ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ইসলাম ধর্মের যে ব্যাখ্যা বর্তমান বিশ্বে সংঘবদ্ধভাবে প্রচারিত হচ্ছে এবং ধর্মের অঙ্গনে প্রভাবশালী হয়ে আছে তাকে এক কথায় সালাফি ইসলাম বলা যায়। সালাফিদের মধ্যেও নানা মতধারা রয়েছে, একেবারে জিহাদিরা পর্যন্ত। জিহাদি শব্দটি আমার নয়, এটি তাদেরই তৈরি, তারা নিজেরাও নিজেদের জন্য তা ব্যবহার করে থাকেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো সম্প্রদায়কেই সহজে এমন কোনো পরিচয়ে চিহ্নিত করতে চাই না যা তারা নিজেরা নিজেদের পরিচয়ের জন্য ব্যবহার করেন না। অতীতের একটি উদাহরণ হচ্ছে খারেজিরা। তারা নিজেরাই নিজেদের খারেজি (বিচ্ছিন্ন) বলে পরিচয় দিতেন। তবে সব সালাফিই আত্যন্তিকভাবে অক্ষরবাদী। ধর্ম, কোরান-হাদিসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তারা নিষ্ঠার সঙ্গে অতীতের চতুর্থ প্রজন্মের মুসলিমদের অনুসরণ করেন, যাদেরকে তারা সালাফ হিসেবে গণ্য করেন। সালাফ অর্থ পূর্ববর্তীগণ। সালেহ শব্দের অর্থ করা হয় পুণ্যাত্মা বা ধর্মনিষ্ঠ হিসেবে। সালাফ বলতে তারা আস-সালাফ আস-সালেহ বুঝিয়ে থাকেন, যার সামগ্রিক অর্থ ‘পুণ্যবান পূর্ববর্তীগণ’।

সালাফিরা কোরান এবং সুন্নিদের দ্বারা গৃহীত হাদিসের গ্রন্থগুলো অনুসরণ করেন খুবই কঠোর আক্ষরিক অর্থে। তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে গ্রহণ করলেও দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করেন। তারা এতোই অক্ষরপন্থী যে, তারা আল্লাহর হাত-পা’য়ে বিশ্বাসী, যদিও এর ব্যাখ্যায় বলে থাকেন যে, আল্লাহর হাত-পা সৃষ্টিজগতের কারও হাত-পায়ের সদৃশ নয়। এরূপ অর্থে হাত-পায়ে বিশ্বাস না করাকে তারা আল্লাহর গুণকে অস্বীকার করা হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আধুনিক দুনিয়ায় এই সালাফিরা মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোর সহায়তায় ব্যাপক প্রচারে নিয়োজিত এবং ইউরোপ-আমেরিকায় ধর্মান্তরিতদের মধ্যেও এই সালাফি ভাবধারা ব্যাপকভাবে গৃহীত হচ্ছে। অক্ষরবাদী ঐতিহ্য সুন্নি মনীষায় ব্যাপকতা লাভ করে আবু-হানিফা, মালিক ও শাফেয়ির মতো ক্লাসিক্যাল নীতি-আশ্রয়ী আইনবেত্তাদের পরবতীকালে, আহমদ ইবন হাম্বলের মাধ্যমে। পূর্ববর্তী তিনজন ছিলেন কম-বেশী বুদ্ধিবাদী ও উসুলি। ইবন হাম্বল হাদিসকে সামনে নিয়ে আসেন। শিয়াদের মধ্যে প্রথমে এসেছিলেন আখবারিরা, যারা শিয়া হাদিসের বইগুলোর উপরই কেবল নির্ভর করতেন; পরে আসেন উসুলিরা। হাম্বলীদেরকে যদি আখবারি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় তবে বলা যায় যে, সুন্নিদের মধ্যে প্রথমে আসেন উসুলিরা আর শেষে আসেন আখবারিরা।

সৌদি আরবের মুহম্মদ ইবন আব্দুল ওহাব ছিলেন হাম্বলী। তারও অনেক আগে উমাইয়া স্পেনের ইবন হাযম অক্ষরবাদী ধারার প্রবর্তন করেন। ইবন তাইমিয়াও ছিলেন স্পেনবাসী এবং অত্যন্ত প্রতিভাবান ব্যক্তি। তিনি এই অক্ষরবাদী ভাবধারাকেই কার্যত সম্প্রসারিত করেন। অধিবিদ্যা ও দর্শনের প্রতি এরা সবাই অত্যন্ত বিরূপ। তবে এটি খুবই আমোদের বিষয় যে, দর্শনের বিরুদ্ধে এন্তার লিখতে গিয়ে ইবন তাইমিয়া রীতিমতো দার্শনিক প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আহলে হাদিসদের অবির্ভাব হয়। আজকের সালাফিরা একদিক থেকে আহলে হাদিসও বটে। কিন্তু আলীর কালের খারেজি চিন্তার সাথে জিহাদি সালাফিদের মতেরও মিল রয়েছে। খারেজিরা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য মুসলিমদেরকে—আলী ও তার অনুসারীরা এবং ওসমান ও মুয়াবিয়ার অনুসারীরা—ধর্মত্যাগী বলে ঘোষণা করেছিল। সালাফি চিন্তাধারায় খারেজিদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতের প্রভাব লক্ষণীয়। প্রভাবশালী ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর মতের মধ্যেও খারেজি-সালাফি উপাদান রয়েছে।

