ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

ঈদের বাকি নেই আর আর খুব বেশি দিন।ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে যুদ্ধ! হ্যাঁ সত্যি ই যুদ্ধ। এই যুদ্ধ চলছে বহু বছর ধরে। আগামীতেও এই যুদ্ধ চলবে। তবে এই যুদ্ধর কোন শেষ নেই। এটি অনন্ত কাল ধরে চলবে হয়তোবা। আসলে যুদ্ধটা কি? এই বিষয়ে কিছু না বললেই নয়। ঈদ এলেই আমাদের প্রায় সকলেরই মাথা গরম হয়ে যায়। অবস্থা ও চরমে পৌঁছায়। সাধারণ বা মধ্যবিত্তরা কোন ভাবেই হিসাব মেলাতে পারেনা। শুরু হয় পহেলা রমজান দিয়ে। সাধ আর সাধ্যের মধ্যে চলে রশি টানাটানি। শেষমেশ অনেকেই হিসাব মেলাতে পারে। আবার অনেকের হিসাব মেলেনা। এই হিসাবের খাতা মেলা বা অমেলার পর্ব শেষ হতে না হতেই মাথার উপর জগদ্দল পাথর হয়ে ভর করে বাড়ি ফেরার চিন্তা! কি করে একটি স্বপ্নের টিকেট হাতে পাওয়া যায়। দেশে তো যেতেই হবে। নাড়ির টান। এই নাড়ির টান বোধ হয় একটু বেশি মাথা চড়া দিয়ে উঠে ঈদ এলেই। বিশেষ করে ইট পাথরের মেগা সিটি ঢাকায় সাথে যাদের জীবন আর জীবিকার তাগিদে এক প্রকারের আপোষ প্রতিনিয়ত তারা ব্যাকুল হয়ে উঠে অন্তত বছরের ঐ একটি দিন হলেও প্রিয়জনের সান্নিধ্যে থেকে ঈদ উদযাপন করা। আর এই ছোট্ট স্বপ্ন টি পূরণের জন্য আবারো নামতে হয় যুদ্ধের মাঠে।

ডমেস্টিক এয়ার, বাস, ট্রেন কোথাও কোন টিকেট নেই। শুধু নেই আর নেই। এক বুক আশা নিয়ে তারাবীর নামাজ শেষ করে যারা অতি কষ্ট করে সারারাত টিকেট কাউন্টার এর পাশে লাইন দিয়ে বসে থাকে তারা যে শেষ পর্যন্ত শেষ হাসিটা হাসতে পারবে সেটি ও অনিশ্চিত। মশার কামড় আর নির্ঘুম একটি রাত কাটানোর পর ও যদি একটি টিকেট পাওয়া যায়! আহারে কি যে সেই সুখ! সেই সুখ বুঝানো যাবে তাদের যারা এমনটি ফেস করেছেন।কিন্তু সেই সুখ সবার হাতে ধরা দেয়না। টিকেট কাউন্টার খোলার সাথে সাথেই দুই পাঁচটা টিকেট সেল দেওয়ার পরই সব সোল্ড আউট! খালি হাতে ফিরতে হয় সেই সব স্বপ্ন-বাজ মানুষদের। অতি ক্ষুদ্র একটি স্বপ্ন। যেই স্বপ্ন দেখবার অধিকার ও রয়েছে কিন্তু সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়ে যায় একটি টিকেট এর অভাবে! তাই অনেককেই খালিহাতে ফিরে যেতে হয়। কেউ কেউ আবার টিকেট হাতে না পেয়ে আবারো যুদ্ধের মাঠে নামে। বাড়ি যেতেই হবে। টিকেট পাইনি তো হয়েছে টা কি? যেতে হবেই। তাই রাস্তা ভেঙ্গে ভেঙ্গে যাওয়ার এক দুঃসাহস বুকে ধারণ করে পাড়ি দেয় তারা পিচ ঢালা রাজপথ। একসময় তারাও বাড়ি পৌছায়। তবে সেই দুঃসাহস যারা করতে পারেনা তাদের এক প্রকার বাধ্য হয়েই থেকে যেতে হয় রাজধানীর বুকে। আর অনেকেই চাইলেও ভেঙ্গে ভেঙ্গে যেতে পারেনা। অন্তত যাদের কাছে বড় বড় লাগেজ ভর্তি জিনিসপত্র আর ছোট্ট সোনামণিরা থাকে।

