ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, ব্লগালোচনা

 
blogging blank_m2m

অত্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষটিকেও তার দোষের জন্য কেউ যদি কেয়ামত পর্যন্ত কেবল গালাগালিই করে যান, তাতে বুদ্ধিমান মানুষটি কিন্তু ভাল পথের সন্ধান পেতে সক্ষম হবেন না। মন্দকে গালাগাল করলে মন্দ লোকটি ভাল পথে উঠে আসবেন—এই আশা বা প্রক্রিয়া সাধারণ মনস্তত্ত্ব বিরোধীও; তিনি তখন বরং ক্রুদ্ধ হয়ে উঠবেন, নিজেকে মার্জিনালাইজড হিসেবে দেখতে শুরু করবেন। অবস্থাটা আরও বেশী দূর গড়াতে পারে। আমি চোর হয়ে যদি মিথ্যাবাদীকে মিথ্যাবাদী বলতেই থাকি, তবে সেও আমাকে দেখে পাল্টা চোর-চোর’ই করতে থাকবে। কেউ যদি নর্দমায় পড়ে থেকে গড়াগড়ি যান, তবে “ছি ছি! কী নোংরা” বলে যতই নিজ পরিচ্ছন্নতার কল্পনায় আত্মপ্রসাদ লাভ করি না কেন, ওতে লোকটার উদ্ধারে কোনো সুবিধা হয় না। কেউ দুষ্টুমি করতে করতে পানিতে পড়ে গেলে ‘এবার আক্কেল হয়েছে তো!’ বলে ছড়ি ঘুরিয়ে জ্ঞান দিতে থাকলেও সে জ্ঞান কোনো কাজে লাগে না। আমরা ডাক্তারদের দুষে যাচ্ছি, ইঞ্জিনিয়ারদের দুষে যাচ্ছি; রাজনীতিক, আমলা, পুলিশ, শিল্পপতি কেউই বাদ যাচ্ছেন না। অথচ এই আমরা প্রত্যেকে এসবেরই কোনো না কোনো একটি বর্গেরই একজন। অর্থাৎ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারকে দুষছেন, ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তারকে দুষছেন ইত্যাদি। বিষয়টা নিয়ে পীড়াপীড়ি, চাপাচাপি, তর্কাতর্কি করতে থাকলে আবার শেষে এই কথাতেই উপনীত হতে হচ্ছে যে, দেখুন, পুরো সমাজটাকেই যখন ঘুণে ধরেছে, তখন তা তো সর্বত্রই গিয়ে পৌঁছবে। এখন উপায় কী? আমাদের করণীয় কী?

আমরা যদি এই প্রকাণ্ড দৈত্যরূপী ঘুণকে এক কথায় ‘দুর্নীতি’ অভিহিত করি তবে খুব ভুল হবে না। আমরা যদি টেলিভিশন, পত্রিকা, অথবা সেমিনার, সিম্পোজিয়ামগুলোতে গিয়ে হানা দেই তবে দেখতে পাবো, সবাই ব্যস্ত বিনোদন আর রাজনীতি নিয়ে। আবার বিনোদন মানেই যেন সেক্স-এন্ড-ভায়োলেন্স উপভোগ, আর রাজনীতি মানেই যেন কাদা ছোড়াছুড়ি খেলা। বিনোদন নিয়ে আর কিছু বলা এখানে অনাবশ্যক, কারণ তা এই লেখার বিষয়বস্তু নয়। এই লেখাটি মূলত শিক্ষা বিষয়ক—গণশিক্ষা। গণমাধ্যম, সেমিনার ইত্যাদিতে আমারা সাধারণত সমাজের নেতা, পত্রিকার সম্পাদক, বুদ্ধিজীবীদেরকেই দেখে থাকি। গণমাধ্যমগুলো শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ইত্যাদি নিয়ে কিছু সময় ব্যয় করে। বাকী ও বিরাট সময়টা থাকে শুধু রাজনীতির ‘ক্যাচাল’ নিয়ে। এই বিবাদের উৎস আসলে কী? বিবাদের উৎস হচ্ছে আদর্শ। কোনো না কোনো ভাবে এই আদর্শগুলোর মধ্যে বিরোধ রয়েছে। কিন্তু কোনো পক্ষের বুদ্ধিজীবীকেই তার আদর্শকে ব্যাখ্যা করতে দেখা যায় না। ন্যায়, নিরপেক্ষতা, সুনীতি, সত্যবাদিতা, অঙ্গীকার রক্ষা করা, মমতা, পরার্থপরতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, গণতন্ত্র ইত্যাদিকে সকলেই কিন্তু আবার নিজ নিজ আদর্শ বলে দাবীও করছি। আমাদের ধারণাটা যেন এই যে, এগুলো সব আমাদের জানা কথা এবং আমাদের দ্বারা নিখুঁত ভাবে মানা বিষয়—জানছে না আর মানছে না কেবল অন্য পক্ষরা।

