ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

আমি আমার ছেলেবেলায় ছিলাম বাবা-মায়ের। মাতৃনাড়ি ছিঁড়ে জন্মের পর থেকে বিবাহ অব্দি তাঁদের অকৃপণ আদর-যত্নে বেড়ে ওঠা আমি নিশ্চয় তাঁদেরই উত্তরাধিকারী এই বিশ্বাসটি প্রথম ভঙ্গ হয় তখন যখন কাবিননামা সই করে আমাকে চলে যেতে হয় বিবাহসূত্রে স্বামীর ঘরে। তো, অই ঘরটি আমার — এই ধারণাও আদতে সঠিক না। সেখানেও প্রতিনিয়তই বিস্তর-দুস্তর ধ্যান-ধারনার ফারাক। সে নিয়েই বিধিবদ্ধ যাপিত সংসার নামের অবস্থান একসময় পরিণত হয় চিরভাসমান বাৎসল্যে। মোটামুটি কম-বেশি এদেশের প্রায় সব মেয়েরই এই জীবনচিত্র। এই সামাজিক ব্যাবস্থাপত্র।

সেই আদিযুগের পরে যখন থেকে মানবসমাজ, তখন থেকে ক্রমান্নয়ে কি ধর্মে কি রাষ্ট্রীয় আইনে মেয়েদের অবস্থানঙ্গত চিত্রটি এমনই। আধুনিকতার ছোঁয়ায় যতটা সে বাণিজ্যিক — পণ্যপ্রায় বলাও যায় — ততটাই অপরিবর্তিত তার প্রকৃত অবস্থানের ভিত্তিভূমি। দূর্বল আর নড়বড়ে অই অবস্থানের সংস্কারের যেন কোনও প্রয়োজনই নেই ! আমার মাঝে-মাঝেই আধুনিকতায় সোচচার এবঙ চাকচিক্যের জৌলুসময় বিভিন্ন আনুষ্ঠিকতায় অংশগ্রহণের দায় এড়াতে না পেরে নিজেকে বড়ো হাস্যকর বড়ো অসহায় অবস্থানের শিকার মনে হয়। মনে হয় পৃথিবী জুড়ে এত যে সংস্কারের ধুম — এত যে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হৈহৈ — অগণিত মিডিয়া ও কলমের বিস্তর জোরালো পরীক্ষা — তাতে নারীর প্রকৃত ভিত্তির জোর কই ! নারীর অংশীদারীত্বের সমানাধিকার দূরের কথা কেবল প্রাপ্যটুকু নিশ্চিত যাতে পায় তারই বা নিশ্চয়তা কই ! আদতে আজ যখন রাষ্ট্র বহুকাল পরেই প্রায় অচিন্ত্যনীয় নারীনীতি বাস্তবায়নের কথা বলছে তাতে যেন বা আঁতেই ঘা লেগেছে ধর্ম-ব্যাবসায়ী / ধর্মের নামে অধর্মের রাজনীতির নায়কদের। আর দলবাজির নীতিহীন রাজনৈতিক ধর্মান্ধতারও ইন্ধনদাতা দলগুলি অাদতে সাম্প্রদায়িকতার উস্কানিদাতা। এখন তাদেরও চিহ্নিত করার সময়। যাতে নারীরা ন্যায্য প্রাপ্তির বিষয়টি ঝুলে না যায়। নারীনীতির বাস্তবায়নে বাংলাদেশ উজ্জ্বল উদাহরণ হোক – প্রার্থনা অজ।

একইসঙ্গে আমার নিজের কাছে নিজের প্রশ্ন – মাঝেমাঝেই মনকে শুধায় –
এই যে নারী, তোমার আপন ঠাঁই কোথায়? যেখানে যে কোনও নারীর প্রাপ্য নিজের অন্তর্গত আপন মহিমায় প্রকৃত মানুষের অধিকারের পরিচিতি পাবার এবঙ নিজের পায়ে দাঁড়াবার নিজস্ব অবারিত মেদিনীতল পেতে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত – তথাপি অাজকের নারীরা বহুদূর এগিয়ে গেছে মেধার জোরে – সেখানে যখনই নারীর ‘পরে হামলা, অধিকার বঞ্চিত করবার অাইন – ধর্মের দোহাই – তখনই প্রশ্নটি অাসে –
‘এই যে নারী, তোমার অাপন ঠাঁইটি কই? ‘ জবাব খুঁজে নিজেই হয়রান। চারপাশের বৈরী পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা বৃত্তবন্দী নারীহৃদয় জর্জরিত করে।

আজ যে এমন আত্মজিজ্ঞাসা – বিষয়টি লেখায় এলো – এদিকে বর্তমান। বাংলাদেশে নারীই দেশ পরিচালনায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার দুইজনই নারী। বিরোধী নেত্রীও নারী। এ এক বিজয়বার্তা নারীর। আত্মমর্যাদার অধিষ্ঠানটি খুঁজে নারীকে যেন অন্তরে জেরবার হতে না হয় অার। এবঙ নারী নিজের অধিকার প্রাপ্তির পথে অন্যায় বিদ্বেষের শিকার হয়ে যেন না লা-জবাব আত্মজিজ্ঞাসা লেখে। জগতবাসী সকল নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা পাক ঘরেবাইরে যোগ্যতার ভিত্তিতে। মেধা বিকাশে, সামাজিকতায়, কাজের ক্ষেত্রে নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা হোক। নারীবিদ্বেষী পুরুষ নিপাত যাক।

১৪২১ বঙ্গাব্দ।।