ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ‘ডরিমন’ নামক একটা কার্টুন সিরিয়ালকে ঘিরে এক ধরনের বিতর্ক শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমের এই বিতর্কের রেশ এখন ছড়িয়েছে সাধারণ গৃহস্থের ড্রয়িং রুম থেকে বিভিন্ন সভা-সেমিনারের বক্তাদের মুখে। সম্ভবত ডরিমন বিতর্ক শুরু হয়েছিলো মাস তিনেক আগে প্রথম আলোর উপ-সম্পাদক জনাব আনিসুল হকের একটা লেখার সূত্র ধরে। লেখাটিতে তিনি তাঁর বোনের ছোট্ট মেয়েটির মুখের ভাষাকে কিভাবে ডরিমন বাংলা থেকে হিন্দীতে বদলে দিয়েছে তাঁর বেশ একটা আবেগঘন বর্ণনা দিয়েছিলেন। সে লেখার সূত্র ধরেই এরপর বিভিন্ন পাঠক তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকেন পত্রিকায়, কেউবা ফেসবুকে, ব্লগে। ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস। অতএব এ সময়ে ডরিমন বিতর্ক ‘হটকেকে’ পরিণত হয়। টিভি চ্যানেলগুলোও তাঁদের প্রতিবেদনে কিভাবে ডরিমন কিংবা ছোটা বীমরা এদেশের বাচ্চাদেরকে গ্রাস করে ফেলছে, তাঁদের ভিনদেশী ভাষা-সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করে তুলছে তাঁর ফিরিস্তি তুলে ধরতে থাকে। আর পত্রিকাগুলো একের পর এক সিরিজ আকারে প্রকাশ করতে থাকে পাঠক অভিমত। আমাদের বুদ্ধিজীবি জনসমাজ সেটাকে লুফে নেন এবং তাঁদের রুটিন আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয় এটি। সবার কথা শুনে মনে হয় যত নষ্টের গোড়া ঐ ব্যাটা ডরিমন। অতএব তাঁরা ডরিমনের মুণ্ডুপাত করেন, সরকার এবং অন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করেন ডরিমন নামক এই মহা শয়তানকে যেন এখনই থামানো হয়। কেউ কেউ অবশ্য বাংলায় ডাবিং করে ডরিমনসহ অন্য জনপ্রিয় কার্টুনগুলো সম্প্রচার করতে বলেন।

জাতি হিসেবে আমরা আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য বিষয়ে বেশ সচেতন। কিন্তু সেই সচেতনতার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় অন্যের পছন্দ-অপছন্দ, ভালোলাগা-মন্দলাগা কিংবা অধিকারের কথা। বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে আমাদের অসচেতনতা সর্বাধিক। আমরা মনে করি শিশুদের কোন আলাদা পছন্দ থাকতে নেই, শিশুরা চলবে আমাদের পছন্দ অনুযায়ী। তাই আমাদের চাওয়া-পাওয়া বা ভাবনার জায়গাগুলোতে শিশুদের চাওয়া-পাওয়া বা পছন্দ-অপছন্দের জায়গা নেই। সে কি পড়বে, কি খাবে, কি খেলবে, কি দেখবে, কি শিখবে সব কিছুতেই আমাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। শিশুর স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্ত্বা আমাদের কাছে অবহেলিত। শিশুদের প্রতি অবহেলার চিত্র গ্রাম অপেক্ষা শহরেই বেশি। শহরের শিশুদের কাছ থেকে আমরা খেলার মাঠ কেড়ে নিয়েছি, বেড়াবার পার্ক ছিনিয়ে নিয়েছি, হাটার পথ দখল করে নিয়েছি। ফলে বাসার বাইরে খেলাধুলা বা বিনোদনের কোন সুযোগ তাঁদের নেই। বাসার সামনের গলিতে বসে খেলবে সে জোও নেই, শিশু পাচারকারীদের ভয়ে আমরা ওদেরকে বন্দী করে ফেলেছি চার দেয়ালের বৃত্তে। শিশুদের জীবনকে আমরা আরো নিরানন্দময় করে তুলেছি ওদের কাঁধে ওদের ওজনের চেয়ে বেশি বইয়ের ভার তুলে দিয়ে। সে বইয়ের পাঠেও আনন্দ নেই, আছে কেবল নিরস শব্দ-বাক্য মুখস্ত করার তাড়না। বিশাল বইয়ের বোঝা নিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা, স্কুলে শিক্ষকদের নিরানন্দ পাঠ, আর বাসায় ফিরে অধিকাংশ সময় ‘হোমওয়ার্ক’ নিয়ে ব্যস্ত থাকার পর খুব একটা সময় ওদের অবসর থাকে না। অবসর বলতে খাবার, গোসল কিংবা কাজের ফাঁকে একটু টিভি দেখা। সারাদিন বাসায় থেকে আর পড়ার চাপে খাবারের প্রতি শিশুদের আগ্রহ থাকে না। কিন্তু মায়েদের তাড়না বাচ্চাকে খাওয়াতেই হবে। অতএব এই বেলা টিভি ছেড়ে দেন বাচ্চাদের সামনে আর ভুলিয়ে-ভালিয়ে খাইয়ে নেন বাচ্চাকে। কিন্তু কি দেখবে ওরা টিভিতে?

বাংলাদেশে এই মুহুর্তে দেড় থেকে দুই ডজন চ্যানেল আছে। কিন্তু সেই চ্যানেলগুলোতে শিশুদের জন্য কোন অনুষ্ঠান নেই বললেই চলে। যতদূর মনে পড়ে বিটিভিতে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সিসিমপুর, মীনা এবং মনের কথা নামে তিনটা অনুষ্ঠান চালু আছে, দেশ টিভিও মাঝে মাঝে মীনা কার্টুন দেখায় এবং অন্য দুয়েকটা চ্যানেল টম এন্ড জেরি ডাবিং করে দেখায়। শিশুদের অনুষ্ঠান বলতে সব মিলিয়ে এই গোটা চারেক। বাকী সব ধারাবাহিক নাটক, খবর, টক-শো, রান্নার অনুষ্ঠান আর প্রতিভা অন্বেষণের জোয়ারে ভরা; যা শিশুদের রঙ্গিন জগতে মূল্যহীন। কাঠখোট্টা কথাবার্তা, হাঁড়ি-কড়াইয়ের ঘটমটি কিংবা প্রেম-রোমান্স-ট্রাজেডি এসব জটিল বিষয় শিশুদের আকর্ষণ করে না। শিশুদের চিন্তা সরলরৈখিক, ভাবনার জগত পূর্ণ বিচিত্র রঙ্গে, ওদের বিচরণ কল্পনা আর রূপকথার রাজ্যে। স্থিতি নয় বরং বস্তুর দ্রুত নড়াচড়া এবং বর্ণিল উপস্থাপনা শিশুদের আকর্ষণ করে। ফলে স্বভাবতই কার্টুন সিরিজগুলো শিশুদের কাছে আকর্ষণীয়। তাঁর ওপর যখন সেসব কার্টুন চরিত্রগুলো শিশুদের অবচেতন চাওয়াগুলোকে দ্রুতই সম্ভব করে তোলে তখন সেসব চরিত্র হয়ে ওঠে শিশুদের আইডল। এ কারণেই দেখি আমার বাসার ছোট মেয়েটি ভীম হতে চায়, ভীমের মত পেশি ফুলিয়ে নিজের শক্তি জাহির করে, ডরিমনের মত কাউকে চায় দ্রুত ওর মনের চাওয়াগুলোকে পূরণ করে দেয়ার জন্য। তাই তো বাংলা চ্যানেল না দেখে দ্রুত চ্যানেল বদলে চলে যায় কার্টুন নেটওয়ার্ক, পোগো কিংবা ডিজনি চ্যানেলে। সেখানে ভাষা কি তা ওদের বিবেচ্য নয়, বাঁধাও নয়। শিশুদের শেখার বৈশিষ্ট্য হল- ওরা পড়ে নয় বরং দেখে এবং শুনে শেখে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এসব কার্টুন চরিত্রের ভাষা, কথা-বার্তা বা আচরণ অবচেতনভাবেই শিশুরা আয়ত্ব করে ফেলে। সেই সূত্রে হিন্দী-ইংরেজি আয়ত্ত্ব করে ফেললে আমি শিশুকে যেমন দোষ দিতে পারি না, তেমনি অভিভাবক হিসেবে নিজেকেও দোষ দিতে পারি না। তাহলে দোষ কার?

