ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

প্রতি বছরই কোরবানি ঈদের সময় হজ্ব ও কোরবানিকে ঘিরে মুসলমানদের মধ্যে প্রচন্ড উৎসাহ উদ্দীপনা কাজ করে। আল্লাহকে খুশি করতে বিভিন্নজন বিভিন্ন দামের পশু কোরবানি দেন। সামর্থ্যবানেরা হজ্বে যান। কোরবানি ও হজ্বকে ঘিরে যে অর্থ ব্যয় হয় তা দিয়ে দেশের ও দেশের জনগণের কল্যাণে আর কি কি করা যেতে পারত তা নিয়েই এই লেখা।

প্রথমেই দেখে নেই কোরবানি ঈদ ও হজ্বকে ঘিরে কি পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। যদিও এ সংক্রান্ত কোন সঠিক হিসাব হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি বা বেসরকারিভাবে এ নিয়ে কোন পরিসংখ্যান পাইনি। আনুমানিক একটা হিসেবে দিয়েছেন এনবিআর এর সাবেক মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। তার দেয়া আনুমানিক হিসেবকে ধরেই আলোচনা করব।

ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদের মতে,
১। চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার ৫৭৬ জন হজে গেছেন। প্রতিজনে গড়ে ৩ লাখ টাকা ব্যয় নির্বাহ করলে এ খাতে মোট অর্থব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩১৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

২। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৭৮ লাখ গরু ও খাসি কোরবানি হয়েছিল। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) ধারণা এবার ৩০ লাখ গরু ও ৫৫ লাখ খাসি কোরবানি করা হবে। গরুপ্রতি গড় মূল্য ৩০ হাজার টাকা দাম ধরলে এ ৩০ লাখ গরু বাবদ লেনদেন হবে ৯ হাজার কোটি টাকা এবং ৫৫ লাখ খাসি (গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে) ৮২৫ কোটি টাকা অর্থাৎ পশু কোরবানিতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হবে।

৩। ২০ লাখ গরু আমদানির জন্য বাংলাদেশের শুল্ক-রাজস্ব (গরুপ্রতি ৫০০ টাকা হিসাবে) ১০০ কোটি টাকা অর্জিত হওয়ার কথা।

৪। চামড়া সংগ্রহ-সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণে ১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা জড়িত। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো প্রতি বছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ঋণ দেয়। বেসরকারি ব্যাংকগুলো প্রদান করে ৮০-১০০ কোটি টাকা।

৫। মাংস রান্নার কাজে ব্যবহূত মসলা বাবদ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে এ সময়ে। মসলার দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ঈদ উদযাপনের ব্যয় ব্যবস্থাপনাকে বেচাইন পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করায়। সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে শুধু মিয়ানমার থেকে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার মসলা অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে দেশে।

৬। ঈদ উপলক্ষে পরিবহন ব্যবস্থায় বা ব্যবসায় ব্যাপক কর্মতত্পরতা বেড়ে যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঈদে পরিবহন খাতে সাকুল্যে ২ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসা বা লেনদেন হয়।

এছাড়া কোরবানিকৃত পশুর সরবরাহ ও কেনাবেচার শুমার এবং পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় চাঁদা, টোল, বকশিশ, চোরাকারবার, ফড়িয়া, দালাল, হাসিল, পশুর হাট ইজারা, বাঁশ-খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার, পশু কোরবানি ও মাংস বানানো— এমনকি পশুর সাজগোজ বাবদও বিপুল অর্থ হাতবদল হয়। অর্থাৎ অর্থনীতিতে ফর্মাল-ইনফর্মাল ওয়েতে আর্থিক লেনদেন বা মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায় এ সময়ে।
(সূত্র: দৈনিক বণিক বার্তা)

তাহলে বাংলাদেশে কোরবানি ও হজ্বের মোট আর্থিক মূল্য দাঁড়াচ্ছে, ১৯ হাজার ১৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা। সেই সাথে আরো যেসব আনুসাঙ্গিক খরচ আছে তা অনুমান করে ধরলে মোট আর্থিক মূল্য ২০ হাজার কোটি টাকা পার করে যাবে।

এবার আসুন, দেখি এ টাকা দিয়ে আর কি কি করা যেতে পারত?

১। দেশের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এই ঈদের খরচ দিয়ে দেশের সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বছরের বাজেট নির্বাহ করা যেত। শিক্ষার্থীরা বিনা বেতনে অধ্যয়ন করতে পারত এক বছর।

২। আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা কারো পক্ষে প্রকাশ করা এখনও সম্ভব না হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী প্রায় দেড় কোটি। যদিও ২০০১ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যা ১.৬ ভাগ তথা মাত্র ১৬ লাখ। বিগত ২০০৯-১০ অর্থবছরে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতার আওতায় ৯৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো। এসিডদগ্ধ মহিলা ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন তহবিলে ২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো। প্রতিবন্ধী সেবা ও সহায়ক কেন্দ্র শীর্ষক একটি নতুন কর্মসূচী গ্রহণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা। অর্থাৎ সরকার প্রতিবন্ধিদের জন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখছেন বাজেটে। সে হিসেবে কোরবানির টাকা দিয়ে কয়েক বছর প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন করা সম্ভব হতো।

২০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে আরো অনেক কিছুই করা যায় জনগণের কল্যাণে। কোরবানি ও হজ্বের লক্ষ্য যদি হয় আল্লাহকে খুশি করা। তাহলে কি পশু কোরবানি আর হজ্বের পরিবর্তে সেই টাকা দিয়ে যদি দরিদ্র ও অসহায় জনগণের কল্যাণ করা যায় তাহলে কোনটা আমাদের করা উচিত?

***
ফিচার ছবি: আসাদুজ্জামান প্রামানিক/ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/ ঢাকা, অক্টোবর ২৬, ২০১২