ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

সদ্য প্রয়াত সুভাষ দত্ত-র ছবি-উইকি হতে সংগৃহিত।

সদ্য প্রয়াত চলচ্চিত্রকার সুভাষ দত্ত, বাংলা চলচ্চিত্র জগতে একটি অবিস্মরণীয় নাম। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সুভাষ দত্ত-র নামটি শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণের যোগ্যতার মাপকাঠিতে সুউচ্চ আসন পাবারই যোগ্যতা রাখে।

এদেশে তাঁর নির্মিত প্রথম ছবিটি – সুতরাং (১৯৬৪ ইং) একটি সুন্দর জীবনধর্মী পরিচ্ছন্ন চলচ্চিত্রের জন্য বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ছবিতে সুভাষ দত্ত-ই নায়কের পার্টটি করেন। ছবির নায়িকা কবরী – (মিনা পাল, চট্টগ্রাম) প্রায় কিশোরী বয়সেই কবরী নামে সুভাষ দত্ত-র মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন। তিনিও সুতরাং ছবিতে অভিনয় করার প্রথম সুযোগে দর্শক নন্দিত নায়িকার আসন পেয়েছেন। তাইতো তাঁকে পেছনে তাকাতে হয়নি আর। ছবিটি বাংলাদেশের একটি প্রধান চলচ্চিত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি-সন্মাননাও অর্জন করেছে।

সেই সময় আমিও কিশোরী, খালাদের সঙ্গেই সুতরাং দেখেছি। সেই সময় হরিনারায়ণপুরে সিনেমা হল হয়নি তখনও। মাইজদী-র সিনেমা হলে সে এক এলাহি আয়োজনসমেত যাত্রা। তখন সিনেমা দেখার জন্য অনেক আয়োজন লাগতো। বড়দের সঙ্গেই যাওয়া বাধ্যতামূলক। এবঙ ব্যাগভর্তি করেই বিস্কুট-চিপস-চানাচুর-পানির-বোতল থাকতো সঙ্গে। হঠাত কার কখন হলে আবার তৃষ্ণা কি ক্ষিদে পেতেই পারে, সেটিই স্বাভাবিক। তো, সিনেমা দেখাটি হয়ে উঠতো প্রায় পিকনিক-ই! যাহোক, সুতরাং-এর কিশোরী নায়িকা কবরী আমাদের হৃদয়হরণকারী আদর্শ নায়িকার স্থানটি দখল করলো সেইদিন হতেই। আজও কবরী অভিনীত কোনও ছবি কোনও চ্যানেলে দেখালে দেখি মুগ্ধচিত্তেই। সুতরাং ছবিতে –

“এমন মজা হয়না
গায়ে সোনার গয়না –
ও বুবু তোর বিয়ে হবে
বাজবে কত বাজনা।।”

গানটি তখন লোকমুখে-মুখে বিষম জনপ্রিয় গানেই পরিণত। এবঙ গীত হতেই থাকলো। বাংলার জনপদ ছাড়িয়ে ভিন দেশেও ছড়িয়ে পড়লো। গানটিতে যে কন্ঠ দিয়েছিলো -আরেক কিশোরী – রবীন্দ্র সঙ্গীতজ্ঞ কলিম শরাফীকন্যা – আলিয়া শরাফী, আমার প্রিয় আলিয়া আপা – বন্ধুও, বর্তমানে কানাডাবাসি। সুতরাং ছবির কথা উঠলে কবরী ও আলিয়া শরাফী-র নামটি মনে আসেই।

অতঃপর সুভাষ দত্ত নির্মান করেছেন আরও এক সিনেমা – “আবির্ভাব” – আরেকজন নতুন মুখের নায়িকা – শর্মিলি, সুভাষ দত্ত-র হাত ধরেই অভিনয় জগতে আবির্ভূত। এটিও দর্শক নন্দিত হয়। পরের ছবি – “কাগজের নৌকা”, “আয়না ও অবশিষ্ট”, “আবির্ভাব”, “বলাকা মন”, “সবুজ সাথী”, “পালাবদল”, “”আলিঙ্গন”, “আকাঙ্ক্ষা”, “আগমন”, “অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী”, “বসুন্ধরা” – ইত্যাদি। “কাগজের নৌকা”-য় অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে সুচন্দা-র প্রথম আগমন। এবঙ “অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী” ছবির মধ্য দিয়েই নায়ক উজ্জ্বল-এর আবির্ভাবও সুভাষ দত্ত-র হাত ধরেই। “বসুন্ধরা” ছবিতে সুভাষ দত্ত-র হাত ধরেই প্রবেশ করেন চলচ্চিত্রে নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন।