পত্রিকা খুললে বা টিভি অন করলে আমরা দেখতে পাই যে, কোনো সময়ই রাখা হচ্ছে না এই আদর্শের উপলব্ধি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞাকে পরিষ্কার ও বিস্তৃত করার জন্য। প্রশ্ন হতে পারে উন্নত দেশের টিভি চ্যানেলগুলোও কি তা করছে? না করছে না, বা হয়তো করছে না। তাহলে আমাদেরকে কেন করতে হবে? অর্থাৎ, টেলিভিশন বা অন্যসব গণমাধ্যমেরই যেন উচিত কাজ হচ্ছে বিনোদন-বাক্স ও রাজনীতি-বাক্স মাত্র হয়ে থাকা। অর্থাৎ, আদর্শ সম্বন্ধীয় তাত্ত্বিক জ্ঞান ও অনুশীলন করতে শেখাটা যেন একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার মাত্র, কোনো প্রতিষ্ঠানের এখানে করার কিছু নেই। যে আগ্রহী সে বই কিনুক, পড়ুক—ব্যাস হয়ে গেল সমাধান! গণমাধ্যমগুলোর পরিবর্তনের আশা দুরাশাই বলা যায়; কারণ এদের প্রতিষ্ঠা ও মুনাফার সাথে জড়িয়ে আছে তাদের ভূমিকা। আমরা ইচ্ছা করলেই তাদের দারোয়ানের অনুমতি নিয়ে দরজাটাও পার হতে পারব না, কারও সাথে দেখা মাত্র করা তো দূরের কথা। কিন্তু ব্লগারদের একটা বিরাট সুবিধা ও সহজ প্রবেশ-সাধ্যতা রয়েছে। এই দেখুন-না, আমারা কেউ কাউকে চিনি না, ঘর থেকেও বেরুতে হয় না, কোনো আবেদনপত্রও জমা দিতে হয় না—অথচ দিব্যি সকলেই ব্লগ পাবলিশ করেই যাচ্ছি।