পূর্বে বলেছি, আবারও বলি- বাংলাদেশে এখন হাত গুণে এক কুড়ির মত চ্যানেল আছে এবং সে চ্যানেলগুলো সবই একই ধরনের প্রোগ্রাম দিয়ে ভরা। সব চ্যানেলেই একই খবর দিনে অন্তত দশবার সম্প্রচার হয়, একই ধরনের টক-শো অন্তত ২/৩ টা হয়, পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ আর বস্তাপঁচা দীর্ঘ ধারাবাহিক হয় প্রতিদিন অন্তত ২/৩ টা, ফোনোলাইভ প্রোগ্রাম হয় অন্তত ১/২ টা, রান্নার অনুষ্ঠান হয় সপ্তাহে অন্তত ২/৩ টা। এর কোন ব্যতিক্রম সাধারণত চ্যানেলগুলোতে দেখা যায় না। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে একই ধরনের প্রোগ্রাম আবার চ্যানেলগুলো কাছাকাছি সময়ে প্রচার করে। চ্যানেলগুলোর নিজস্বতাও তেমন একটা দেখা যায় না। কোন চ্যানেল একটা নতুন প্রোগ্রাম শুরু করলে অন্যগুলোও এর অনুকরণে এই প্রোগ্রামই শুরু করে দেয় অন্য নাম দিয়ে। সবচেয়ে বিরক্তিকর এবং খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রমগুলো। প্রতিভা অন্বেষণের নামে চ্যানেলগুলো যা করছে তাকে আর যাই বলা হোক অন্তত প্রতিভা অন্বেষণ বলা যায় না। চ্যানেলে চ্যানেলে প্রতিভার ছড়াছড়ি। একই সময় ৫/৭ টা চ্যানেল একই বিষয়ের উপর প্রতিভার খোজে নেমে যায় এবং শেষমেষ প্রতিভা হিসেবে ঘোষণা দেয়। চ্যানেলভিত্তিক এ ধরনের প্রতিভাদের মধ্যে কে যে প্রতিভা আর কে যে প্রতিভা নয় সেটা আর বুঝে উঠতে পারে না সাধারণ জনগণ। সুতরাং এধরনের হ-য-ব-র-ল থেকে সাধারণ মানুষও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। রিমোটের বোতাম টিপলেই যেখানে বৈশ্বিক বিনোদনের দ্বার অবারিত সেখানে দর্শক কেন বসে থাকবে এইসব বস্তাপঁচা অনুষ্ঠান দেখার জন্য? আর শিশুদেরকেই বা আমরা কিভাবে বাধ্য করি এ ধরনের দেশীয় প্রোগ্রাম দেখতে?

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সংখ্যায় রস আলোর প্রচ্ছদে লেখা ছিলো- একুশ তারিখ রহিমন করিমন, বাইশ তারিখ বেনটেন ডরিমন। লাইন দুটো কেবল শিশুদের টিভি প্রোগ্রামের দিকে ইঙ্গিত করে না, এটি আমাদের জাতিগত চরিত্রকেও উন্মোচন করে। আমরা প্রচণ্ড হুজুগে এবং উদযাপন প্রিয়। ফলে আমাদের দেশপ্রেম সীমাবদ্ধ মার্চ আর ডিসেম্বর মাসে। ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের মনে পড়ে ভাষার অবক্ষয়ের কথা, ভাষার অবক্ষয়ে হিন্দী-ইংরেজি ভাষা আর টিভি চ্যানেলের আধিপত্যের কথা, আরো মনে পড়ে ভাষার শুদ্ধতা রক্ষার কথা। জোর আলোচনা চলে অফিস-আদালতে সর্বত্র বাংলা চালু করার জন্য, প্রস্তাব আসে একটা ভাষানীতি করার। কিন্তু ফেব্রুয়ারি চলে গেলেই আমরা ভুলে যাই সব। ভুলে যাই আমাদের কি করতে হবে বা কি করতে পারি। অন্যদের কথা বাদ দেই, শিশুদের জন্য কি করা যায় তা নিয়ে ভাবি। অনেকেই প্রস্তাব করেছেন শিশুদেরকে এই বিজাতীয় সংষ্কৃতি চর্চা থেকে ফিরিয়ে আনতে তাঁদেরকে ডরিমন, বেনটেন বা ছোটা ভীম না দেখাতে। তাঁদের কাছে আমার বিনীত জিজ্ঞাসা- আমরা কি শিশুদের জন্য এমন কোন বিকল্প তৈরি করতে পেরেছি যা দিয়ে ডরিমন বা বেনটেনকে প্রতিস্থাপন করব? না আমরা পারিনি। আমি আগেই বলেছি আমরা শিশুদের জীবনকে নিরানন্দময় করে তুলেছি। সুতরাং কোন বিকল্প তৈরি না করে শিশুদের জীবনের এই ন্যূনতম আনন্দের উৎসটুকু আমরা কেড়ে নিতে পারি না। সেই নৈতিক অধিকার আমাদের নেই। তাহলে?

শিশুরা আমাদের ভবিষ্যত। তাদের উপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশ। সুতরাং ভবিষ্যত বাংলাদেশকে আমরা কিভাবে গড়ে তুলবো সেজন্য আমাদের পরিকল্পনা থাকা দরকার। ওদেরকে দেশপ্রেম, দেশীয় ঐতিহ্য, ভাষা-সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন কর তুলতে সুনির্দিষ্ট পথ নির্দেশ ও এর বাস্তবায়ন দরকার। এজন্য খুব বেশি আয়োজন বা সম্পদের প্রয়োজন নেই। আমাদের যে সম্পদ আছে তাঁর মধ্য দিয়েই আমরা শিশুদের জন্য নির্মল বিনোদন আর বেড়ে ওঠার সহগ যোগাড় করে দিতে পারি। শহরে খেলার মাঠ বা পার্ক নেই বললেই চলে। কিন্তু যেগুলো আছে সেগুলোও তো শিশুদের জন্য উন্মুক্ত নয়। প্রত্যেকটা আবাসিক এলাকাতেই অন্তত ১/২টা মাঠ আছে। কিন্তু সেগুলো দখল হয়ে গেছে বা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্থানীয় কমিউনিটি উদ্যোগ নিয়ে এ মাঠগুলো দখল মুক্ত করে শিশুদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারে। কমিউনিটিকে এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। কমিউনিটির সকল পরিবারেই শিশু আছে। আর সেই শিশুদের বিকাশে খেলাধুলা অপরিহার্য। খেলাধুলা কেবল শিশুর শারীরিক বিকাশই ঘটায় না, শিশুর মানসিক বিকাশ, সামাজিক বিকাশসহ সার্বিক বিকাশে খেলাধুলা অপরিহার্য। শিশুদের মাঠের আনন্দের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারলে ওরা আর টিভি নির্ভর হয়ে ঘরে বসে থাকবে না। এক্ষেত্রে মাঠে শিশুদের নিরাপত্তার জন্য কমিউনিটিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাবা-মাকেও সচেতন থাকতে হবে যেন তাঁরা সময় করে শিশুকে মাঠে নিয়ে যান।

এবার আসি শিশুদের পাঠের বিষয়ে। বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের পাঠ্যসূচি দেখলে মনে হয় তাঁরা শিশুকালেই একেকজনেক বিদ্যাসাগর বানিয়ে ফেলতে চায়। পাঠের চাপে শিশুরা খুব একটা অবসর সময় পায় না খেলাধুলা বা অন্য বিনোদনের জন্য। আমার বাসার ছোট্ট যে ছেলেটি শিশু শ্রেণীতে পড়ে তাকে সাময়িক পরীক্ষার আগে ইংরেজির জন্য ট্রান্সলেশন, ইংরেজি বাক্য গঠন ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ৩০০ বাক্য দেয়া হয়েছে সিলেবাস হিসেবে। যেহেতু এ পর্যায়ে গ্রামারের কোন নিয়ম-কানুন শেখানো হয় না সুতরাং এগুলো ওদেরকে মুখস্ত করে যেতে হয় পরীক্ষার জন্য। প্রত্যেকটা বিষয়েই এমন পাঠের চাপ আছে। শিশু শ্রেণীতে মুখস্ত করা এসব শব্দ বাক্য ওদের কি এমন কাজে আসবে বা মেধার এমন কি বিকাশ ঘটাবে আমার জানা নেই। আমি জানি না বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা অভিভাবকগণ তা জানেন কি না। আমি তো দেখি এটা শিশুদের বিকাশের পরিবর্তে বিকাশকে ব্যাহত করছে। না বুঝে মুখস্ত করা এসব পাঠের চাপ শিশুদের ভেতর এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করছে। আমার এক বন্ধু বললো পড়ার চাপে ওর ছোট ভাগনেটি পরীক্ষার আগের রাতে ঠিকভাবে ঘুমাতে পারে না, মাঝে মাঝেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। আমার আশেপাশেও আমি এমন চিত্র দেখেছি। এটা শিশু নির্যাতন বৈ কিছুই নয়। আমার জানামতে অনেক দেশেই শিশুদের বাসায় কোন পাঠ্যবই দেয়া হয় না, স্কুলে রেখে আসতে হয়। স্কুলের পাঠ স্কুলেই শেষ, বাসার জন্য আলাদা কোন পড়া নেই। ঢাকায় অবস্থিত অ্যামেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে গিয়েছিল আমার ছোট ভাই। সেখানেও নাকি একই ব্যবস্থা। আমাদের অতি সচেতন অভিভাবক বা বিদ্যালয় তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী শিশুদের মঙ্গল চাইতে গিয়ে ভুলে যান যে শিশুরাও মানুষ। ওদেরও একটা মন আছে, একটা শরীর আছে যার বিকাশের প্রয়োজন। খাবার হজমের জন্য যেমন বায়ু বা জলের দরকার আছে, তেমনি পঠিত বিষয়গুলো হজমের জন্য অবসর-বিনোদন বা খেলাধুলার দরকার আছে। শিশুদের মস্তিষ্ক কেবল কাগজে ঠাসা হয়ে গেলে তা রবীন্দ্রনাথের ‘তোতা কাহিনী’র সেই তোতা পাখি কিংবা ‘ছুটি’ গল্পের ফটিক চক্রবর্তীর মত হয়ে যাবে, যার পরিণতি অকালে ঝরে যাওয়া।

