ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

 

ছোট একটা কাগজের ওপর কাঠ পেনসিল দিয়ে ছবি আঁকছিল নিষাদ। পাশে বসে সে ছবি দেখছে ছোট ভাই নিনিত। নিনিতের হাতে খেলনা বন্দুক। বন্দুকটি তাক করা নিষাদের দিকে। নিষাদের সে দিকে মনোযোগ নেই। আনমনে ছবি আঁকছে। হঠাৎ কী মনে করে, নিষাদের আঁকা ছবিটা ধরে টানাটানি শুরু করে নিনিত। এবার নিষাদ বিরক্ত। রাগত স্বরে বলল, ‘নিনিত, ডোন্ট ডিস্টার্ব।’

কী আঁকছ নিষাদ- এ প্রশ্ন শুনে সে মুখ তোলে, কিছুটা বিরক্তি নিয়ে তাকায়। ‘দেখছো না কী আঁকছি। এইটা ডলার! তোমার লাগবে?’ তারপর সে খুশি হয়ে বাড়িয়ে দেয় একটা কাগজের ছবি। টাকার মতো ছোট ছোট করে কাটা কাগজ। এইগুলো ওর ডলার। পাশেই দাঁড়িয়ে ওর দুই বন্ধু অমিয় ও অন্বয়। অমিয় বলল, ‘নিষাদ তো সব সময় ছবি আঁকে। কাগজ আমি কেটে দিই। সেই কাগজে কোনো কোনো দিন ২০/২৫টা ছবি আঁকে নিষাদ।’ নিনিত কিছুই করে না। তেমন কিছুই বলে না। শুধু মিটমিট করে হাসে।

সদ্যপ্রয়াত কিংবদন্তি কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের দুই শিশুপুত্রকে বিরক্ত করছে না কেউই। রাজধানীর ধানমন্ডির দখিন হাওয়া ফ্ল্যাটে গতকাল বিকেলে গিয়ে দেখা গেছে, নিজেদের মতো করে ওরা খেলছে। কখনো নিজেরাই ঝগড়া করছে। মাঝেমধ্যে ওদের খেলায় যোগ দিচ্ছে পাশের ফ্ল্যাটের অমিয় ও অন্বয়। নিষাদের ভালো লাগে একটা কাজ করতেই। সে শুধু ছবি আঁকে। যখন-তখন ছবি আঁকে। ছবি আঁকার ফাঁকে ফাঁকে কখনো তাকিয়ে থাকে ওর বাবার আঁকা ছবির দিকে। তখন হয়তো ওর বাবার কথা মনে পড়ে খুব। তবে পাঁচ বছরের নিষাদ সে কথা বলে না।

এই ছবি কী তোমার আব্বু এঁকেছেন- প্রশ্ন করলে নিষাদ কিছুই বলে না। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে বাবার আঁকা ছবির দিকে। ছবিটা দেয়ালের সঙ্গে লাগানো। ছবির চারদিক কালো, মাঝে ভেসে আছে একটি মুখ। দেখলেই বোঝা যায়, মুখটি ছোট্ট নিষাদের।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে ছবি আঁকছিল। এবার বিছানা থেকে ওঠে। চোখে-মুখে উচ্ছ্বলতা। আনন্দের সঙ্গে বলে, ‘আমার ছবি এইটা। বাবা এঁকেছে এইটা।’ তোমার বাবা কোথায়- এ প্রশ্ন করলে হঠাৎ মুখের রেখাগুলো সংকুচিত হয়। বলে, ‘বাবা অসুস্থ। জানো না তুমি? বাবা তো আকাশে চলে গেছে। ভালো হয়ে ফিরে আসবে!’

