দেশে হয় তার উল্টো৷ কখনও কখনও এই উড়ালসড়ক হয় মৃত্যু উপত্যকা৷ তেমনি গত ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে উড়াল সড়কের গার্ডার ভেঙ্গে কেড়ে নিল ১২ টি তাজা প্রান, আহত হয়েছে আরও ১৯ জন৷ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে জনতা৷ পরবর্তীতে নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরন দেয়ার ঘোষনা দেয়া হলেও অনেকে আজও তা পায়নি এবং যা দেওয়া হয়েছে তা নিতান্তই অপ্রতুল৷ বিশেষজ্ঞরা এ দুর্ঘটনার কারন হিসেবে মনে করেন অনভিজ্ঞ মীর আক্তার হোসেন লিঃ এবং পারিসা ট্রেড সিস্টেমস লিঃ (জেবি) কে কাজ দেওয়া, অদূরদর্শী পরিকল্পনা, কর্তব্যে অবহেলা, ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার ইত্যাদি নানাবিধ কারনে এ দুর্ঘটনা ঘটে৷ যাইহোক যাদের কারনে এ দুর্ঘটনা ঘটল এবং এতগুলো লোক প্রান হারালো ও এতগুলো লোক আহত হলো তারা কি আসলে শাস্তি পাবে নাকি সময়ের আবর্তে সব আড়াল হয়ে যাবে ??? কোন উত্তর আমার জানা নেই৷

বছরের শেষটা হয় নিরাপরাধ পথচারী বিশ্বজিত্‍ কে জনসমুক্ষে হত্যার মধ্য দিয়ে৷ গত ৯ ডিসেম্বর ১৮ দলীয়জোটের অবরোধ চলাকালীন সময় ঢাকাস্থ জজকোর্ট এলাকায় বিশ্বজিত্‍ বিএনপিপন্থী আইনজীবি ও ছাত্রলীগের পরস্পর বিরোধী মিছিলের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার বলী হল নিরীহ পথচারী বিশ্বজিত্‍৷ শত মানুষের সামনে ছাত্রলীগ নামধারী কিছু অমানুষ কুপিয়ে পিটিয়ে মারাত্মক জখম করল করল তাকে৷ কেহ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসল না৷ একজন রিক্সাচালক বিশ্বজিত্‍-কে হাসপাতালে নিয়ে গেলো৷ কিন্তু সেখানেও দীর্ঘক্ষণ বিনা চিকিত্‍সায় মারা গেল বিশ্বজিত্‍৷ পরবর্তীতে এ নিয়ে চলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে বিভিন্ন কথা শোনা গেলেও মিডিয়ার কল্যানে আসামীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে৷ কিন্তু যে ডাক্তারের অবহেলার কারনে বিশ্বজিত্‍-এর মৃত্যু হলো তার বিষয়টি কোন আলোচনা কোথাও শোনা যায় না৷

এসব ছাড়াও গুপ্ত হত্যা, সীমান্ত হত্যা, পাহাড়িদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক আদিবাসী না উপজাতি, অজ্ঞাত লাশ ইত্যাদি নানাবিধ কারনে ২০১২ সাল বেশ আলোচিত ছিল৷ মানুষের কোথাও আঘাত লাগলে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয় তা হয়ত একদিন মুছে যায় কিন্তু চিহ্ন থেকে যায় সারা জীবন৷ আসলে বাঙ্গালী বীরের জাতি, সকল কষ্ট ভুলে গিয়েও আমরা নতুন করে জীবন শুরু করতে পারি৷ আমরা চাই অতীতের সকল ঘটনাবলীর সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হোক৷ অতীতের সকল ঘটনাবলী ও ভুল থেকে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহল শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যত্‍ চলার পথ নির্ধারন করবে, এটাই আমাদের প্রত্যয়৷ আর যদি তা না করতে পারে তাহলে ইতিহাস বার বার আমাদের লজ্জাই দিবে এবং প্রতিষ্ঠা পাবে না মানবাধিকার৷

—মোঃ ফয়সাল আহম্মদ
জেলা সমন্বয়কারী
এসএএইচআর প্রকল্প, চট্টগ্রাম ইউনিট
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা৷

২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. মাহাবুব১৯৯৫ বলেছেনঃ

    মহান আল্লাহ সমস্ত মুমিনদেরকে তাওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:

    “হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর পানে তাওবা (প্রত্যাবর্তন) কর, নিশ্চয় তোমরা সফলকাম হবে।” (আননূর: ৩১)

    তিনি তাঁর বান্দাদেরকে তাওবাকারী ও অত্যাচারী হিসেবে ভাগ করেছেন। এখানে তৃতীয় কোন ভাগ নেই। মহান আল্লাহ বলেন:

    “যারা তাওবা করবে না, তারাই অত্যাচারী।” (আলহুজুরাত: ১১)

    আর এখন এমন এক সময় এসেছে যাতে মানুষ আল্লাহর দ্বীন থেকে দূরে সরে গেছে এবং পাপাচার ব্যাপকতা লাভ করছে ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, এ থেকে কেউই বাঁচতে পারছে না আল্লাহর বিশেষ রহমত ছাড়া।

  2. Morshed বলেছেনঃ

    ধন্য বাদ দিতেই হয় ফয়সল সাহেব কে এই ধরনের একটি লেখার অবতারণা করার জন্যে। আসলে আমাডের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, তানহলে ইতিহাস বার বার আমাদের লজ্জাই দিবে।

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...