ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আমার আজকের লেখা বিবিসির সাবেক সাংবাদিক ও তার পোস্ট এডিটরিয়াল নিয়ে। মূলত তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে লিখতে গিয়েই আমি নিজের কষ্টের কথা সামান্য হলেও শেয়ার করছি।
কামাল তার বিশাল পোস্ট এডিটরিয়ালে মাত্র একটা লাইনে লিখে শেষ করেছেন বাংলাদেশের টেলিভিশনে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি বন্ধে যেন এখনই উদ্যোগ নেয়া হয়। না হলে পরে সেটা মহামারি হিসেবে দেখা দিবে। তিনি লিখেছেন, ‘‘বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে টেলিভিশন শিল্পের যে ব্যাপক প্রসার ঘটছ, সেখানে কাজের ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ঝুঁকি দিকটাতেও তাই নজর দেওয়ার সময় এসেছে। তা না হলে কোনো একদিন হয়তো আমরাও বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো অঘটনের কথা শুনতে পাব।

কামাল তবু লিখেছেন, তাই তার কাছে কৃতজ্ঞতা। এদেশের পুরুষরা তো এক কথা বলেই খালাস। নারীকেই নারীর প্রাপ্য বুঝে নিতে হবে! পুরুষ হিসেবে তার নিজের কোন দায়িত্ব নেই। যেন নারী মঙ্গল গ্রহ থেকে আসা ভিনদেশী অন্য জগতের প্রাণী। নারীর কোন উপকার হলে, নারী ভাল থাকলে পুরুষের কোন কাজে আসে না। পুরুষ তো পুরুষ ই! তার আবার নারীর-ভালমন্দের দরকার কি! সত্যিই কি তাই! ভাল থাকার জন্য কি একে অন্যকে এদের দরকার হয় না!

প্রতিদিন হয়রানির শিকার হতে হতে, অন্যদের কান্না দেখতে দেখতে আমি এখন বেশ ক্লান্ত। এখন আমি আর আগের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করিনা। কারণ জানি আমি যাকে বন্ধু ভেবে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি। আমার দিকে তার হাত টা ঠিক অন্য কারণে। কিন্তু অফিস । যেখানে আমার রুটি-রুজি, পরিবারের সুন্দর থাকা। তাকে আমি কিভাবে এড়িয়ে যাব। কত ভাল হতো যদি সে পরিবেশটা সত্যিই অনেক নিরাপদ ও ভাল হতো!

মহামান্য হাইকোর্টকে এ জন্য ধন্যবাদ দেই যে, তিনি অন্তত এ বিষয়টিকে ক্ষুদ্র অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহৎ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। কিন্তু এর প্রতিরোধে যে উদ্যোগের কথা বলেছেন তা অত্যন্ত অপ্রতুল। এমনকি যে এনজিওটি এ বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রুল জারি করাল তারাও কেন শুধূ রুল জারি করেই বসে থাকল সেটি আমার কাছে একেবারেই বোধগম্য নয়।

একবার এক নারী উন্নয়নকর্মীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম আপনি যে এত যৌন হয়রানি প্রতিরোধের কথা বলছেন, আসলে কোন আচরণটাকে যৌন হয়রানি হিসেবে ধরতে হবে। তিনি বললেন, যৌন হয়রানি সেটাই যে ধরণের আচরণ আপনি প্রত্যাশা করছেন না কিন্তু কেউ আপনার সাথে করছে বা আপনি যে ধরণের আচরণে অস্বস্তিবোধ করেন সেটাই যৌন হয়রানি। যৌন হয়রানি এখন কর্মজীবী নারীর জীবনের ক্যান্সার। প্রতি মুহুর্তে এদেশে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে নারীরা বেশি যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। কর্মজীবীর নারীর কথা এই কারণেই বলছি,কর্মজীবী নারীকে ধরেই নেয়া হচ্ছে তুলনামূলকভাবে সচেতন। এ ব্যাপারে আমার ছোটবোন খুব সুন্দর একটা কথা বলেছে, ও কয়েকজন কর্মজীবী নারীর কর্মক্ষেত্রে হয়রানির কথা শুনে বলল, আসলে নারীরা যে আত্মসম্মান ও মর্যাদা ও স্বাধীনতা পাবার আশায় রান্নাঘর থেকে বের হয়ে বাড়ির বাইরে কাজ করা শুরু করল সেই মর্যাদা নারী বাস্তবে পাচ্ছে না।