ব্লগাররা ব্লগ লেখার বিনিময়ে অর্থ পান না, দিলেও নিতে চাইবেন না। এখনও পর্যন্ত শুনিনি দেশে ব্লগারকে কোনো পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে বা ব্লগ লিখে কেউ বড় কোনো চাকুরী পেয়েছেন। আমরা বরং এই অবস্থাকেই ভাল বলে জ্ঞান করতে পারি এবং পারিশ্রমিক বা পুরস্কারের দিকে না যেতে পারি। এগুলো একজন বড় মনীষীকেও কাত করে ফেলতে পারে। এভাবে কাত হওয়ার একটি বড় কারণ হচ্ছে এই যে, তাদের এই মনীষাই তাদের রুটি-রোজগারের উপায়। কিন্তু ব্লগারদের এই সমস্যাও নেই। অন্যদিকে, ব্লগার চরিত্রটি একটি গণচরিত্র। তারা অভিজাত কোনো মহল্লাতে সাধারণ মানুষ থেকে দূরে বাস করেন না। বরং সমাজের সব স্তর থেকে তারা নিজ বাসস্থান ত্যাগ না করেই ব্লগিং-জগতে বিচরণ করেন। প্রথাগত বুদ্ধিজীবীদের কিন্তু গণভিত্তি নেই। তাদের চিন্তার ও অবস্থানের উচ্চতাই এর কারণ। আমাদের কালে গণমানুষ বড়-বড় কঠিন-কঠিন সব বই এতো-এতো টাকা দিয়ে কিনতেও পারে না, আর পড়ারও সময় পান না। এই অর্থ ও সময়ের অভাব তারা পূরণ করতে চাইবেন ব্লগ সাইটে এসে। এখানে আসা গ্রামের মানুষদের জন্যও সহজ হয়ে যাচ্ছে। কাজেই ব্লগাররা যদি ক্রমেক্রমে জাতির বিবেক, বুদ্ধিসত্ত্বা (জীবিকার সাথে সম্পর্ক না থাকায় বুদ্ধিজীবী শব্দটা এখানে বেমানান) ও গণশিক্ষক হয়ে উঠেন, তবে গণমানুষের পক্ষে সচেতন ও বিচারশীল হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে পুঁজি যে বিশাল বাধা তৈরি করেছে তা তছনছ করে দেয়া সম্ভব হবে।

ব্লগারদের কোনো ভগবান থাকারও দরকার নেই। ভগবান বলতে আমি অর্থ-পুরস্কার, প্রতিষ্ঠান-ক্ষমতা ইত্যাদিকে বুঝচ্ছি। অর্থাৎ, এসব ভগবানের মুখপাত্র হওয়ার বা তাদের প্রতি নিরঙ্কুশভাবে অনুগত থাকার কোনো দরকারই ব্লগারের নেই। পার্থিব ভগবানগুলো থেকে মুক্ত থাকার সাথে নিজের স্বাধীনতারও সম্পর্ক রয়েছে। তাহলে ব্লগারদের কি কোনো ধর্ম বা আদর্শ থাকবে না? তারা কি নিরুদ্দেশে যাত্রা করে বেড়াবেন? না। তবে তাদের বেশী খেয়াল থাকবে কতকগুলো মানবিক মূল্যবোধ ও নীতির প্রতি—যেমন: যত্ন, অহিংসা, মমতা, ন্যায়, ব্যক্তিস্বাধীনতা, জনগণের উন্নয়ন, শোষণ অবসানের আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি। সব খোলস-সর্বস্ব বা আকারি ধর্ম বা আদর্শের মধ্যে তিনি নিজেকে বন্দি করে রাখবেন না এবং সব ধরণের মোল্লা, পুরোহিত তো অবশ্যই, এবং এমনকি আধুনিক আচার্য থেকেও তিনি সাবধান থাকবেন। এই ভগবানসমূহের ব্যাপারে আরেকটি কথা না বললেই নয়। স্বয়ং ধর্ম, ভাবাদর্শ বা ভাবমূর্তিও ভগবান হয়ে উঠতে পারে। আমাদের মুসলিমদের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিজেদেরকে প্রকৃত একেশ্বরবাদী বলে দাবী করলেও তারা কিন্তু আদতে নিজের ভাবাদর্শের নির্মম উপাসকে পরিণত হয়েছেন। কোনো আদর্শ, কিতাব, বা ভাবমূর্তি যখন ভগবানে পর্যবসিত হয়, তখন মানুষের উপর তার উপাসক ভয়ংকর আঘাত করতেও দ্বিধা করেন না। এই অভিযোগ তথাকথিত উদারনৈতিকতাবাদীদের জন্যও সত্য। তারাও আদর্শের নামে অন্য জাতির উপর, অন্য সম্প্রদায়ের উপর, অন্যদের জীবন ও সম্পদের উপর নির্মম হামলা করতে পারেন অবলীলায়।

