ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

আয়নাবাজি যে আদতে আইন-আদালতের গল্পের ঠাস বুনটে মোড়া কাহিনি তা আমার বন্ধুসকল বা ছাত্রসকলের মধ্যে যারা চলচ্চিত্রটি দর্শন করেছেন তারা ঠিক কী কারণে তার উল্লেখ করলেন না, তা ঠিকমতো ঠাওরে উঠতে পারলাম না। তাতে কি কাহিনীর গোমর ফাঁস করে দেবার আশংকা ছিল? কি জানি!
aynabaji
তবে গল্পের একেবারে গোড়াতেই বাদশা নামক বেঢপ সাইজের এক আইনজীবীর উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। প্রথম দৃশ্যে যার পরণে কালো টাই দেখা গেলেও আদালতের দৃশ্যে তাকেই সাদা ব্যাণ্ড পরিহিতাবস্থাত ক্যামেরাবন্দি হতে দেখা যায়। তা কি নিছক অজ্ঞতাবশত ভুল নাকি সময়ের পরিক্রমায় তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীতে পরিণত হন সে প্রশ্ন তোলা রইল। তবে ভাল লেগেছে বাংলা চলচ্চিত্রে যেখানে হরহামেশা বাংলাদেশ দণ্ডবিধি নামক অস্তিত্বহীন (আসলেই বাংলাদেশ দণ্ডবিধি নামক কোন আইনের অস্তিত্ব এ বঙ্গদেশে নাই) এক আইনের ৩০২ ধারার উল্লেখ করা হয়; সেখানে আয়নাবাজিতে সাল সহ শুদ্ধভাবেই দু’ দু’বার শুধু দণ্ডবিধি উচ্চারণ করা হয়েছে।

আয়নাবাজিতে থিয়েটারের বেসিক গেমগুলির চর্চা দেখতে দেখতে হারিয়ে গিয়েছি থিয়েটার করা দিনগুলিতে। অসম্ভব ভাল লেগেছে বৃষ্টির বাস্তবিক দৃশ্যায়নগুলি। সিনেমায় পুরুষের স্নানদৃশ্যও চমতকারভাবে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, আয়নাবাজির ভেলকি না দেখলে তা অজানা-ই থেকে যেত। চুম্বনদৃশ্যও দেখা-না দেখার দোলা চলে যে কী ভীষণ কাব্যিকরূপে ক্যামেরাবন্দি করা যায় তা রাশেদ জামান ও অমিতাভ রেজা দেখাতে পেরেছেন মুনশিয়ানার সঙ্গে! অমিতাভের পয়লা চলচ্চিত্রে ছোট ছোট করে সংগীতের ব্যবহার ও খানিক সংলাপ খানিক গানের সংমিশ্রণ বেশ ভাল ঠেকেছে।

জীবনের অপরিহার্য অনেক প্রাত্যহিক বিষয়, যা আমাদের গল্প-উপন্যাস বা উপাখ্যানে অপাঙতেয় হয়ে থাকে তাও পরিচালক তুলে আনতে পেরেছেন বেশ সাবলীলভাবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কোন এক চরিত্রের থেকে থেকে উরুসন্ধিতে চুলকাবার কারণ বা শরাফত করিম আয়না রূপী চঞ্চলের শরীর নি:সৃত বিষাক্ত বায়ু নি:সরণ দৃশ্যায়নের কথা। জীবের জৈবিক কার্যাদি পর্দায় দেখতে পেয়ে দিন শেষে দর্শক আমোদিত হয়েছে।আর অভিনয়ের অভিব্যক্তি? চঞ্চল, নাবিলা বা রবির সেইরামখ্যাত শিশুটির (নাম মনে করতে পারছি না) অভিনয় অনবদ্য। বিশেষত মায়ের মৃত্যু দৃশ্যে আয়নার আহাজারি কিংবা জেলখানায় আয়না-হৃদি দেখা হবার দৃশ্যে চঞ্চল-নাবিলার অভিব্যক্তি চোখে লেপ্টে রইবে বহু বহু বহু……..দিন! সিনেমার প্রায় শেষে অমিতাভ রেজার অভিনয় এবং প্রথম দিককার একটি দৃশ্যে তার জীবনসঙ্গীর উপস্থিতি অনালোচিত থাকাতেও বিস্মিত হয়েছি! এই ফেসবুকময় যুগে সাধারণ ভক্তকুলের কাছেতো তারা অচেনা থাকার কথা নন!

আইন-আদালতের বিশেষ করে কারাগারের বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্রায়নের মূল চ্যালেঞ্জ স্পর্শকাতর এসব স্থানে শ্যুটিং করবার অনুমতি পাওয়া বা বিশ্বাসযোগ্য সেট তৈরি করতে পারা। টিম অমিতাভ সে চ্যালেঞ্জ স্বাদরে গ্রহণ করে সাফল্যের সঙ্গে উতরে গেছেন।আয়নাবাজির মূলশক্তি সৈয়দ গাওসুল আলম শাওনের কাহিনির বুনন। চেনা কাহিনির অচেনা উপস্থাপন! যার পরতে পরতে টান টান উত্তেজনা আর অকুন্ঠ আকর্ষণ। এক পর্যায়ে দিনান্তে আয়নার কী পরিণতি হতে পারে বা তার থেকে উত্তোরণের গতানুগতিক পথ দর্শক অনুমান করে নিলেও; শেষে এসে পাল্টে যায় সে গুটিও। উপর্যুপরি চমক নিয়ে ইতি টানে সফল চলচ্চিত্র আয়নাবাজি। দর্শক তাই পর্দায় সাময়িক আঁধার নেমে এলে শেষ মনে করে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেও আয়না তার মুক্তির খবর সাংবাদিক বেশী পার্থ বড়ুয়াকে দেবার সময় আবার থমকে দাঁড়ায়। সে দাঁড়ানো শেষ হয় কাহিনি পরিসমাপ্তির পর ক্রেডিট লাইনের সঙ্গে পাশ্চাত্য ঢংয়ে যোগ হওয়া শ্যুটিংয়ের মজার দৃশ্যাবলী দেখা শেষ হওয়া অব্দি!আয়নাবাজির রূপ দর্শন ফূরলেও হাবীবের কণ্ঠে তাই মনে বাজতে থাকে “ধীরে ধীরে যাও সময়………”।

আয়নাবাজি বাংলা সিনেমার খোলস বদলে দেয়া ছবি। ইতিহাস নির্মাণকারী ছবি (না হলে কী আর টিকিট নিয়ে এমনি এমনি এত্ত কাড়াকাড়ি?)। হল থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথে তাই মনে হয় নান্দনিক আয়নাবাজির টিকিট পেতে পুনরায় অনায়াসেই আবারো বাজি ধরাই যায়।