হুমায়ূন আহমেদ ও মেহের আফরোজ শাওন দম্পতির দুই শিশুসন্তানের ধারণা, তাদের বাবা আকাশে চলে গেছেন। চিকিৎসা শেষে ফিরে আসবেন।
বাবা হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে তেমন কিছুই বলে না নিষাদ। আর নিনিত শুধু তাকিয়ে থাকে। তবে বাবাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ছোট নিষাদের মন। নিষাদের এখনো বোঝার বয়স হয়নি, তার বাবা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আর কখনো সে তার বাবার মুখে গল্প শুনতে পারবে না। নিষাদ তার বাবার অনুপস্থিতি টের পেলেও ছোট নিনিত তা পায়নি।

গতকাল হুমায়ূন আহমেদের ধানমণ্ডির বাসভবন ‘দখিনা হাওয়া’য় গিয়ে দেখা যায়, অন্য শিশুদের সঙ্গে ট্রেন, গাড়ি, পুতুল ও মুখোশ নিয়ে খেলায় মগ্ন নিষাদ ও নিনিত। তারা এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছোটাছুটি করছিল। শিশু দুটির হাসির শব্দ তখন ছড়িয়ে দখিন হাওয়ার ফ্ল্যাটে। নিজেদের ঘরে দুই ভাই আপন মনে খেলছিল। নিষাদ কখনোবা ছুটছিল অ্যাকুয়ারিয়ামে মাছের খাবার দিতে। ছোট নিনিতকে তার মুখে বিস্কিট তুলে দিচ্ছিলেন তাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হুমায়ূন পরিবারের দীর্ঘদিনের পুরোনো সহকারী মোস্তফা। তিনি বললেন, ‘নিষাদ ওর বাবাকে খুব মিস করে। খেতে বসলেই জানতে চায়, বাবা কবে আসবে?’ আমি বুঝিয়ে বলি, চিকিৎসা শেষ হলেই তোমার আব্বু ফিরে আসবেন।

হুমায়ূন আহমেদ প্রথম বিয়ে করেন ১৯৭৩ সালে গুলতেকিন খানকে। তাঁদের চার সন্তান হলেন- নোভা, শীলা, বিপাশা ও নুহাশ। ২০০৫ সালে গুলতেকিন খানের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর বিয়ে করেন মেহের আফরোজ শাওনকে। এই দম্পতিরই দুই সন্তান- নিষাদ ও নিনিত। হুমায়ূন আহমেদের ছয় সন্তানের মধ্যে সবার ছোট নিনিত। ওর জন্ম ৬ সেপ্টেম্বর ২০১০। ওর চেয়ে তিন বছরের বড় নিষাদ। ওর জন্ম ৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৭। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় জন্মবার্ষিকীতে বাবাকে পাশে পাবে না নিনিত। বাবার এ শূন্যতা ও বুঝবে না। যখন বড় হবে, বাবার সঙ্গে ছবি দেখে অনুভব করে সেই অসীম শূন্যতা। আর নিষাদ কিছুটা বুঝতে শুরু করেছে। যত দিন যাবে, ততই সে বুঝবে। বছর কয়েক পরই সে হয়তো বুঝবে, তার বাবা আর নেই। বাবা আর কোনো দিন ফিরবেন না। (সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ০৬ই আগষ্ট, ২০১২)

নিনিত ও নিষাদ তোমাদের জন্য আমাদের অজস্র ভালবাসা। আকাশের হাজারো তারার আলোক ছটা তোমাদের কচি ফুলের মত নিষ্পাপ দুটি জীবনকে আনন্দে আনন্দে ভরিয়ে দিক। সবাই যখন প্রিয়জনদেরকে নিয়ে ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করবে, তখন তোমাদের পিতা রাতের জোছনা হয়ে কিংবা ভোরের সূর্য হয়ে তোমাদের সামনে আসবে। তোমরা তোমাদের প্রিয় পিতার জন্য প্রান খুলে দোয়া কর তিনি যেন স্বর্গলোকেও পরম শান্তিতে বসবাস করতে পারে।

তোমাদের দুচোখের অবাক বিস্ময়কর দৃষ্টি মনের অজান্তে আমাদের হৃদয় কেঁদে উঠে। তোমরা বড় হও, তোমাদের বাবার আদর্শের প্রতিটি স্তম্ভ নিয়ে দাড়িয়ে থাকবে মহিরুহ হয়ে।