এসব নানা কিসিমের ভগবানের রাহু থেকে মুক্ত থাকা গেলে একজন ব্লগার এমন লেখা লিখতে পারবেন, যা থেকে সকল মানুষই উপকৃত হতে পারবেন। এজন্য কোনো পাঠককে তার ধর্ম বা আদর্শ ত্যাগ করতেও হবে না। অর্থাৎ প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ আদর্শকে বুঝার ক্ষেত্রে লেখাটিকে সহায়ক বলে ভাববেন। একজন ব্লগারের প্রতিটি পোস্টকেই যে এরকম হতে হবে তা নয়। আমি যে প্রত্যাশাটি করছি তা হলো তারা অন্তত কিছু লেখা এমন হওয়া দরকার। আমাদের সবচে বড় সমস্যাটি হচ্ছে, আমরা সাধারণত আত্যন্তিক রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করাকেই আমাদের আদর্শ ও আদর্শের অভিব্যক্তিতে পর্যবসিত করছি। অর্থাৎ, আমাদের আদর্শের যেন কোনো ধারণাগত ইতিবাচক আদল বা ছাঁচ নেই—যা থেকে মূল্যমানগুলোকে নিঃসৃত করা যায়। কারও আদর্শে এমন একটি ছাঁচ থাকলে তা বিশ্লেষণ করার আগ্রহ তার মধ্যে তৈরি হবে না কেন? এটি তৈরি হওয়াই তো স্বাভাবিক। ফলে কিছু লেখা তো সেরূপেই হওয়ার কথা।

এ ক্ষেত্রে দক্ষতা তৈরির উপায় হচ্ছে পড়াশোনা করা। এই পড়াশোনার ক্ষেত্রে ব্লগারদের একটি অসুবিধা তো অবশ্যই রয়েছে। বুদ্ধিজীবীরা বুদ্ধিচর্চার ক্ষেত্রে, বলা যায়, একরকম ফুলটাইম ওয়ার্কার। ব্লগারদের স্বতন্ত্র পেশা থাকায় তা তাদের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সুবিধা দিয়েছে বটে, কিন্তু এটাই আবার অসুবিধা তৈরি করেছে পড়াশোনার ক্ষেত্রে—সময়য়ের অভাব থেকে। এই অসুবিধা সত্ত্বেও ব্লগারদেরকে বড় বড় বুদ্ধিজীবী লেখকদের বই পড়তে চেষ্টা করতে হবে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এই পড়ার সময় আইডিয়া তৈরি হয়, বিভিন্ন আইডিয়াকে এক সুতোয় বোনা যায়, যা একটি ছোট লেখায় ধারণ করা সম্ভব—যা একটি ব্লগ হিসেবে পোস্ট করা যায়। আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, তাঁরা আধুনিকতার বলয় ছাড়িয়ে উঠতে পারেননি। পশ্চিমা মনীষা কিন্তু স্থির হয়ে নেই; একই পুরাতন বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ থেকে অস্থির হয়েও নেই। তাদের কিছুকিছু বই কলকাতা থেকেও অনুদিত হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নীটশে, মাইকেল ফোকাল্ট (বা মিশেল ফুকো), এডোয়ার্ড সাঈদ, জন রলস, অমর্ত্য সেন, নোয়াম চমস্কি ইত্যাদি। এসব লেখকের বই কঠিন—এই অভিযোগ করে দূরে থাকা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য ভাল হবে না বলেই আমার দৃঢ় ধারণা। আর পড়ার চেষ্টা করলে, পরিশ্রম করলে একসময় কিছুটা হলেও উপকৃত হওয়া গেছে বলে মনে হবে। বই পড়তেই হবে—পড়া ছাড়া উপায় নেই। পড়ার সাথে নিজেকেও চিন্তা করতে হবে; বই-বিবাগী কেবল-নিজস্ব চিন্তা যথেষ্ট নয়। ব্লগাররা জনগণ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সেতু হয়ে উঠতে পারেন বা সহজ ইন্টারপ্রেটারের ভূমিকায় নামতে পারেন, যা গণচিন্তাশীলতা বা গণসচেতনতা বিস্তারে সহায়ক হবে।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী