ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোনো এক গল্পের কোনো এক বাবু সব ক্ষেত্রেই অল্প মাত্র কারণে কোনো ক্ষেত্রেই কিছু হইতে না পারিয়া অবশেষে পরম আক্ষেপ অন্তরে লইয়া আপন নিবাস পাতিয়াছিলেন ‘হইলে হইতে পারিত’ নামের দেশে। তাহাদের আমলে সেই দেশে লোকবসতি নির্ঘাত ঘন ছিল বলিয়া অনুমান করা অসঙ্গত হইবে না। মাখন ভাসিয়া ফেনা তুলিয়া পাতিল ভরিয়া না উঠিলে ঘুটনেওয়ালা ক্ষান্ত হন না। বলক উঠিয়া দুধ উপচাইয়া ছ্যাঁত ছ্যাঁত শব্দে আগুনে আহুতি না দিলে গিন্নি চুলা অভিমুখে ধাবমতী হন না। তেমনই, গাঁ জুড়িয়া চোর-বাটপারের দৌরাত্ম্যে সকলের নাভিশ্বাস না উঠিলে গৃহস্থেরাও রাও-মাত করেন না। একই মতে, সেই কালে উক্ত চরিত্রের সাহেবদিগের আধিক্য না ঘটিলে ঠাকুরেরও সাধ্যি ছিল না দেশটাকে আবিষ্কার করেন। ইদানীং অনুভূত হইতেছে যে, ‘হইলে হইতে পারিত’ নামক অতীত কালীয় দেশের ন্যায় ‘না-ও তো হইতে পারে’ এবং ‘হইতেও তো পারে’ নামের ভবিষ্যৎ কালীয় দুইখানা দেশ ঘন বসতি সহকারে বিদ্যমান থাকা বিচিত্র নহে।

কেহ গাহিতেছেন, বিজলি আমার বিজলি ওগো। হক কথা—না মানিয়া উপায় নাই—চক্ষেই যদি আলোর অভাব, তবে বন-জঙ্গল থাকিলেই কী আর না থাকিলেই কী। সাধুজনেরা বলিতেছেন, উহারা অন্ধকারের জীব বিধায় তাহারা বিজলির ভয়ে সিদ্ধি হারাইবার আশঙ্কায় বন-জঙ্গল আর বাঘ-হরিণকে প্যাঁচাইয়া ফেলিয়াছেন। বিজলি আসিলে উহাদিগের বৃত্তির শুভসমাপ্তি ঘটিবে বুঝিতে পারিয়া তাহারা ক্ষিপ্ত হইয়াছেন বলিয়া আমি মনে করিতেই পারি; মনের কোনো আকার না থাকায় লাগাম পরাইবার দায় তো কাহারও নাই। তদুপরি আমার অবিদিত নাই যে, অর্ধ-ক্লীব ও পূর্ণ-ইতরদিগের ভাবনা উত্তরকালের জন্য সংরক্ষিত রাখিয়া আশরাফুল মখলুকাত মনুষ্যের প্রয়োজনে বিজলিবর্তিকার চিন্তা পূর্বকালেই সুসম্পন্ন করিতে হয় বটে।

যেহেতু আম-পাবলিকের অর্থ হইতেছে কিংভাবনার দল, সেহেতু কী হইলে কী হইবে, আর কী না হইবে, তাহা তথ্য-যুক্তি সহযোগে ভাবিয়া-চিন্তিয়া এলমুল একিন হাসিল করা তাহাদের সাধ্যের বাহিরে। সচক্ষে দেখিয়া আইনুল একিন হাসিলের জন্য তাহাদিগকে সকল কালেই তাই আখেরের জন্য অপেক্ষা করিতে হইয়াছে। এই আখের অজুদ হইবার পূর্বে তাহাদিগের কেহ পণ্ডিত সাজিবার মোহ দ্বারা আক্রান্ত হইয়া পড়িলে অধিকপক্ষে ‘না-ও তো হইতে পারে’ অথবা ‘হইতেও তো পারে’ নামক দুই দেশের কোনো একটিতে হিজরত করিয়া হাওয়া-বাতাস খাইয়া বেড়ানো ব্যতীত তাহার জন্য তৃতীয় বিকল্প নাই। আমিও আম, এবং আমের বস্তায় বসবাস করি বিধায় খুঁজিয়া পাতিয়া স্বভাবতই আমিও আমার জন্য বিকল্প কিছু বাহির করিতে পারি নাই।

