ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

মিস্টার প্রেসিডেন্ট,
আমাদের প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারে আপনার সফর উপলক্ষে এই চিঠি লিখছি। দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রথমেই আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। আপনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বেশির ভাগ বাংলাদেশী বংশদ্ভূত আমেরিকানরা আপনাকে সমর্থন দিয়েছিলো। সুদূর বাংলাদেশে বসেও আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষনে ছিলাম আপনি নির্বাচিত হন কিনা।

নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমেই এশিয়ায় আমাদের কয়েকটি প্রতিবেশি দেশ সফর করছেন। এতে আমরা উপলব্ধি করতে পারছি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র আমাদের এতদ অঞ্চলকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে । এর মধ্যে একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ আপনার মায়ানমার সফর নিয়ে।

আগ্রহ থাকলেও আপনার মায়ানমার সফরের বিষয়বস্তু আমরা বিস্তারিত জানিনা। তারপরও যতটুকু জানতে পেরেছি রোহিঙ্গা ইস্যূ নিয়ে আপনি মায়ানমার কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করবেন। গতকাল শুক্রবার আপনার প্রশাসনের সিভিলিয়ান সিকিউরিটি ডেমোক্রেসি ও হিউম্যান রাইটস বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারী মারিয়া ওটোয়া একথা আমাদের জানিয়েছেন। আপনার মায়ানমার সফরের ঠিক পূর্ব মূহুর্তে ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মকর্তাদের নিয়ে আন্ডার সেক্রেটারী মারিয়া ওটোয়ার রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির পরিদর্শন করায় আমরা আশাবাদি হয়ে উঠেছি যে, দীর্ঘদিন নিপীড়নের শিকার হওয়া রোহিঙ্গারাদেরকে বিশ্ব এখনো পরিত্যাগ করেনি।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের কারনে আন্তর্জাতিক অবরোধের কবলে ছিল। ২০১০ সাল থেকে বর্তমান প্রক্রিয়াতে গনতন্ত্রায়ন শুরু হওয়াতে সেখানে বিশ্ব নেতাদের আনাগোনা শুরু হয়। বিশেষ করে নোবেল শান্তি পূরষ্কার বিজয়ী অং সান সূচী মুক্ত হওয়ার পর পশ্চিমা শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রধান কর্তা ব্যক্তিরা মায়ানমার ঘুরে গেছেন। সেখানে সর্বশেষ সংযোজন হলেন আপনি।

আমাদের এতদ অঞ্চলে সংস্কৃতি হচ্ছে, যার ঘরে যত বেশি অতিথি আসে সমাজে তার অবস্থান তত বেশি মর্যদা পূর্ণ হয়। আর এই অতিথিদের মধ্যে যদি শীর্ষ ব্যক্তিরাও থাকেন তাহলে বুঝতে হবে সেই ব্যক্তি এমন কিছু অর্জন করেছে যা অন্যদের জন্য রীতিমত ঈর্ষার কারন । কিন্তু আমরা এখনো বুঝতে অক্ষম যে প্রতিবেশি মায়ানমার এমন কি অর্জন করেছে যাতে বিশ্বের বড় বড় সব দেশের সরকার প্রধানরা তাদের অতিথি হচ্ছে? সাধারনভাবে আমরা জানি গনতন্ত্র এবং মানবাধিকারকে বিশ্বশক্তি যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ২০১০ সাল থেকে মায়ানমার গনতন্ত্রের পথে হাটা শুরু করেছে। দেশটি কবে নাগাদ পুরোপুরি গনতন্ত্র চালু করতে পারবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। এরমধ্যে সেখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্টির উপর কয়েক দফা নির্মূল অভিযান চালানো হয়েছে। রোহিঙ্গারা ছাড়াও আরো কয়েকটি ক্ষুদ্র জনগোষ্টি নিপীড়ন শিকার হয়েছে এবং হচ্ছে। যে বা যারা কারা এই নির্যাতনের সাথে যুক্ত থাকুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে, মায়ানমারের রাষ্ট্রযন্ত্র সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন বন্ধ করতে পারেনি। অথবা আদৌ পারবে কিনা তারও কোন নিশ্চয়তা নেই।

এই রকম একটি দেশে আপনার সফরকে আমরা দুই ভাবে ব্যাখা করতে পারি। প্রথমত হচ্ছে সেখানারকার গনতন্ত্র অথবা মানবাধিকার পরিস্থিতি যাই হোক, স্বার্থই বড় কথা, বানিজ্য অথবা অন্যকোন স্বার্থ রক্ষার করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মায়ানমার এসেছেন। অন্যদিকটি হচ্ছে, সেখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে দেশটিকে সহায়তা করা।

আপনার মায়ানমার সফরের কারন যদি প্রথমটা হয় তা হলে মায়ানমারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের অধিকার আদায় হবে সুদূর পরাহত। কারন এমনিতে তাদের উপর নির্যাতন নিপীড়ন চলছছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখেও মায়ানমার সরকার এই নিপীড়ন বন্ধ করেনি। বরং সেদেশের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী অং সান সূচী আরাকানের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের অধিকারকে অস্বীকার করে তাদেরকে বিদেশী বলে আখ্যা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশের সাথে মায়ানমারের স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপিত হলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর যে নির্যাতন চলছে তা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে গ্রহনযোগ্যতা পেয়ে যাবে।

আর আপনার সফরের উদ্দেশ্য যদি দ্বিতীয়টা হয়, তা হলে তা হবে এতদ অঞ্চলের জন্য এক ঐতিহাসিক ঘটনা। গনতন্ত্রের পথে হাটা শুরু করা মায়ানমারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি, সেটব আমি আগেই বলেছি। সেখানে রোহিঙ্গা ছাড়াও আরো অনেক ক্ষুদ্র জনগোষ্টি রয়েছে, যারা এখনো অধিকার আদায়ের সংগ্রামে লিপ্ত। এরমধ্যেও পশ্চিমা বিভিন্ন কোম্পানী সেখানে বিনিয়োগ শুরু করেছে। কিন্তু সেখানে সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরে না আসলে এই বিনিয়োগে কোনভাবেই নিরাপদ হবেনা। সূতরাং এই বিনিয়োগ সুরক্ষা করতে হলে সেখানে স্থিতিশীলতাটায় জরুরী। এই সহজ সত্যটি আপনি এবং আপনার প্রশাসন নিশ্চয় উপলব্ধি করতে পারেন।

আমরা আশা করবো আপনার সফরের উদ্দেশ্য হবে দ্বিতীয়টায়। আর এতে আপনি এবং আপনার দেশ এবং প্রশাসন স্মরনীয় হয়ে থাকবেন এখানকার মানুষদের মধ্যে।

সবশেষে আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি


৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. আইরিন সুলতানা বলেছেনঃ

    ব্লগারদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটি প্রতিবেদন এর অডিও পডকাস্ট শুনে দেখার অনুরোধ করছি – রোহিঙ্গা ইস্যু-ওবামা’র মিয়ানমার সফর: ব্লগারদের প্রতিক্রিয়া । ধন্যবাদ।

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...