ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 
goodNws

আজ সংবাদ এবং সংবাদ মাধ্যম নিয়ে লিখতে যাচ্ছি। কারনটা আশা করি বুঝতে পারছেন সবাই। হ্যাঁ, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকান্ড। প্রশ্ন আসতে পারে, ব্লগে তো মোটামুটি নিয়মিতই লিখি, কিন্তু এই ব্যাপারটা নিয়ে ‘গরম’ অবস্থাতেই লিখলাম না কেন? আমি আসলে চেয়েছিলাম ঘটনাটা একটু ‘ঠান্ডা’ হয়ে উঠুক, তারপর লিখি। (‘গরম’/‘ঠান্ডা’ শব্দগুলো আপত্তিকর জানি, তবুও লিখলাম, দুঃখিত; কিন্তু আমি এই শব্দগুলো সাংবাদিকদের কাছেই শুনেছি)।

আমি দেখতে চেয়েছিলাম আমাদের পত্রিকা, টিভি বা ব্লগ এই হত্যাকান্ডের খবর পরিবেশন করতে গিয়ে কেমন আচরন করে। এর মধ্যেই এই মৃত্যুর খবর পরিবেশন করা নিয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলোর আচরন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে গেছে। আমি আসলে এই খবর পরিবেশন করার ঘটনায় সাংবাদিক এবং সংবাদ পরিবেশনকারী সংস্থার চরিত্র নিয়ে একটা ভীন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। আর হ্যাঁ, আমি এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে পুলিশ বা সরকারের আচরন নিয়ে লিখছি না – ওটা নিয়ে অনেক লিখা হয়ে গেছে।

মিডিয়ার আচরন নিয়ে প্রথম বিতর্ক শুরু হয় ওই দম্পতির শিশুসন্তান ‘মেঘ’ এর সাক্ষাৎকার নেয়া নিয়ে। ওই ‘বর্বর’ আচরনের নিন্দা সচেতন অনেক মানুষই করেছে, কিন্তু সেই ‘এক্সক্লুসিভ’ খবর কিন্তু আবার অনেক মানুষ ‘খেয়েছে’ খুব এবং ওই বিশেষ চ্যানেল ওইদিন অন্তত সবার দৃষ্টি আকর্ষন করেছে। এরপর প্রশ্ন উঠেছে এই হত্যাকান্ডের কারন নিয়ে নানা রকম ‘মনগড়া’ তত্ত্ব পরিবেশন করা নিয়ে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত অনৈতিকতাসহ নানা ‘কাহিনী’ এসেছে কোন রকম তথ্য/সুত্র ছাড়াই। সাংবাদিকরাই, অন্য সাংবাদিকের মৃত্যুতে লিখে গেছেন যা ইচ্ছে তাই। আগে শুনতাম ‘কাক কাকের মাংস খায় না’; কিন্তু এই ঘটনায় দেখা গেল ‘কাক কাকের মাংসও খায়’ (কথ্য প্রবাদে বললাম কথাটা; কোন সাংবাদিক ভাই/বোনকে আহত করে থাকলে দুঃখিত)।

পরিস্থিতি এমন খারাপের দিকে চলে যাচ্ছিল যে সাংবাদিকরা পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছেন, এসব বন্ধ করতে বলেছেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন (নোয়াব)কেও বিবৃতি দিতে হোল, অনুরোধ করতে হোল। কিন্তু না, থামেনি ওসব; চলছে এখনো এবং কাটতি বাড়িয়ে চলছে ওসব পত্রিকার। আসলে ব্যাপারটার গভীরে না গিয়ে আমরা কেবল বাইরের ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করছি বলে বুঝতে পারছি না যে ওসব আসলে বন্ধ হবার নয়।

আমার ‘সচেতনভাবে’ সংবাদপত্র পাঠের বয়স প্রায় ১৫ বছর। আমি আজ পর্যন্ত যে কোন চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের পর নানা ‘কেচ্ছা’ নিয়ে পত্রিকা সয়লাব হয়ে যেতে দেখেছি। নারী খুন হলে বা খুনের সাথে জড়িত থাকার সন্দেহ হলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সাথে যুক্ত হয় চারিত্রিক অনৈতিকতার কথা। কই তখনতো দেখিনি যে নেতৃস্থানীয় সাংবাদিক বা নোয়াব কোন বিবৃতি দিয়ে ওসব বন্ধ করতে বলছে। কিন্তু এবার তো দেয়া হোল। নিজেদের ‘গোত্র’ বলে? আর নিজের গোত্রের ওপর কেন আজ এসব শুরু হয়েছে সাংবাদিকরা বা নোয়াব কি তলিয়ে দেখতে চেষ্টা করেছেন?