উল্লিখিত ছবিগুলোর মধ্যে “অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী” ছবিটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পটভূমিকায় নির্মিত বলেই বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত। নায়িকা ববিতা সহ প্রতিটি চরিত্র জীবন্ত অভিনয়গুণে সমৃদ্ধ। এই ছবির অনন্য-অবিস্মরণীয় গান আজও অশ্রুসজল-হৃদয়স্পর্শি আবেদনে আমাদেরকে সেই সময়ে নিয়ে যায় – যখন এই বাংলাদেশ ধর্ষিতা বাংলাদেশ। যখন মুক্তিযোদ্ধারা বুকের ভিতর সযত্নে লালিত একটি মুখের হাসির জন্য মরণপণ যুদ্ধে নেমেও স্মরণ করছে প্রিয়তম মুখটি – সেই অনন্য গানের ভাষায় –

“মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি –
মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি – ”

গানটি গেয়েছিলেন আপেল মাহমুদ। আজও এই গানটি শুনলেই দুচোখ জলের ধারায় ভাসে। যুদ্ধদিনের রক্তাক্ত অজস্র স্মৃতি তাড়িত হই আমরা যারা আজও বেঁচে আছি, অথচ, ছবিটির নির্মাতা সদ্য প্রায়ত সুভাষ দত্ত তবুও বেঁচেই আছেন তাঁর নির্মিত শুদ্ধ-সুন্দর বহু ছবির ভিতর জীবনধর্মী চরিত্রের ভিতর।

১৯৭৭ সালে সুভাষ দত্ত জীবনধর্মী এক মননশীল চলচ্চিত্র বানান – “বসুন্ধরা”।
ছবিটি আলাউদ্দিন আল আজাদ-এর উপন্যাস “২৩ নম্বর তৈলচিত্র” অবলম্বনে তৈরী। তা চলচ্চিত্র মহলে বিশেষ আদৃত আজও। ১৯৭৭ সালেই তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার ও একুশে পদক পান।

বাংলাদেশের বাংলা চলচ্চিত্র আজ যে অবস্থানে – সেখান হতে আবার মানুষকে সুন্দর-শুদ্ধ ধারার চলচ্চিত্র উপহারের মধ্য দিয়েই হয়তো সিনেমা হলে যাবার জন্য কিঞ্চিত প্রণোদিত করার কাজটি সম্ভব। আজকের নির্মাতাগণ খান আতা, জহির রায়হান, হুমায়ুন আহমেদ, তারেক মাসুদ, আলমগীর কুমকুম, সুভাষ দত্ত-কে অনুসরণ করাটি প্রয়োজন।

দিনাজপুরের সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারের সন্তান সুভাষ দত্ত জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৩০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী। এবঙ ২০১২-র ১৬ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন ঢাকাস্থ রামকৃষ্ণ মিশন-এর তাঁর নিজের বাসভবনে।

সুভাষ দত্ত, আপনি চিরশান্তিতে ঘুমোন না ফেরার দেশ অচিনপুরে। আপনাকে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।।

১৭ নভেম্বর ২০১২ ইং

১৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. বাংগাল

    বাংগাল বলেছেনঃ

    শিরীন আপু , সুভাষদার স্মৃতিতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি ।
    মহামূল্যবান রত্নভান্ডার থেকে আরেকটি রত্ন কালের গর্ভে হারিয়ে গেল ।

    আপু ভাল থাকুন ।

  2. জিনিয়া বলেছেনঃ

    আপুনি, বরেণ্য এবং বাংলা সিনেমা জগতের গৌরব এই মহান ব্যক্তিত্ত্বকে নিয়ে লেখা তোমার পোস্টের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমি তাঁর “অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী” সিনেমাটি টিভিতে দেখেছি..খুব সুন্দর..আর তাঁর হাত ধরে চলচ্চিত্রে যাদের পদযাত্রা তাঁরাও অনেক গুণী বলেই প্রতীয়মান হয়েছে..সেক্ষেত্রেও সুভাষ দত্তকে আমরা স্মরণ করে যাব আজীবন।

