ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি


বর্তমান সরকারী দল তাদের নিজেদের ঘোষিত নীতি বা তাদের নিজেদের মুখ থেকে নিঃসৃত কথা দিয়েই নিজেদেরকে বন্দী করে ফেলছেন। তারা নিজ দলের বা অঙ্গ দলের কর্মীদেরকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সাথে একযোগে উচ্ছৃঙ্খলতা প্রতিহত করার আহ্বান করেছে এবং এবং তাদের সমর্থকদের কেউ কেউ এই প্রতিরোধ কাজকে জনতার প্রতিরোধ হিসেবে দেখে আশ্বস্ত হচ্ছেন বা স্বস্তি প্রকাশ করছেন। এই অবস্থান থেকে সরকার সড়ে না দাঁড়ালে বিরোধী দলসমূহের উচ্ছৃঙ্খলতার বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহের কাজকে যথোপযুক্ত বলার যৌক্তিক ভিত তাদের পক্ষে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না।

আমরা দেখেছি ছিয়ানব্বইয়ে এই দল সরকার গঠন করেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজে হাত দেয়নি। এটিকে একটি সঙ্গত অবস্থান হিসেবেই দেখা যায়। যেকোনো কাজের একটি উপযুক্ত সময় থাকে। অনুপযুক্ত সময়ে সঠিক কাজও সঠিক হয় না। আমরা এমনকি এও দেখেছি যে, যারা এর আগে বিএনপির আমলে এই বিচার নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন, তারাও সেই সময়ে নিষ্ক্রিয় থেকে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন।

এবার সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে অগ্রসর হয়েছেন। নির্বাচনের মেনিফেস্টোতেও তা ছিল। কাজটি যদি নাজুক না-ই হবে তবে ছিয়ানব্বইয়ের পর তারা তা করতে যাননি কেন? কাজেই এবার প্রশ্ন করা যায়, এই টার্মেই নির্বাচন কালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সংবিধান থেকে বাদ দিতে হবে কেন? এটি কি পরে কোন সময় করা যেত না? তা ছাড়া, যদি নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে স্পষ্টভাবে বাতিল করে দেয়ার কথা যুক্ত করে দেয়া হতো তবে কি তা তাদের জন্য সহায়ক হতো?

বর্তমান সহিংস আন্দোলনের কারণ হিসেবে প্রধান বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবীকেই প্রধানত উপস্থাপন করছে। জামায়াত এটিকে কাজে লাগাচ্ছে তাদের ইস্যুর জন্য। জামায়াতের জন্য এই সুযোগটি তৈরি করে দিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে সরকারের অনড় অবস্থান, যে অবস্থান থেকে সড়ে যাওয়ার জন্য সরকারের সামনে কোন বাধাই বাস্তবে নেই: সংসদে তাদের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, আদালতের রায়ে ফ্ল্যাক্সিবিলিটিও রয়েছে।

কিন্তু আমরা দেখছি যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে যখনই বিরোধী দল কিছু করছে, তখনই সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের অভিযোগ আনছে এবং অভিযোগের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছে। এই প্রবণতাকে এভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়: সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীকে বাতিল করার জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে; এবং সে জামায়াতকে তাদের ইস্যুর জন্য বিএনপির অবস্থানকে একটি সুযোগ হিসেবে পাইয়ে দিয়েছে।

সরকার বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব কামনা বা দাবী করছে, কিন্তু বিএনপি’কে জামায়াতকে সাথে রাখার দিকে বাস্তবে ঠেলে দিচ্ছে। এই ইস্যুতে অতীতে আওয়ামীলীগও জামায়াতকে সাথে রেখেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী মেনে নিলে বিএনপির জন্য যুদ্ধাপরাধের ইস্যুতে কথা বলার বা তার পাশে এসে দাঁড়ানোর কোন যুক্তি থাকবে না। তখনও যদি বিএনপি আন্দোলন অব্যাহত রাখে বা জামায়াতকে সহায়তা করে তবে সে স্পষ্টতই একটি ভিত্তিহীন কাজে নিজেকে নিয়োজিত করবে।

জনগণের বিচারের বা চিন্তার বা মূল্যায়নের প্রতিনিধিত্ব করা কোন একজন ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই আমিও তার উপযুক্ত নই। কিন্তু আমাদের তথা জনগণের পক্ষে কিভাবে চিন্তা করা সম্ভব বা স্বাভাবিক তা সরকার পক্ষ বিবেচনা করে দেখতে পারে। কারণ এই সরকার গঠনকারী দলকে একদিন আবার জনগণের দ্বারস্থ হতে হবে। এখানে রেসিপ্রোকাল অবস্থাটি বিবেচনা করা যায়। যদি বিএনপি ক্ষমতায় থাকতো এবং তারা আওয়ামী লীগের মত ঠিক একই যুক্তি দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সংবিধান থেকে বাদ দিত তবে আওয়ামীলীগের অবস্থান কিরূপ হতো? জামায়াতের সাথে তাদের সম্পর্কটি কিরকম দেখাতো? এখানে বিএনপি’র অতীত টেনে লাভ হবে কি? সংঘাত নিরসনের উপায়ের দিকে অগ্রসর হওয়া কি সরকারের দায়িত্ব নয়? ‘রাজপথ ছাড়, সংসদে আস’ বলারও কোন প্রয়োজনই সরকারের নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আগের বিধি সংবিধানে আরও দুই টার্মের জন্য বহাল করতে বিরোধীদের সংসদে আসার কোন আবশ্যিক প্রয়োজন নেই।

সরকারের কাছে সবশেষে আবেদন করা যায়: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি এবার নয়, অন্যবারের জন্য রেখে দেয়া হোক; আগামী দুই টার্মের জন্য এটিকে পুনর্বহাল করা হোক; যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টিতেই সরকার মনোযোগী থাকুক; আগেরবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে জামাতকে যে বেনিফিট দেয়া হয়েছিল, এবার একই ইস্যুতে তাকে বেনিফিট দেয়া থেকে বিরত থাকা হোক।

রাজনৈতিক চোরাবালী সরকারের জন্য সুফল বয়ে আনে না, বিরোধীদের জন্য সুযোগ করে দেয়। দুই প্রধান দলের সংঘাত ক্ষুদ্র তৃতীয় দলকে সুবিধা এনে দেয়।

[ছবি সহব্লগার প্রিয় জহিরুল চৌধুরী ভাইয়ের 'ইসলাম'কে বাঁচান! ব্লগ থেকে নেয়া। বন্ধুত্বের দাবীই এই চুরির দুঃসাহস।]

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী

১০ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. স্বপ্নবাজ বলেছেনঃ

    ভাই আপনি লিখছেন আবার বলছেন রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র না। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না চাওয়াকে সাধুবাদ দিচ্ছেন ! অবাক হলাম।
    যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নাগরিক দাবী, আওয়ামী লীগের সমর্থনে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে। আ’লীগ তো গণআদালতেও ছিল। ৯৬ এ তারা ক্ষমতায় এসেছে ২১ বছর পর, বিপুল সংখ্যাগরিষ্টতা পায়নি। তখন বঙ্গবন্ধুর বিচার গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
    একজন সচেতন নাগরিক মাত্রই স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ বিরোধী জামাতের বিচার চাইবে।
    বি:দ্র: যদি বিবেক থাকে।

  2. জিনিয়া বলেছেনঃ

    গুরুজি, পোস্টের সাথে পূর্ণ সহমত..সরকার আর বিরোধী দল এক জঘন্য আর ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছে..এর শেষ যে কত লাশ দিয়ে হবে তা আমরা কেউ জানি না..

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...