সালাফি চিন্তায় ধর্ম হচ্ছে আইনের আনুগত্য আর আইন হচ্ছে ফরজ-ওয়াজিব-হালাল-হারামের সাদাকালো তালিকা, অনেকটা একাউন্টিংয়ের ডেবিট-ক্রেডিটের ফিরিস্তির মতো। ব্যক্তির বিকাশ বলতে যদি চিন্তা-উপলব্ধি-প্রজ্ঞার বিকাশ এবং আধ্যাত্মিক-নৈতিক উৎকর্ষতাকে বুঝায় তবে তাদের চিন্তা এ থেকে একেবারেই ভিন্ন। একারণে তারা বুদ্ধিবাদী শিয়া ও মরমী সুফিদেরকে একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। তবে একথাও ঠিক যে, শিয়াদের ইমামভক্তি, সুফিদের পীর-শাইখভক্তি এবং উভয়ের কবর-প্রীতিও তাদের প্রতি সালাফিদের বিদ্বেষের একটি কারণ। সালাফি চিন্তা মুসলিম যুবসমাজে ক্রমবর্ধমান আবেদন তৈরির পেছনে এটিও একটি কারণ। সালাফিরা আল্লাহর অংশীহীনতার উপর যে জোর দেন তা যুবমানসে সহজেই আবেদন তৈরি করে। প্রসঙ্গত বলা যায় যে, সালাফিদের রূঢ় অক্ষরবাদী চিন্তাকে প্রতিহত করতে গিয়ে উদারপন্থীরা সুফিবাদীদের কোলে আশ্রয় নিয়ে কেন ব্যর্থ হচ্ছেন তার কারণ এখানেই নিহিত বলে আমার মনে হয়। একটি বিপদজনক চিন্তাকে ঠেকাতে গিয়ে একটি পশ্চাদপদ চিন্তাকে কাছে টেনে নেয়ার ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠা যুবসমাজ উদারপন্থীদের উপর আস্থা হারাচ্ছেন।

উপরের অনুচ্ছেদে আমরা দুটি ধারণা পেয়েছি: একেশ্বরবাদ ও সুফিবাদ। সালাফিদের সব সাফল্যের পেছনে রয়েছে একেশ্বরবাদ সম্বন্ধে তাদের ধারণা। অন্যদিকে, পীর-মুর্শিদি ধারার মধ্যে যে ব্যক্তিভক্তিসহ নানা কুসংস্কারের আতিশয্য রয়েছে তা সালাফিদের উত্থানে সহায়তা করছে। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোর কোনটিতে কোন ধরণের মৌলবি সাহেবরা আসছেন তা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় কোন চ্যানেলটি কোন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ধারার। আর সত্য কথা হচ্ছে, সালাফি ধারার চ্যানেলগুলোর প্রতিই মানুষ বেশী আগ্রহী ও আস্থাশীল হয়ে উঠছেন। সালাফিদের একেশ্বরবাদ সংক্রান্ত মতাবলীর মধ্যে নানা ত্রুটি ও বিপদ রয়েছে ঠিকই কিন্তু ত্রুটিগুলো সাধারণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে উদারপন্থী মুসলিমরা ব্যর্থ হচ্ছেন। উল্টো প্রতিষেধক হিসেবে অধিকতর কুসংস্কার সম্বলিত ইসলাম নিয়ে হাজির হওয়ায় সালাফিদের আরও পোয়াবারো হয়েছে। একেশ্বরবাদ যেমন ইসলাম ধর্মের একটি মৌলিক উপাদান, তেমনই সুফিচিন্তায় বিদ্যমান অনেক উপাদানও ইসলাম ধর্মের মৌলিক ও অপরিহার্য লক্ষ্য। আমাদের এখন প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে এই দুই চিন্তার প্রকৃত উপাদানগুলোকে বাছাই করে তাদের সম্মিলন ঘটানো—নয়তো ভয়ংকর সালাফি চিন্তার বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