অনেকেই শুনিয়া থাকিবেন, একদা এক গেরস্থের গৃহে চোর আসিয়া একে একে সমস্তই আপন ঝোলায় পুড়িয়া ফেলিলেও সতর্ক গেরস্থ বুদ্ধির দৌলতে মনে মনে ‘দেখি না কী করে’ ভাবিয়া ভাবিয়া ক্লান্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইয়াই চলিয়াছিলেন। অবশেষে তস্করবাবু মহামতি গেরস্থের লুঙ্গি ধরিয়া টান দিলেও তাহার বুদ্ধিখানা গতিজড়তার দোলে পড়িয়া ‘দেখি না কী করে’র ঘোরেই ঘুরিয়া মরিতেছিল। আমাদের সৌভাগ্য যে, সকল বাধ্যতাই বন্ধনের স্থায়িত্বকে বর্ধিত করে না, কখনও কখনও তাহা গিট্ঠু হইতে নিস্তারও উপহার দেয়। তকদিরের তাকতে ঘেরাটোপ হইতে আমাদের ভাগ্যবান গেরস্থের মুক্তি ঘটিলেও দেখিবার আকাঙ্ক্ষা যে তাহার ষোলআনা পূর্ণ হইয়াছিল সেই সুসংবাদ মূর্খেরও অজানা থাকিবার কথা নহে। ‘হইতেও তো পারে’ বা ‘না-ও তো হইতে পারে’র মতোই ‘দেখি না কী হয়’ নামের আরেকখানা দেশ এই ভবজগতে উন্মেষিত হইয়া লোকভারে ভারী হইয়া উঠিলেও আশ্চর্য হইবার কিছু নাই।

এই তল্লাটের জ্ঞানী মাত্রই জানেন যে, আমার মতো মূর্খ দ্বিতীয়টি কোথাও নাই। কাজেই ভাবীকালে ক্লীব সকল পুড়িয়া অঙ্গার হইবে, কি ইতর সকল মরিয়া উজাড় হইবে তাহা আমার পক্ষে এক্ষণই জানিবার কথা নহে। এতদপরিমাণ বুঝিতেও পারিয়াছি যে, উভয় পক্ষেই পণ্ডিত বলিয়া সুনাম আছে এমন লোকের আকাল পড়ে নাই। অধিকন্তু, চক্ষুর পত্র দুইখানা সহজে আয়েশে মুদ্রিত করিয়া রঙের বিনাশ সাধন করা গেলেও, সেইরূপে কর্ণকুহরে অঙ্গুলি প্রবিষ্ট করিয়া সজোরে চাপিয়া ধরিয়া ব্যথায় চিঁ চিঁ করিবার উপক্রম হইলেও শব্দের প্রবেশ হইতে পূর্ণ নিস্তার লাভ অসম্ভব। ফলে পণ্ডিতগণের নামে পরস্পরের নিকট হইতে নিঃসৃত নানা বিচিত্র সুনামও আমার অশ্রুত নহে। তবে ইহা বুঝিতে আমার কষ্ট হয় না যে, জঙ্গলে বাঘ আছে শুনিয়া যিনি ঘরে বসিয়া থাকেন তিনি কাপুরুষ; আর জঙ্গলে বাঘ নাই শুনিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া যদি কেহ দুর্ভাগ্যবশত বাঘের থাবায় বেঘোরে প্রাণ দেন তবেও তিনি বীরপুরুষ।

এতদসকল কারণে ‘না-ও তো হইতে পারে’ নামক দেশে অবস্থান করিয়া আমি ‘দেখি না কী হয়’ নামের দেশটিতেও একই সাথে বসবাস করিয়া চলিয়াছি। আখেরে সব ঠিকঠাক থাকিলে আমি লুঙ্গি পরিয়া বুক ফুলাইয়া চলিতে পারিব। অন্যদিকে, কপাল পুড়িবার সম্ভাবনাটি যদি বাস্তব হইয়াই যায় এবং কপালদোষে আমার লুঙ্গিখানা তস্করের হস্তগতও হয়, তবুও ভরসা রহিয়াছে—বীরপুরুষের সুখ্যাতি লইয়া বাঁচিব এবং মরিব। সর্বোপরি আশার কথা হইতেছে, সেই দিন দুর্দিন হইয়া সমাগত হইলেও (যদি হয়) কেহই কিছু আর মনে রাখিবেন না; বুড়ির কথা যেভাবে সকলে ভুলিয়াছেন, জঙ্গলের কথাও সকলে ভুলিয়া যাইবেন।

আমার বিজ্ঞজনোচিত ভাবনার দ্বিতীয় আরেকটি সুফল রহিয়াছে। কয়লা দেখিলেই কুপিত হইয়া তাহাকে কামড়াইতে হইবে—ইহা কোনো সুপ্রস্তাব নহে। যাহাদিগের কামড়াইবার ব্যারাম আছে তাহারা গরু-ছাগলের লবণ সংমিশ্রিত সুস্বাদু চামড়া আগে কামড়াইয়া বাহাদুরি দেখাইয়া লইতে পারেন। অবশ্য ইহাও আমার অজানা নহে যে, যদি হাতের ভাত মুখে পুড়িতে গেলে পাতের ভাতের কথা উঠে, আর পাতের ভাত হাতে লইতে গেলে হাতের ভাত পাতে ফেলিতে হয়, তবে ডানে-বামে ঘাস থাকিতেও কোন পাশেরটা আগে খাইতে হইবে তাহা অনেক ভাবিয়াও কোনো কিনারা করিতে না পারিয়া দার্শনিক জোহন বুরিদানের গাধাটি যেরূপে অবশেষে না খাইয়া মরিয়া গিয়াছিল, আমাকেও সেইরূপে মরিতে হইবে। তবে সুখের বিষয় হইল এই যে, যার তার গাধা হইয়া মরা অপেক্ষা সুবিজ্ঞ দার্শনিকের সুচিন্তক গাধা হইয়া মরা উত্তম।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি