ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

 

আগামী ১০ নভেম্বর শহীদ নুর হোসেন দিবস। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে মিছিলে গুলিতে প্রাণ হারান নূর হোসেন। নুর হোসেনের আত্মদানের পর পেরিয়ে গেছে অনেক বছর। সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের পত্তন হয়। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! যে সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদের মৃত্যুবরণ করেন আজ সেই এরশাদ মহজোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ক্ষমতায় আসীন।

আওয়ামীলীগ বা বিএনপি’র কাছে নুর হোসেন আজ অপাংক্তেয়। কিন্তু এদেশের মুক্তিকামী ও গণতন্ত্রমনা মানুষের কাছে নুর হোসেন আজো এক অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। আগামী ১০ নভেম্বর শহীদ নুর হোসেনের শহীদ বার্ষিকী। এবারের মৃত্যু বার্ষির্কীতে শহীদ নুর হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

বুকে পিঠে “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক” লিখে ‘৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ‘৯০ এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে যিনি শহীদের মুত্যু বরণ করেছিলেন, সেই নূর হোসেন কে জানাই লাল সালাম। নূর হোসেনের মত গণতন্ত্রকামী অগণিত বীর শহীদের আত্মদানের মধ্য দিয়েই ‘৯০ এ এরশাদের সামরিক শাসনের পরাজয় ঘটেছিলো। দেশবাসী সামরিক স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিল সাময়িকভাবে।

আজ নূর হোসেনকে আওয়ামীলীগ তাদের দলের নেতা দাবী করে। হয়ত: সে আঃ লীগের বনগ্রাম শাখার প্রচার সম্পাদকও ছিল। কিন্তু শ্রেণীগত জায়গা থেকে নুর হোসেন ছিলেন গরীব বাব-মায়ের সন্তান যিনি পেশাগতভাবে ছিলেন একজন ট্যাক্সিচালক। কিন্তু যে গণতন্ত্রের জন্য ‘৮২ থেকে ‘৯০ পর্যন্ত নূর হোসেনরা জীবন দিল? সেই গণতন্ত্র কি আজো অর্জিত হয়েছে?

গণতন্ত্র বলতে বুঝায় রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকাসহ দেশ ও ব্যক্তির যে কোন বিষয়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার, সংখ্যা গরিষ্ঠের মত এখানে প্রতিষ্ঠা পাবে। সকল শ্রেণী- পেশার মানুষ তাদের দাবী উত্থাপন করতে পারবে এবং ন্যায্য দাবীই প্রতিষ্ঠা পাবে। এক কথায় গণতন্ত্র এমন একটি শাসন ব্যবস্থা যেখানে আপামর জনগনই নির্ধারণ করবে তাদের ভবিষ্যত। স্বৈরাচারী বা একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণের কোন অধিকার বা ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়না। একজন বা গুটিকয়েক ব্যক্তিই সবকিছু নির্ধারণ করে এবং জনগণকে তা মানতে বাধ্য করে। তাই সাধারণ মানুষ বার বার যে কোন ধরনের স্বৈরাচারী শাসনকে প্রত্যাখান করেছে এবং গণতন্ত্রের পক্ষে তাদের রায় দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছে। কারন এই পথেই মানুষের অধিকার সংরক্ষিত হতে পারে। ইতিহাসের অগ্রগতিতে মানুষ তার ভুমিকা রাখতে পারে। অন্য কোন পথেই তা সম্ভব নয়। কিন্তু হায়! জীবন দিয়ে যে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই তা আজো অধরা।

আগেই আমরা প্রশ্ন রেখেছি- নূর হোসেন যে গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছিল সেই গণতন্ত্র সেই গণতন্ত্র কি অর্জিত হয়েছে?

উত্তরে বলতে হয়- শাসক বদলেছে, কিন্তু শাসন বদলায়নি। ‘৯০ এর পর যেসব সরকার সংসদীয় পথে ক্ষমতায় তারা কতটুকুই বা এদেশের মানুষের স্বার্থের প্রতিণিধি ছিল। বস্তুতঃ দেখা গেছে, ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামীলীগ বা বিএনপি ঠিকই নিজেদের আখের গুছিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। মন্ত্রী, আমলারা কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েছে, কিন্তু গরিব আরো গরিব , নিঃস্বরা আরো নিঃস্বতর হয়েছে। দারিদ্র, ক্ষুধা, মঙ্গায় মানুষের মৃত্য রোধ হয়নি। জীবনের নূন্যতম মৌলিক চাহিদাটুকু পূরণের মত ভাগ্যও হয়নি এদেশের সাধারণ মানুষের। দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিদেশী তথা আমেরিকা, ভারত, বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠীর স্বার্থে বিক্রি করা হয়েছে দেশের সম্পদ, দেশের শিল্প, কৃষি, প্রাকৃতিক সম্পদ সব। একে একে ধ্বংস করা হয়েছে যেন দেশটি তার মেরুদন্ডের উপর সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে, আজীবন বিদেশীদের দাস, গোলাম হয়ে থাকে।

‘৯০ পরবর্তী এই শাসন ব্যবস্থায় অচিরেই মানুষের মোহভঙ্গ ঘটে। মানুষ বুঝতে পারে সামরিক স্বৈরাচারের জায়গায় তাদের উপর চেপে বসেছে “সংসদীয় স্বৈরাচার”। যে স্বৈরাচাররা আগের মতই জনগণের স্বার্থ দেখেনা, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের ভূমিকার কোন স্বীকৃতি দেয় না। শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ মানুষ তাদের কোন ন্যায্য দাবী উত্থাপন করলে পুলিশ, আর্মি ও গুলির মুখে তাকে দমন করে। শুধুমাত্র ৫ বছর পর পর ভোটের মাধ্যমে মানুষকে দিয়েই জায়েজ করিয়ে নেয় যে কোন দল তাদের আগামী ৫ বছর শোষণ করবে। দেশের সম্পদ বিদেশীদের নিয়ে লুটেপুটে খাবে। এই ভোট দান বা সংসদীয় পথকেই তারা গণতন্ত্রের পথ বলে প্রতিষ্ঠার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়, যেখানে জনগণের অন্যান্য অধিকারকে কেবল কাজে কলমে স্বীকৃতি দিলেও কার্যতঃ এতটুকু স্বীকৃতি দেয় না। বর্তমান সরকারের আমলেও এই ধারা অব্যাহত আছে।

তাই নূর হোসেন যে গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছিলেন তা এই ভূয়া গণতন্ত্র বা গণতন্ত্রের লেবাসে কি স্বৈরতন্ত্র নয়? নূর হোসেন চেয়েছিলেন জনগণের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বা জনগণের গণতন্ত্র। যে গনতন্ত্রে দেশের শ্রমিক, কৃষক মেহনতি মানুষ তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনই হবেন প্রকৃত ক্ষমতার মালিক, যে গণতন্ত্র দেশের মেহনতি মানুষকে গরীব থেকে আরো গরীব নয়, বরং সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। যে গণতন্ত্রে দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সমানাধিকার স্বীকৃত হবে। তবেই পূরণ হবে নূর হোসেনের স্বপ্ন।

কিন্তু এই গণতন্ত্র তথা ” জনগণের গণতন্ত্র” অর্জিত হবে কিভাবে?
৫ বছর পর পর শাসক শ্রেণীর পালাবদলকে জায়েজ করার জন্য ভোট দিয়ে গেলেই এই গণতন্ত্র অর্জিত হবে না। যারা জনগণের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে, যারা গণতন্ত্রের শত্রু, সেই বিদেশী শোষক, আমেরিকা, ভারত, বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠী ও তাদের এদেশীয় প্রতিণিধি, তাদের দালাল বিভিন্ন দল, তথাকথিত সুশীল সমাজ, তাদের বাহিনী এদেরকে পরাজিত করেই এই গণতন্ত্রকে তথা জনগণের গণতন্ত্রকে মুক্তকরা সম্ভব। নিপীড়িত জনগণ তথা শ্রমিক, কৃষক মেহনতি মানুষের একটি সঠিক রাজনৈতিক পার্টিই জনগণের গণতন্ত্র অর্জনের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পারে।

তাই সামরিক স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সংসদীয় স্বৈরাচার বা সংসদীয় স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তির জন্য বর্তমানের মত অন্য কোন অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারের কোলে আশ্রয় নেওয়া আমাদের কাজ নয়; বরং জনগণের প্রকৃত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অর্জনের লড়াইকে বেগবান করে জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই আমাদের মহান দায়িত্ব। নূর হোসেনের কাছে এবং সকল বীর শহীদের কাছে আমাদের দায়।