এবার আসা যাক টেলিভিশন বিনোদন প্রসঙ্গে। শিশুদেরকে বিদ্যালয়ের পাঠের চাপ থেকে মুক্তি দেয়া বা খেলাধুলার সুযোগ দেয়া হলেও ওদেরকে আমরা টিভি দেখা থেকে সম্পূর্ণ নিরস্ত করতে পারব না। দিনের একটা সময় ওরা টিভির সামনে বসবেই। সুতরাং শিশুদের টেলিভিশন বিনোদন নিয়ে আমাদের আলাদা ভাবনার দরকার আছে। এদেশের এতগুলো চ্যানেলের দু’য়েকটা কি চাইলেই শিশুদের জন্য আলাদা চ্যানেল হিসেবে গড়ে তোলা যায় না? বিদ্যমান চ্যানেলগুলো রাজি না হলে সরকার নতুন চ্যানেল অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে তা শিশুতোষ চ্যানেল হিসেবে অনুমোদন দিতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যমান চ্যানেলগুলোতে শিশুদের উপযোগী অনুষ্ঠান চালানোর জন্য কড়াকড়ি শর্তারোপ করতে পারে। চ্যানেলগুলোতে বিটিভির খবর প্রচারের চেয়ে এটা বেশি জরুরি। দুয়েকটি চ্যানেল পূর্ণ শিশুতোষ চ্যানেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। অনেকেই বলবেন যে এ ধরনের চ্যানেল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা সম্পন্ন লোকের অভাব আছে এদেশে। হ্যাঁ, আমিও স্বীকার করি প্রয়োজনের তুলনায় দক্ষতা সম্পন্ন লোকের অভাব আছে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে সুযোগ তৈরি হলে লোক তৈরি হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। শিশুতোষ চ্যানেলগুলোকে মূলত নির্ভর করতে হয় অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের ওপর। আমাদের দেশে এ ধরনের চলচ্চিত্র তৈরি করার লোক কম হলেও নেই এমন নয়। আমি কিছু হাউজকে জানি যারা অ্যানিমেশন ভিডিও তৈরি করে এবং সেসব অ্যানিমেশনের মান বেশ ভালো। যতদূর মনে পড়ে আমি এসএসসি পর্যায় পড়ার সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘মন্টু মিঞার অভিযান’ নামে একটি অ্যানিমেশন ভিডিও প্রচারিত হয়েছিল। খুবই চমৎকার কাজ ছিলো সেটি। কিন্তু এরপর আর এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে দেখিনি। আমরা যদি ১/২ টা চ্যানেল তৈরি করতে পারি তাহলে সেখানে অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের একটা চাহিদা তৈরি হবে। ফলে এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনশক্তি তৈরি হবে, অ্যানিমেশনের জন্য বিভিন্ন ফার্ম গড়ে উঠবে। এসব ফার্মের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি হবে, যার ফলে অ্যানিমেশনের মান ভালো হবে। এই চিন্তাটি বাংলাদেশে অ্যানিমেশন সেক্টরের বিকাশে এক ধরনের বিপ্লবও বয়ে আনতে পারে। কারণ আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে এদেশে যে ক্ষেত্রেই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে আমাদের লোকেরা সেটাতে সাফল্য লাভ করেছে। আমাদের তথ্য-প্রযুক্তি খাতের বিকাশেও তা সহায়ক হবে। পাশাপাশি ভালো কাজ হলে তা রপ্তানিরও একটা সুযোগ এনে দিতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ স্ক্রিপ্ট লেখা, সম্পাদনা, কণ্ঠ দেয়া এসব নানা ক্ষেত্রেও নতুন নতুন লোকের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