যুদ্ধ আমাকে ও করতে হয়েছে। তবে এবারের যুদ্ধ টা বোধ হয় জীবনের সবচাইতে শ্রেষ্ঠ যুদ্ধ! প্রতিবছর ই দ্যাখা যায় আমি টিকেট কাউন্টারে গেলেই টিকেট নাই হয়েযায়। তাই গেল বছর গুলি যায়নি টিকেট কাউন্টার গুলোতে। ঢাকা থেকে ডমেস্টিক এয়ারলাইনে যশোর। তার পর ওদের গাড়ীতে করে সরাসরি খুলনা। ঢাকা থেকে ৩৫ মিনিটেই যশোর আর যশোর থেকে ৫০ মিনিটেই খুলনা। ব্যাস কোন বালাই নাই। কিন্তু এবার হোল মহা বিপত্তি। লোকাল বিমান গুলি ও ওভার। নাহ ঐ খানেও টিকেট নেই। কিন্তু বাড়ি যেতে হবেই। কি করা? একটি কথা স্পষ্ট যে দুর্নীতিতে যেই দেশ চ্যাম্পিয়ন সেই দেশে টাকা হলে বাঘের দুধ ও মেলে। যাই হোক গ্রিন লাইনের স্কানিয়াতেই যাওয়া পড়ে আমার বছরের অন্য সময় গুলোতে। এবার ও সেই গ্রিন লাইন কাউন্টারে গেলাম। পরিচিত সেলস ম্যান কে দেখে বললাম,

ভাই একটি টিকেট লাগে

হাসি মুখে জনাব আমাকে বললেন,

সরি সার সব শেষ

কিন্তু আমি জানি সব শেষ নয়। টিকেট নিয়ে যেতেই হবে আমাকে। এখানে হারার কোন সুযোগ নেই। সামান্য টিকেট নিয়ে যুদ্ধ করতে ও আমি প্রস্তুত! যাই হোক মনে মনে ফন্দি আঁটলাম কি করা যায়?

ভোরের দিকে কাউন্টার গুলো একটু ফাকা। চাপ ও কম। তাই টিকেট কাউন্টার ম্যান গুলো বসে বসে খোশ গল্প শুরু করে দিয়েছে। এর মধ্যেই দেখলাম একজন টিকেট সেলস ম্যান উঠে বাইরে ঘোরাঘুরি করছে। তার কাছে গিয়ে একটু বিনয়ের সুরে বললাম

ভাই, বিজনেস ক্লাস এর একটি টিকেটের দাম কত?

হাহা আমি তো জানি দাম কত? কিন্তু ওর সাথে ভাব জমানোর জন্যই ঐ কথা দিয়ে শুরু করলাম। জনাব হেসে দিয়ে বললেন

সার দাম দিয়ে কি হবে সেপ্টেম্বর এর ৭ তারিখ পর্যন্ত নাই

আমি বললাম,

আমি ২০০০ টাকা দেবো আমাকে একটি টিকেট ম্যানেজ করে দেওয়া যাবে?

বিজনেস ক্লাস এর ১১০০ টাকার টিকেটের দাম আমি হাঁকালাম ২০০০ টাকা! সেলস ম্যান বলল,

না সার কোন সুযোগ নাই

আমি বুঝতে পারছি উনি ভয় করছেন আমি ডিবি পুলিশের লোক কিনা। যাই হোক আবারো সিস্টেম করলাম তাকে। আসলেই আমার টিকেট দরকার। মানি ব্যাগ থেকে চকচক ২ টি ১০০০ টাকার নোট বের করে উনার হাতে চেপে দিলাম। বললাম

আমি বাইরে আছি।

উনি বললেন

নানা সার কেউ দেখলে আমার চাকরি থাকবেনা

। আমি বললাম,

আমার দ্বারা কোন ক্ষতি সাধন আপনার হবেনা, আপনি নিশ্চিত থাকুন

আমার কথা শুনে উনি বললেন,

আপনার বাড়ি কোথায় সার?

আমি বললাম,

খুলনা বাগেরহাট।

খানিক ক্ষণ দম মেরে বললেন,

দেখি সার কিছু করতে পারিকিনা? তবে হ্যাঁ কথা দিতে পারছিনা

আমি বললাম,

আচ্ছা,আপনি যান।

উনাকে ভেতরে পাঠিয়ে দিয়ে আমি বাইরে দাড়িয়ে আছি। আর মনে মনে বলছি টিকেট এখন সময়ের ব্যাপার।

১৫ মিনিট পর উনি এলেন। এসে বললেন

স্যার বিজনেস দেওয়াযাবেনা, ইকনমি ক্লাস বহু কষ্ট করে একটা দেওয়া যেতে পারে। তাও সিট পড়বে পেছনে।

আমি বললাম

না,বিজনেস চেষ্টা করুন।

উনি বললেন,

সরি স্যার হচ্ছেনা

আমি আবারো বললাম,

লাগে আরও ২০০ দেবো!

উনি বললেন স্যার,

আপনি তো আমাকে বিপদে ফেললেন

আপনি কি সব সময় বিজনেস ক্লাসে যান?

আমি বললাম

বেশির ভাগ সময়েই যাই। আর বাইক নিয়ে যখন মাওয়া হয়ে যাই তখন তো আর আপনাদের সেবা নেওয়া সম্ভব হয়না। ঈদে বাইক নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই আবারো আপনাদের সেবা নিতে এলাম।

যাই হোক উনি আমাকে দেখছিলেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। আমি এটি বেশ বুঝতে পারছি। উনি বললেন,

দেখি স্যার শেষ চেষ্টা করে দেখি।

আমি বললাম,

যান আমি বাইরে আছি।

এবার আমার বাড়ি ফেরার স্বপ্নের বিজনেস ক্লাস টিকেট আসবে আমি জানি। এবং অতঃপর উনি এলেন। কাচুমুচু করে কানের কাছে এসে বললেন,

স্যার আপনি একটু বাইরে আসেন।

কাউন্টার থেকে বের হয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সামনে এসে আমাকে বলল,

স্যার শুধু আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে এতো চেষ্টা করলাম, আমাদের এক সারের ব্যক্তিনামে একটি টিকেট বুক দেওয়া ছিল, ঐ খান থেকে বহু কষ্টে আমি এটি ম্যানেজ করেছি। তবে স্যার আমাকে আর ১০০ টাকা দিতে হবে।

১১০০ টাকার টিকেট ২৩০০ টাকা! কে বলেছে টিকেট নেই? তাও আবার আমার টিকেট অ্যাপোলো ওয়ান (এ ১)। হাহা বিচিত্র এই দেশে কি না সম্ভব? দিলাম আরও একশো। হাতে পেলাম সেই টিকেট। আর মাকে ফোন করে বললাম,

মা আমি আসছি, টিকেট পেয়েছি।

ফোনের মধ্যে মায়ের যে ভুবন ভোলানো হাসি আমি শুনতে পেলাম ২৩০০ টাকা দিয়ে কি সেই হাসি কেনা সম্ভব?


টিকেট পেয়ে এখন আবারো দুশ্চিন্তা। রাস্তার যে হাল? গাড়ী তো যাবে সায়দাবাদ হয়ে সাভার ঘুরে মানিকগঞ্জ এর ভেতর দিয়ে আরিচা দউলদিয়া ঘাটে। মানিকগঞ্জ শুনে বুকের মধ্যে চিন চিন করে উঠলো। তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনির কি নির্মমতার শিকার হলেন এই মহা সড়কে! রিক্সায় বসে এই সব ভাবছি। হঠাৎ রিক্সা বাম দিকে কাত হয়ে গেল। আমি ভাগ্যিস ডান পাশে বসা ছিলাম। দেখি বাম চাকা গর্তের মধ্যে ধুকে গেছে। মেইন রোড গুলোতে রিক্সা বন্ধ থাকায় আমি ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। রাস্তার হাল দেখে সারা দেশের রাস্তার দুরবস্থার কথা মনে পড়ে গেল। এবারের ঈদে মহাসড়ক গুলো যেন মহা বিপদের কারণ না হয়ে যায়। এমনটি ভাবছিলাম।

বছর ৩ আগে গ্রামীণ ফোনের একটি ঈদ বিজ্ঞাপনে মিলন মাহমুদ একটি জিঙ্গেল গেয়েছিলেন,

স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার, পথ দেবো পাড়ি তোমার, কাছে আসবো ফিরে বারেবার”