আমার আলোচনার আসল বিষয়টি হচ্ছে সালাফিদের একটি প্রবণতা চিহ্নিত করা। কারও কাছ থেকে কিছু পেলে তার প্রতিদান দেয়ার চেষ্টা করা একটি নৈতিক গুণ। গতকাল যদি কেউ আপনার জীবন রক্ষায় সহায়তা ক’রে আজ যুদ্ধের মাঠে আপনার হাতে ধরা পড়েন, তবে আপনি তাকে মুক্ত করে দিতে চাইবেন। আমি যদি আপনার অনুসৃত কোন নীতির কারণে সুবিধা পাই তবে তার প্রতিদান দেয়া সম্ভব হতে পারে আপনার সাথেও অনুরূপ নীতি অনুসরণ করার মাধ্যমে। এটি হচ্ছে নৈতিকতার রেসিপ্রোসিটি রুল বা সুবর্ণ বিধি। কোরানেও এই সূত্র প্রযুক্ত হয়েছে। কোরানের নারীবাদী চরিত্রটির এটি একটি চিহ্ন যে, মানবসমাজ দ্বারা গৃহীত নীতিগুলোর প্রধান কয়েকটিকে তা ব্যবহার করেছে কেবল নারীর ক্ষেত্রেই। যেমন সুবর্ণ বিধির সাধারণ রূপ আমরা কোরানে পাই না। কিন্তু নারীর বেলায় বলা হয়েছে: নারীর প্রাপ্য তার কাছ থেকে প্রত্যাশার সমরূপ। একইভাবে আমরা মনে করে থাকি যে, কোন মানুষকেই উত্তরাধিকারে পর্যবসিত করা অনুচিত। এব্যাপারে ইমানুয়েল কান্টের ক্যাটাগরিক্যাল ইমপেরেটিভের একটি প্রকাশকে স্মরণ করা যেতে পারে, যেখানে বলা হয়েছে, কারও সাথে এমন কিছু করো না যেন তোমার কোনোকিছু অর্জনের জন্য সে নিমিত্ত মাত্র হয়ে পড়ে। নিজের স্বার্থে এভাবে কাউকে ব্যবহার করার অর্থই হচ্ছে তাকে উত্তরাধিকারে পর্যবসিত করা। কোরানে এই নীতিটিকেও নারীদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তোমরা নারীদেরকে তোমাদের উত্তরাধিকারে পর্যবসিত করো না।

সে যাই হোক, বলছিলাম সুবর্ণ বিধি নিয়ে। পশ্চিমা মুলুকগুলোতে ধর্ম ও চিন্তার স্বাধীনতা জনগণ কর্তৃক স্বীকৃত ও গৃহীত হয়েছে অনেক দিন হলো। তাদের এই মূল্যবোধ মুসলিমদেরকে ধর্মপ্রচারে স্বাধীনতা ও সুযোগ দিয়েছে। তাদের সমাজে কেউ নিজের ধর্ম ছেড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার কারণে তাকে অত্যাচারের মুখে বা জীবন নিয়ে হুমকির মধ্যে পড়তে হয় না। কিন্তু সালাফিরা এই সুযোগ নিচ্ছেন বটে, কিন্তু কোন মুসলিম ইসলাম ধর্ম ছেড়ে দিলে তারা তার প্রাণনাশের বৈধতার ফতোয়া দিচ্ছেন। ব্যক্তি-স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, নারী, শোষিত-বঞ্চিত শ্রেণিসমূহের প্রতি সালাফি দৃষ্টিভঙ্গি অগ্রহণযোগ্য। এর অর্থ এ নয় যে, গ্রহণযোগ্য ইসলাম তৈরি করার জন্য কোরানকে বা ইসলামকে বদলাতে হবে; বরং সালাফিদের চিন্তাধারা খোদ কোরান ও নবীদের চিন্তাধারার সাথে সংগতিহীন। আমাদের দরকার প্রকৃত ইসলামকে পুনরাবিষ্কারের চেষ্টা করা।

সালাফিদের চিন্তাগত সব সমস্যার মূলে রয়েছে জ্ঞান সংক্রান্ত তাদের মূলনীতি। দূর অতীতের সালাফদের অনুসরণ করার নীতিটি নিজ থেকেই ভ্রান্ত। দূর অতীতের কোনো একটি কালের চিন্তাধারাকে বজায় রেখে চলতে হলে স্বাধীন বিকাশের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ইংরেজ আমলে আমাদের দেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে বেশ কিছু প্রগতিশীল মুসলিম মনীষা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এই মনীষা পরে আর অগ্রসর হতে পারেনি। বরং উল্টো ওহাবি-সালাফি সংকীর্ণ ভাবধারা প্রগতিশীলদের প্রয়াসটিকে ছাপিয়ে উঠেছে এবং উঠছে। এটিকে অকার্যকর করতে হলে একটি মুক্তবুদ্ধিভিত্তিক প্রচেষ্টা দরকার—যেখানে আল্লাহ ও কোরানের প্রতি আন্তরিকতা যেমন থাকবে তেমনই পশ্চিমা দর্শনকেও ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে চর্চা করা হবে।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি