ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

রাজধানীতে অনেক সরকারি স্কুল প্রায় সারা বছর বন্ধ থাকে। এগুলোতে ক্লাস খুব একটা হয় না। ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসে শিক্ষার আয়োজনের চেয়েও এই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মচারি নিয়োগের পরীক্ষা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এই যেমন, এএসসি, এইচএসসি, প্রাথমিক সমাপনী, জুনিয়র সার্টিফিকেট ইত্যাকার হাজারো ধরণের পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা ও তাদের জন্য পরীক্ষার হলের সংস্থান করতে করতেই তারা ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ক্লাসরুম বরাদ্ধ করতে পারেন না।

বিভিন্ন পূজা-পার্বণসহ উপরিউল্লিখিত পরীক্ষাগুলোর পর স্কুল যখন খোলে তখন ছাত্র-ছাত্রীদের শুরু হয় পরীক্ষা। শিক্ষকরা পড়াতে না পারলেও পরীক্ষা নিতে ভুল করেন না। আমি দেখি, আমার ছেলেটি স্কুল বন্ধের কারণে হয় বাসায় বসে আছে, নয়তো স্কুলের পরীক্ষা দিচ্ছে। ওরে বাপ সে কি পরীক্ষা! প্রশ্নপত্রের ধরণ দেখলে টাস্কি লাগে। তার সমাজ বিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রখানা চার পৃষ্ঠা লম্বা। শূন্যস্থান থেকে সত্য-মিথ্যা হয়ে বিস্তারিত লেখার বিষয়টিও অন্তর্ভূক্ত। আবার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, খাতায় প্রশ্ন তুলে সত্য-মিথ্যা নির্ণয় কর। দেখুন মজা! বড়-ছোট মিলে দশটি বাক্য দেওয়া হয়েছে। এগুলো সত্যা না মিথ্যা তা নির্ধারণ করতে হবে। প্রশ্নের নম্বর খাতায় উঠিয়ে তা সত্যা না মিথ্যা লিখলে দোষ কি। কিন্তু না, ছাত্রকে প্রশ্নপত্র দেখে দেখে সমূদয় বাক্য আগে পরীক্ষার খাতায় তুলতে হবে। তারপর বলতে হবে এটা সত্য না মিথ্যা। দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির একজন বাচ্চা পরীক্ষার খাতায় প্রশ্ন তুলতে তুলতেই নির্ধারিত সময় শেষ করে দেয়। একে তো লম্বা প্রশ্ন তার উপর আবার সব খাতায় তুলতে হবে। একজন কোমলমতি শিশুর মগজে এই যে বাড়তি চাপ তার কোন কি মানে হয়?

চতুর্থ শ্রেণিতে আমার ছেলেকে ইংরেজিতে পত্র লিখন শিখতে হচ্ছে। প্রতি প্রান্তিকে তার দুটো করে পত্র-আবেদন লিখা শিখতে হয়। কিন্তু মাজার ব্যাপার হল, তার সিলেবাসে কিন্তু বাংলায় পত্র লিখন শেখার কোন ব্যবস্থা নেই। তাহলে আমাদের সন্তানরা কি আগে ইংরেজিতে পত্র লিখা শিখবে তার পরে শিখবে বাংলায়? তাহলে রবীন্দ্রনাথের সেই, প্রথমে চাই বাংলার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শেখার পত্তন — উক্তিটি গেল কই? আমরা হাল আমলে কি আগে ইংরেজির গাঁথুনি দিয়ে পরে বাংলা শিখছি। ভাষা শিক্ষার ব্যাপারে মাতৃভাষার অগ্রগণ্যতার যুগ কি তাহলে শেষ? শিশু মনোবিজ্ঞান আমাদের অজান্তেই কি অন্যরূপ তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে?

আমার ছেলের সিলেবাসে বোর্ডের বইয়ের বাইরেও কিছু ব্যাকরণ টেক্সট রয়েছে। এই সহযোগী বইগুলো নিয়ে প্রতি বছরই শুরু হয় একটি অসুস্থ ব্যবসা। প্রথমে সিলেবাসে একজন লেখকের বাংলা বা ইংরেজি ব্যাকরণ দেওয়া হয়। বইয়ের লিস্ট হাতে পেয়ে অভিভাবকগণ দ্রুত সেই বই কিনে ফেলেন। মাস খানেক পরে সেই বই পরিবর্তন করে অন্য একটি বই কিনতে বলা হল। সামলাও ঠেলা! এক মাস পরে আবার অন্য একটি বই কিনুন। শুনেছি, এক শ্রেণির শিক্ষক প্রকাশকদের কাছ থেকে পার্সেনটেজ নিয়ে এই কাজটি করে থাকেন। দুই/তিনজন প্রকাশকের কাছ থেকে পারসেন্টেজ খেয়ে এই ভাবে ছাত্রদের ক্ষতি করে উভয় প্রকাশককে কিছু কিছু বই বিক্রি করার সুযোগ করে দেন।

নিম্ন শ্রেণিতে যেসব ব্যাবকরণ বই লিস্টে দেওয়া হয়, সেগুলো নিতান্তই বড়দের উপযোগী করে তৈরি করা। একটি বই দিয়েই লেখকরা গোটা প্রাথমিক বিদ্যালয় সামাল দিতে চান। তাই যে বই তৃতীয় শ্রেণির জন্য মনোনীত করা হয়েছে, তা মূলত পরিকল্পণা করা হয়েছে পঞ্চম শ্রেণির জন্য। স্কুলের সাথে সমঝোতা হলে বইয়ের প্রথম কয়েকটি পাতা পরিবর্তন করে তাতে ‘তৃতীয় শ্রেণির জন্য’ এই জাতীয় কথা লিখে দিলেই হল। বইয়ের ভিতরের দিকে তাকালে বোঝা যাবে, এই বইটি মূলত পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার জন্যই পরিবল্পনা করা হয়েছে।

২০১২ সালের জন্য আমার ছেলের স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে যে ব্যকরণ পাঠ্য বই দেওয়া হয়েছিল তার নাম ছিল, প্রাথমিক বৃত্তি ব্যাকরণ ও রচনা। শিরোনামই বলে দেয় বইটি আসলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এই বইটি পাঠ্য করা হল চতুর্থ শ্রেণির জন্য।

বইটিতে যে রচনাগুলো দেওয়া হয়েছে তা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রী কেন, আমার মতে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যও কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন, গত পরীক্ষার সিলেবাসে ছিল মাতা-পিতার প্রতি কর্তব্য রচনাটি। এই রচনায় ত্রিশটি লাইনে প্রায় পাঁচশত শব্দ ছিল। রচনার ভূমিকাটি ছিল নিম্নরূপ:

পাশ্চাত্য মনীষী ও সুপ্রসিদ্ধ লেখক রাস্কিন বলেছেন, এ পৃথিবীতে মানুষের তিনটি কর্তব্য Duty towards God, duty towards parent and duty towards mankind’.মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) বলেছেন, ‘মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেস্ত। পবিত্র কুরআন শরীফে ঘোষিত হয়েছে, ‘ মানুষকে সর্বপ্রথম কর্তব্য সাধন করতে হবে আল্লাহর প্রতি, তারপরই করতে হবে মাতাপিতার প্রতি। হিন্দু শাস্ত্রে আছে, পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাই পরম তপস্য; জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী।

আমার জানতে ইচ্ছা করে, যিনি এই রচনাটির জন্ম দিয়েছেন, তিনি কি চতুর্থ শ্রেণির একজন শিশু শিক্ষার্থীকে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ভেবেছেন, না তাদের প্রত্যেকে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের এক একজন বাঙালি সংস্করণ মনে করেছেন।

একই কথা খাটে ইংরেজি ব্যকরণ বইগুলো সম্পর্কে। ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক যোগ্যতাকে আমলে না নিয়ে কতিপয় অখ্যাত লেখকের ব্যকরণ বই দিয়ে তাদের মগজর কোষগুলোকে ছিঁড়ে ফেলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই বইগুলোর আয়তন আর ভিতরের দাঁতভাঙ্গা রচনাগুলো পড়ে নয়, দেখেই ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার প্রতি বিতৃঞ্চার সৃষ্টি হচ্ছে।

এই তুলনায় বলব, আমাদের বোর্ডের পাঠ্য বইগুলো অনেক বেশি সম্মৃদ্ধ। এখানে সাহিত্যের পাশাপাশি ব্যকরণ শেখার যথেষ্ঠ উপাদান রয়েছে। আমাদের শিক্ষা গবেষণার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। প্রত্যেক শ্রেণির পাঠ্য বইগুলোর পরিকল্পনা দেখলেই তা বোঝা যাবে। কিন্তু স্কুল প্রশাসনের ক্ষেত্রে তা হয় নাই। বোর্ডের বাইরে এই ব্যাকরণ বইগুলো নির্বাচনই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপর তথাকথিত উন্নত শিক্ষার নামে আয়ত্তের অযোগ্য অতিপাণ্ডিত্যপূর্ণ একাধিক বই চাপিয়ে দেওয়াটা কোন ক্রমেই সুস্থতার লক্ষ্ণণ হতে পারে না। এর ফলে আমাদের সন্তানগণ নকলনবীশ ও মুখস্থ-বীশ হয়ে উঠবে। তারা হয়তো পাইকারী হারে জিপিএ ফাইভ পাবে, কিন্তু উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি পরীক্ষা গণহারে অকৃতকার্য হবে। তথাকথিত মেধাবী সন্তানরা তখন জাতীর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এই সম্পর্কে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি দেওয়া দরকার বলে আমি মনে করি।