সত্যিই তাই প্রতিদিন কর্মক্ষেত্রে যাবার সময়, কর্মক্ষেত্রে যাবার পরে সেখানে অবস্থানের সময়, সেখান থেকে ফেরার পথে যেসব ভয়ঙ্কর মন্তব্য, আচরণ ও বাক্যের মুখোমুখি হই বুঝি সত্যিই প্রাপ্য মর্যাদাটা পাচ্ছি না।

একবার একটা ছোট্ট প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পেলাম। সম্মানজনক বেতন ও অফিসের পরিবেশ ভালই ছিল। কিন্ত হঠাৎ একদিন জুনিয়র এক সহকর্মীর কাছে শুনলাম শুধু নারী সদস্যদের বেশ কিছু কাজ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। কারণ তার কাছেই জানলাম সিনিয়র বস যিনি তার ইচ্ছাতেই এটা হয়েছে। তার যুক্তিতে এটা করা হয়েছে নারী কর্মীদের নিরাপত্তার ¯^ার্থে। ঐ জুনিয়র সহকর্মীর আচরণে দেখলাম পরে আমিসহ অন্য সিনিয়র সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণ বদলে গেছে। কারণ সে পুরুষ তাই নিজেকে অন্য নারী সহকর্মীদের চেয়ে মুল্যবান মনে করছে। অথচ অফিসের কাজে কি নারী পুরুষের লিঙ্গ লাগে? সেখানে মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে কাজ করতে হয়।

কিন্তু এটা করার আগে ঐ বস একবারও নারী সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করেননি। এটা অবশ্য যৌন হয়রানির সঙ্গে যায় না যায় লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কিন্তু বিষয়টি আবার যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে যায় কারণ ঐ যে বস যিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নারীকে কিছু কাজ থেকে বাদ দিয়েছেন তিনি দিয়েছেন অহেতুক যৌন হয়রানির শিকার যেন নারীকে না হতে হয় সে ভয়ে। সত্যি সেলুকাস। সামান্য কিছু ক্ষেত্র থেকে যদি নারীকে বাদ দিয়ে যৌন হয়রানি বন্ধ করতে হয় তাহলে কি এ উদাহরণটা চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়ার সামিল হয়ে গেল না!
বাংলাদেশে যৌন হয়রানি যে হয় এটি সরাসরি মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে আসে সেই ৯০ এর দশকে। যখন তসলিমা নাসরিন সব নারীর হয়রানির কথা নিজের নামে নিয়ে আমি আমি আমি এই শিরোনামে লিখতে শুরু করলেন। তার সেই নির্বাচিত কলাম। সেই জ্বালাময়ী লেখা যা এখনও প্রত্যেকটি নারী পড়ে আর বলে এটা উনি ঠিকই লিখেছেন আমার জীবনের সঙ্গে এই অংশ টুকুর মিল আছে ইত্যাদি, ইত্যাদি।

আমাদের আজকের প্রতিপক্ষ কামাল সে সময় অন্য সব পুরুষদের মতই তসলিমার লেখা পড়েছেন, মেতেছেন এটাই আমার বিশ্বাস। আজও তসলিমা এদেশের নারীদের কাছে ঈশ্বর পাঠানো দেবদূত। যে তার কষ্টের কথা নিজের নামে লিখে যাচ্ছে।

তসলিমার অনেক প্রবলেম আছে। নিজের অনেক আচরণের জন্য তিনি অনেকের কাছে মুল্য পাননা। কিন্তু নারীর প্রতি যৌন হয়রানি ও নির্যাতন বন্ধে তসলিমার মতো আজ অবধি আর কেউ এই ঢাকা শহরে, এই বাংলাদেশে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেনি, করতে পারেনি, বা করার চেষ্টা করেনি।