    তিনি স্বর্গবাসী হোন এই প্রার্থনা করি।

  3. জুলফিকার জুবায়ের

    জুলফিকার জুবায়ের বলেছেনঃ

    কবরীর নাম যে মিনা পাল জানা ছিল না।
    অমর একজনকে ভক্তি করে যে লেখাটি লিখেছেন সে লেখাটির জন্য আপনাকে সশ্রদ্ধ সালাম ও শুভেচ্ছা।

  4. হৃদয়ে বাংলাদেশ বলেছেনঃ

    হাফপ্যান্ট পড়ে যার কৌতুকাভিনয় দেখে হেসে কুটিকুটি হয়েছি, তিনি ছবি পরিচালনা করবেন শুনে অবাক হয়ে আইসক্রিম চাটতেও ভুলে গেলাম। দেখলামও সেই সুতরাং ছবি। ইঁচড়ে পাকা বালক এটুকু বুঝলো, হ্যা ছবি হয়েছে একখান। প্রথম যৌবন যখন উঁকিঝুকি মারছে, তখন আবির্ভাব দেখে আজিমের একক শয্যায় শয়ন দেখে মন কোন এক উদাসী সুরে বাঁশি বাজালো। ধুম যৌবনে অরুনোদয়ের অগ্নিস্বাক্ষী ছবিতে বেতারে দেশ স্বাধীন হওয়ার সংবাদ প্রচারের ব্যাকগ্রাউন্ডে নিরাপদ আশ্রয়ে সিগ্রেট ফুঁকতে ফুঁকতে তাস খেলে আর পা ঝাঁকানোর ক্লোজআপ দেখে মন ফের ক্ষিপ্ত হলো, মাত্র কদিন আগেই প্রায় একই দৃশ্য দেখে যেমন মন ক্ষিপ্ত হয়েছিলো।
    আমি জানিনা, বাংলা চলচ্চিত্রে এতো ডিটেল্‌সে আর কারো অন্তর্দৃষ্টি ছিলো কি না। খুব মিস করবো সুভাষ দত্তকে। জানতাম তিনি নীরবে হলেও আছেন, এখন জানি তিনি আর নেই।
    বাংলা ছবিতে গান থাকবেই। কিন্তু সুভাষ দত্ত-সত্য সাহা duo বাংলা চলচ্চিত্রে গানের নামে যে রত্ন উপহার দিয়েছেন, তেমনটি খুব বেশি দেখিনি। শেষ প্রনাম উভয়কেই।

    • নুরুন্নাহার শিরীন

      নুরুন্নাহার শিরীন বলেছেনঃ

      হৃদয়ে বাংলাদেশ, জ্বী ভাই, অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষরা ক্রমেই নেই হচ্ছেন – আমরা শূণ্যতাগ্রস্ত হচ্ছি …………সুভাষ দত্ত কৌতুকাভিনয় দিয়েই শুরু করেছিলেন – এহতেশাম-এর “এদেশ তোমার আমার” নামের ছবিতে, মনে করিয়ে দিলেন, উল্লেখ করা উচিত ছিলো আমার। আপনার স্মৃতিতাড়িত কথামালা বিষম অন্তর্গত সত্য-ই, অনুভব করার। সুভাষ দত্ত, সত্য সাহা – দুজন দুই সৃজনশীলতার যুগল সৃষ্টি সম্ভার রেখে গেলেন – শেষ প্রণতি দুজনের তরেই।

      ৫.১
  5. আসাদুজজেমান বলেছেনঃ

    ধন্যবাদ @নুরুন্নাহার শিরীন,
    সুভাষ দত্ত, বাংলা চলচ্চিত্রের দিকপাল এ রত্নের স্মৃতির প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা।।।

  6. মাধুরী শিকদার বলেছেনঃ

    সুভাষ দত্তকে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী জানানোর সাথে সাথে আপু আপনাকেও নতুন করে শ্রদ্ধা না জানিয়ে পারছি না, এমন তথ্যবহুল পোষ্ট এর জন্য।
    অনেক অনেক শুভকামনা রইল।

  7. আবু এম ইউসুফ বলেছেনঃ

    অনেক প্রতিকুল পরিস্থিতিতেও শুদ্ধ চলচ্চিত্র সৃষ্টির প্রয়াসে চিত্র নির্মাতা সুভাষ দত্ত একজন হার না মানা বীর। তার প্রয়াণ, নান্দনিক চলচিত্র নির্মানের অনুপ্রাণন শক্তিকে সঙ্কুচিত করেছে। এই ক্ষতি পুরণের জন্য জাগ্রত হওয়ার- এখনি সময়।

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...