আমি বলছি না যে এখনই আমরা সব অর্জন করে ফেলব বা এখনই একটা/দু’টা পূর্ণ চ্যানেল আমরা চালাতে পারব। তবে উদ্যোগ নিলে আমরা শিগগিরই তাঁর জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারব। যতদিন না হয় ততদিন দেশীয় হাউজগুলোতে তৈরি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রগুলো চলবে। পাশাপাশি বিদেশী চ্যানেলগুলোতে যেসব জনপ্রিয় অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র চলছে তা বাংলায় ডাবিং করে সম্প্রচার করা যেতে পারে। অন্য চ্যানেলগুলোর মত যত্রতত্র প্রতিভা না খুঁজে এই চ্যানেলগুলো বরং এনিমেশন ডেভেলপার খোঁজার প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে পারে। সেটা এ ধরনের কাজে এক ধরনের প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে এবং এক্ষেত্রে দক্ষ লোকদের খুঁজে বের করতে সহায়তা করবে। একুশে টেলিভিশনের একটি উদ্যোগ এদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতার ধারা পালটে দিয়েছিল। এদেশের অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের নতুন যুগের সূচনা করতে এমন একটা উদ্যোগ বড় প্রয়োজন। এর জন্য খুব বেশি কিছুর দরকার নেই। প্রয়োজন সদিচ্ছা আর তাঁর বাস্তবায়ন। তাহলে অন্তত আগামী দিনে শিশুদের কাছ থেকে কিছুটা হলেও দায়মুক্ত থাকতে পারব। শিশুদেরকে আকাশ সংস্কৃতির জোয়ারে ছেড়ে দিয়ে আমরা হাত-পা গুটিয়ে বসে ছিলাম এই অপবাদ অন্তত শুনতে হবে না।


৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. আধারের বাসিন্দা বলেছেনঃ

    এত সুন্দর একটা পোস্ট করলেন অথচ কেউ কোনও প্রতিক্রিয়া দেখালোনা । বিষয়টা অদ্ভুত মনে হল । কিন্তু এখন যদি আপনি রাজনৈতিক কোনও পোস্ট দিতেন তাহলে দেখতেন, প্রতিক্রিয়া ভেসে যেতেন । গুণীদের দাম নেই এই সমাজে । মিথ্যাবাদী-লোভী হউন আর টিকে থাকুন অনন্তকাল । :(

  •  Bangladesh: Cartoon Makes Kids Learn Foreign Language And Lies :: Elites TV
  •  Bangladesh: Gaan kinderen door een tekenfilm een vreemde taal spreken en liegen? · Global Voices in het Nederlands
  •  The 3rd world view Bangladesh: Is a Cartoon Teaching Kids to Speak Foreign Language and Lie? | The 3rd world View
  •  Bangladesh: Palabas na Cartoon, Nagtuturo sa mga Bata ng Dayuhang Wika at Pagsisinungaling · Global Voices sa Filipino
  •  Attack-E.Disney-OBJ: BANGLADESH…Sector-pequeño…. | Rey de reyes -Tigran el grande
  •  Global Voices | 孟加拉:哆啦A梦卡通戕害儿童? - 中国数字时代
  •  Global Voices | 孟加拉:哆啦A梦卡通戕害儿童? - 中国数字时代
  •  Bangladesz: Czy kreskówka uczy dzieci mówić w obcym języku oraz kłamać? · Global Voices po polsku
  • কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...