শুধু এইটুকু লেখার জন্য আমি তাকে স্যালুট দেই। তিনি অন্তত বলেছেন, অন্তত বলেছেন। এদেশের মিডিয়ায় নারীর প্রতি যৌন হয়রানি খুব স্বীকৃত সত্য। এটা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন এটা নিয়ে অনেক রিসার্চও করেছে। কিন্তু কাজের কাজ সেই অর্থে কিছু হয়নি। যখন এটি সমাধানের কথা এসেছে এই কামাল আহমেদের সহযাত্রী যারা ঢাকায় থাকেন যেমন নুরুল কবীর, এ বি এম মুসা, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল — আরও অনেকে তারা বলেছেন, নারীকে নিজেকে নিজেই রক্ষা করতে হবে। তার নিজেকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ করতে হবে। পাশের পুরুষ সহকর্মী বা অফিস বসের কি কোনই দায়িত্ব নেই! থাকার দরকার নেই!

কামাল লেখায় এটা নিয়ে কাজ হবে। কারণ ঝূঁকির কথা এবার পুরুষে বলেছে। কামাল আবার একথাও বলবেন, আমি তো নারীর কথা বলিনি। যৌন হয়রানির শিকার কি পুরুষে হয় না। হয় কামাল কিন্ত যেদেশে পুরুষই প্রধান, নারী দ্বিতীয় লিঙ্গ। সেখানে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে নারী।

যৌন হয়রানি প্রতিরোধে এদেশে হাইকোর্টে রুল আছে। প্রতিটি অফিসে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি কমিটি থাকার। আল্লাহর অশেষ রহমতে মাত্র ৪৫টি সরকারি অফিসে এ কমিটি করা হয়েছে। আর বেসরকারি অন্য প্রতিষ্ঠানসহ মিডিয়াগুলোতে এসবের বালাই নেই। এদেশে এখনও কোন নারী যৌন হয়রানির শিকার হলে তাকেই দোষী হিসেবে ধরে নেবার অফিস, সহকর্মী, বন্ধুমহল ও বাসায় প্রবণতা আছে। কোন মেয়ে যদি বাই চান্স এ ধরণের হয়রানির কথা বলে ফেলে তাহলে তো কোন কথাই নেই। এবার তাকে দ্বিতীয় দফায় হয়রানির শিকার হতে হবে এবং এটি হতে হবে তার পাশের অন্য সব মানুষদের কাছ থেকে। যারা এতদিন মনের মধ্যে সুপ্ত বাসনা পুষে রেখেছিল, মেয়েটি যেন হয়রানির কথা জানিয়ে তা উস্কে দিল।

কামাল দীর্ঘদিন বিবিসিতে কাজ করেছেন। তিনি নিজে বাংলাদেশ নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেন। তিনি প্রচুর লেখেনও। তিনি ব্যক্তি মানুষ হিসেবেও অনেক আন্তরিক বলে জানি। তিনি যখন প্রথম আলোর মত পত্রিকায় এক -দু লাইনে এ কঠিন অত্যন্ত কঠিন বিষয়টি নিয়ে লিখলেন তখন নিশ্চয় সরকার, মিডিয়ার নীতিনির্ধারক, মালিকপক্ষ আর একটু নড়ে বসবে। এবার বোধহয় নারীর প্রতি সকল প্রকার হয়রানি বন্ধে সরকার সোচ্চার হবে – আমার তাই মনে হয়।

যদিও নিজে এ বিষয়ে লড়াই করতে করতে আমি ভীষণ ক্লান্ত। এখন আর নিজের দেশের আইনের উপর এ ব্যাপারে কোন আস্থা পাই না। সব সময় ইচ্ছে করে নিজে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি তদন্ত টিম করি। আমাদের রাষ্ট্র আসলে কি চায়? তার নারীর নিরাপত্তা দিতে, নাকি তাকে আরও বিপদে ফেলতে? আর আমার চারপাশের পুরুষমানুষ। যারা

আমার-বাবা,ভাই,বন্ধু,স্বামী,সন্তান,মামা,কাকা,খালু,ফুফা-তারও কি কোন দায়িত্ব নেই! তার কি কোন ক্ষতি হয়না যখন তার পরিবারের নারী সদস্য এমন ভয়ঙ্কর হয়রানির শিকার হয়!!