এবার আসি শিরোনামের কথায়। সংবাদের ক্ষেত্রে এই প্রবচনটা বেশ পুরনো। এই একটি প্রবচনই সম্ভবত সবকিছুর ব্যাখ্যা দিয়ে দেয়। প্রবচনটা অনেকেরই জানা আছে নিশ্চয়ই, আর যাদের জানা নেই, তাদের জন্য একটু ব্যাখ্যা – এখানে ‘গুড নিউজ’ কথাটা ব্যাবহার করা হয়েছে সংবাদ পরিবেশনকারী সংস্থাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে আর ‘ব্যাড নিউজ’ কথাটা ব্যবহার করা হয়েছে বাস্তবের যে কোন খারাপ খবরের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ বাস্তবের খারাপ খবর সংবাদ পরিবেশনকারী সংস্থাগুলোর কাছে ভাল, লোভনীয়। এবং বাস্তবের খবর যত খারাপ, সেটা সংবাদ পরিবেশনকারী সংস্থাগুলোর কাছে ততো ভাল, ততো লোভনীয়।

আমরা মানতে চাই বা না চাই এটা সত্য যে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সংবাদ একটা পন্য, যেটা আর সব পন্যের মত বিক্রি হয়, বরং অনেক চমৎকারভাবেই হয়। কারন এর ভাল চাহিদা আছে আমাদের কাছে। অঞ্জন দত্তের একটা গানের ভাষার মত সংবাদ আমাদের ‘সকাল বেলার ক্ষিধে’। আর এই ক্ষিধে আমরা মেটাই খবর ‘খেয়ে’। আর খারাপ সংবাদই (দঃসংবাদ) এই ক্ষিধে মেটায় বেশী ভালভাবে (কিছু ব্যতিক্রম বাদে)। আমার স্পষ্ট মনে আছে তিন বছর আগের বিডিআর বিদ্রোহের সময় কখনো কোন রকম খবর না দেখা মানুষরাও (আমার পরিচিত) খবরের সামনে বসে থেকেছেন টানটান উত্তেজনা নিয়ে।

তাই দারুন লাভজনক ব্যবসা হতে পারে এটাকে ভিত্তি করে। সাথে সাথে কোন গোষ্ঠীর স্বার্থের পক্ষে বা বিপক্ষে সত্য/মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালানোর চমৎকার হাতিয়ার পাওয়া যায় তো বটেই। সংবাদের এই চরিত্রের জন্য সেটা বিশাল সব পুঁজি আকর্ষণ করে। উন্নত দেশের কথা কথা বাদই দিলাম, আমাদের দেশেও এটা এখন শত শত কোটি টাকার ইন্ডাস্ট্রি। আমাদের দেশে এই মুহুর্তে সব টিভি চ্যানেল এবং সংবাদপত্র কর্পোরেট পুঁজির (এর মধ্যে ভয়ঙ্কর কুখ্যাত পুঁজিপতিও আছে) দখলে। এতো টাকা (অনেক ক্ষেত্রেই কালো টাকা) লগ্নি করা হয় কি ‘জনসেবা’ করার জন্য? আর প্রতিটি ব্যবসার মত এর ‘প্রফিট ম্যাক্সিমাইজেশন’ এর নীতি থাকবে না কেন? আর সেটা করতে গিয়ে এই মধ্যে নীতি নৈতিকতা থাকবে সেটা আশা করাটা কি ঠিক? সাথে সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যে বিখ্যাত হবার, পদোন্নতি পাবার, অসৎ উপার্জনের (অনেকের) ভীষন চেষ্টাতো আছেই। তাই যারা এখানে বেশী নৈতিকতার আশা করেন তারা বাজার এবং পুঁজির এই চরিত্রটি সম্বন্ধে একেবারেই অজ্ঞ।

কেউ কেউ বলতে পারেন আমাদের দেশে এই মুহুর্তে সংবাদমাধ্যমের জন্য সঠিক নীতিমালা নেই বা অনুসরন করা হয় না, বা সাংবাদিকদের যথেষ্ট পেশাগত প্রশিক্ষন নেই এসব কারনে এখন এমন হচ্ছে। না, এগুলো সব ঠিক হয়ে গেলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হবে না। হ্যাঁ এখনকার মত এতো স্থুলভাবে হয়তো হবে না; হবে অনেক সূক্ষ্মভাবে, অনেক ধূর্ততার সাথে। পশ্চিমের দিকে তাকালেই আমরা এটা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবো – শুধু ট্যাবলয়েডই না, সেখানকার মূলধারার অতি বিখ্যাত সব সংবাদপত্র আর নিউজ চ্যানেলের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ আছে বেশ জোরালোভাবেই, আছে অনেক তথ্যপ্রমানও।

MonajatUddin

শেষে এসে মহৎ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের কথা মনে পড়ছে। উত্তরের মঙ্গার রিপোর্ট করে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া মানুষটির দারুন সব রিপোর্ট ওই অঞ্চলের অনেক সমস্যার সমাধান করেছে, কিন্তু মানুষের দূর্দশাকে ভিত্তি করে তাঁর বিখ্যাত হয়ে যাওয়া তাঁকে মাঝে মাঝেই ভীষন কষ্ট দিত। একবার মঙ্গার এক রিপোর্ট করে একজনের বাসায় ভুরিভজের সময় তাঁর মনে হয়েছিল তিনি মাঙ্গাক্রান্তদের রক্তমাংস খাচ্ছেন। আমি জানি না আজকের কোন সাংবাদিক এভাবে ভাবেন কিনা। তবে আমার মনে হয়, আজকের এই বিশাল পুঁজির সংবাদ সংস্থার যুগে মোনাজাতদ্দিনরা সম্ভবত আর জন্মাবেন না, জন্মালেও টিকে থাকতে পারবেন না; স্বাধীনভাবে, সৎভাবে কাজ করতে পারবেন না। পুঁজি আর নৈতিকতার মধ্যে যুদ্ধে আখেরে পুঁজিই জেতে, নৈতিকতা নয়।