হ্যাঁ আমিও আজ বলি স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার ভাঙ্গা পথে!
এই ঈদে যেই যেখানে ই যান না কেন, নিরাপদে থাকুন। সাবধানে চলাফেরা করুন। সবার জন্য নিরাপদ সড়ক এই শুভ কামনা।

১৬ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. আকাশের তারাগুলি বলেছেনঃ

    শুভ ভ্রমন।
    আমার ব্যবস্থা হয় নাই এখনো। হায়াত মউত আল্লাহর হাতে।

    আমি মাইক্রবাসের চেষ্টা করছি। না পাইলে বাসস্তপেজে আমার এক রিলেটিভ ট্রফিক সার্জেন্ট। যাওয়ার দিন কাউন্তারে গিয়ে উনাকে ফোন দিব। আশা করি ৭ টা টিকিটের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

    হা হা

  2. মোসাদ্দিক উজ্জ্বল বলেছেনঃ

    হায় হায় কয় কি?
    সার্জেন্ট ৭ টা টিকেট দেবো!!!!!!!!!!!!!!!
    হুম! এই দুর্নীতির কারনে এই অবস্থা।
    আর এই টিকেট যন্ত্রনার কারনে আমাদের কৌশিক ভাই আর আইরিন আপু এবার ঢাকায় ঈদ করবে। আর লক্ষ্মীপুরের মাহবুব ভাই লক্ষ্মীর মতন ঈদ কইরা আহেন।

  3. আকাশের তারাগুলি বলেছেনঃ

    দুর্নীতি হয়ে গেল নাকি, তাহলে বাড়িই যামুনা। আপ্নে কিন্তু ২৩০০ টাকা দিয়া ১১০০ টাকার টিকিত কিনেছেন।

    তাহলে সৈয়দ মকসুদের লগে শহিদমিনারে ঈদ করমু ভাবছি।

  4. আমিন আহম্মদ বলেছেনঃ

    যান বাড়ী যান। আর আমাদের জন্য একটু রেখে দিয়েন। বিদেশে বসে ঘরের মধ্যে বসে ভাবছি এবার ঈদ করব। আর এখানেতো বাংলাদেশের মত ঈদ উৎসব হয়না।
    যাই হোন দুর্নীতি করে কিনুন আর যেভাবেই কিনুন টিকেট পেলেনতো ? এবার শুভ হোক আপনার ও সকলের বাড়ী ফেরা। শুভ কামনা।

    এখন কিভাবে লিখছেন ? কোন সমস্য হচ্ছেনা ?

  5. আমিন আহম্মদ বলেছেনঃ

    @আকাশের তারা ভাই দেখি। তবে তেমন কোন ভাল লাগার নেই, আমরা যারা সাধারন বা ঝামেলা মুক্ত জীবন পছন্দ করি ওদের জীবনে। তার আগে এবার দেশে যাওয়া আসার নামে একটা পোষ্ট দিয়েন। দেখি দেশের মানুষের ঈদ কেমন হল। সেখানে না হয় আমার ঈদ শেয়ার করব।

    ১১
  6. হেলজিনোম২০১০ বলেছেনঃ

    নস্টালজিক করে দিলেন।বহুদিন বহু বছর এই সব আনন্দ বঞ্চিত।আপনার লেখা পড়ে মনে হচ্ছে গ্রামের সাথে আপনার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।আসলে শহুরে বড় হওয়া ছেলে মেয়েদের শিকড়ের টান এতটা থাকেনা।যতটা মাটির গবীরে প্রোথিত আমাদের শিকড়।বহু বছর আগে এই জীবনের সাথে আমার নিজের ও পরিচয় ছিলো।কিন্তু কি নির্মল সুখ লুকিয়ে আছে এই কষ্টের অপর প্রান্তে বাড়ির সামনে গিয়ে যখন দেখবেন মা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে কপলে চুমু খাবে নিমিষেই সব পথের ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে তাইনা?
    তবে আমার ধারনা ছিল এত বছর পরে হয়তো দেশের যোগাযোগ খাতে আগের মত সমস্যা নেই কিন্তু এখন দেখছি সব আগের মতই রয়েছে।

    ১৩

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...