ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে। এটি আজকের বাণী নয় বহু আগের। এই বাণীর শিশুটি আজও আমাদের আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই প্রথমেই বলতে পারি আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। এই শিশুটি একদিন বড় হতে হতে কিশোর হবে, কিশোর থেকে যুবক সবশেষ যুবক থেকে বৃদ্ধ। জীবনচক্রে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় এই শিশু-কিশোর বয়স। তাই এই শিশু-কিশোরদের নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। বর্তমান বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বে উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে শিশু-কিশোর অপরাধ। কোমলমতি শিশু-কিশোররা প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হচ্ছে নানা অপরাধ কর্মে। যা আমরা দেখেও না দেখার ভান করে আছি। কিন্তু এভাবে কত দিন?

এই শিশু-কিশোররা কেন অন্ধকার পথে পা বাড়াচ্ছে সেটা দেখতে হবে, সে সাথে কিভাবে তাদেরকে এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনা যায় সেটা নিয়েও গভীরভাবে ভাবতে হবে। আমাদের দেশে শিশু-কিশোররা যখন বেড়ে ওঠে তখন রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায় কিংবা কোন স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে তাদের মানসিক নৈতিক এবং দৈহিক উন্নয়নের জন্য সর্বজনীনভাবে কোন কিছুই করা হয় না। শিশু-কিশোরদের শিক্ষালয়, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকদের মান, বিনোদন, চলাফেরা, নিরাপত্তা ইত্যাদির ব্যাপারে আমাদের রাষ্ট্র উন্নত বিশ্ব তো দূরের কথা পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত, শ্রীলঙ্কা অথবা হাল আমলের ইথিওপিয়ার মতো যত্নশীল নয়। বরং রাষ্ট্রীয় মদদে সব সময় এমন সব অদ্ভুত এবং বিশ্রী কান্ডকারখানা ঘটতে দেখে তাদের শরীর মন মিথ্যা বলার জন্য, ছলছাতুরি অথবা অহেতুক দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়ার জন্য কৌশল রপ্ত করে।

দেশি-বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর একটিতেও শিশু-কিশোরদের মন ও মননশীলতার সঠিক উৎকর্ষতার জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয় না। সংবাদপত্র, বই-পুস্তক প্রকাশনা, চলচ্চিত্র, মঞ্চনাটক, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, থিয়েটার প্রভৃতির কোনোটি থেকেই শিশু-কিশোররা নির্মল আনন্দ, জীবননির্ভর শিক্ষা এবং চরিত্র গঠনের মতো কোন উপকরণ খুঁজে পায় না। তাহলে শিশু-কিশোররা শিখবে কোথা থেকে!

একটু ভেবে দেখুন আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র একটি শিশুকে জন্মের পর থেকেই অপুষ্টি, অনিরাপত্তাবোধ, অভদ্রতা, কূটনামী, অশ্লীল কর্ম, অনৈতিক যৌনতা, মিথ্যাচার, অনাচার, পাপাচার, নির্দয় নিষ্ঠুর, পাষন্ড এবং অমানবিক হওয়ার দরজা, জানালা দেখিয়ে দেয় এবং কলাকৌশল রপ্ত করার সুযোগ করে দেয়। দেশি-বিদেশি কার্টুন, বিভিন্ন সিরিয়াল, চলচ্চিত্র, সমাজের ঘুষ, দুর্নীতি, মিথ্যাচার, দাম্ভিকতা, জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার এবং অবিচারের নিত্যনৈমিত্তিক হাজারও ঘটনা শিশু-কিশোরদের মন ও মননশীলতাকে বিষবাষ্প দ্বারা আচ্ছাদিত করে ফেলে। তারা রেডিও, টেলিভিশন, কম্পিউটার, শিক্ষালয়, পাড়া-প্রতিবেশী এবং ধর্মালয় থেকে চক্ষু শীতলকারী এবং অন্তর জুড়ানো কোনো কিছুর সন্ধান পায় না। বরং কীভাবে মিথ্যা বলা যাবে, অপরকে ঠকানো যাবে, প্রতিপক্ষকে শেষ করে দেওয়া যাবে ইত্যাদি ধ্বংসাত্মক কর্মসমূহ রপ্ত করার নানান সুযোগ-সুবিধা তাদের আশপাশে সর্বদা ঘুরঘুর করতে থাকে। ফলে আমাদের শিশু-কিশোরদের দুর্বল এবং জীবাণুসমৃদ্ধ শরীরটি নানা পাপ ও পঙ্কিলতার দিকে এমনভাবে ছুটতে থাকে যে, তাদের অসহায় পিতা-মাতাকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সব কিছু মেনে নেওয়া ছাড়া কোন উপায়ান্তর থাকে না।

আমাদের দেশে কোথাও ‘সেভেন স্টার’, কোথাও ‘নাইন স্টার’, আবার কোথাও ‘ডিকসো বয়েজ’ এমন নানা নামে এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠেছে উঠতি বয়সী কিশোরদের ভয়ঙ্কর অপরাধী চক্র। এ গ্রুপগুলো নিজ নিজ এলাকায় আধিপত্য নিয়ে একে অপরের সঙ্গে প্রায়ই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। এতে ঘটছে হতাহতের ঘটনাও। এসবের জন্য অভিভাবকদের উদাসীনতা এবং ফেসবুকের অপব্যবহারকে দায়ী করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। একাধিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেছেন, শিশু-কিশোরদের অপরাধ ঘটানোর প্রবণতা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় শিশু-কিশোর অপরাধ ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। আগে বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে অবহেলিত বা দরিদ্র পরিবারের শিশু-কিশোররা অপরাধ বেশি ঘটাত। তবে বর্তমান সময়ে ধনীর দুলালরাই বেশি কিশোর গ্রুপিংয়ের মাধ্যমে অপরাধ করছে। মূলত সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকেই এমনটি ঘটছে। এক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে পরিবার ও সমাজের লোকদের সচেতনতামূলক ভূমিকা রাখতে হবে।

একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, উঠতি বয়সী শিশু-কিশোরদের এ পরিণতি বা অপকর্মে জড়ানোর পেছনে তাদের অভিভাবকদের উদাসীনতাই বেশি দায়ী। সন্তানরা কী করছে, কোথায় যাচ্ছে কোনো ধরনের খোঁজখবর রাখেন না অনেক অভিভাবক। এ কারণেই ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার করে কুপথে যাচ্ছে একশ্রেণীর উঠতি বয়সী শিশু-কিশোর।

এক্ষেত্রে আমার মনে হয় শিশু-কিশোরদের অপরাধ কর্মকান্ড থেকে সরাতে হলে প্রথমে পরিবার, সমাজ ও দেশের কৃষ্টি কালচার পরিবর্তন করতে হবে। শিশু-কিশোরদের প্রতি সব সময় সুনজর রাখতে হবে। দেখতে হবে সে কোথায় যাচ্ছে, কাদের সাথে মেলামেশা করছে এবং কি দেখছে? পাশা পাশি তাদের চাওয়া পাওয়ার বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। সমাজের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের পূর্নবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। সে সাথে আমাদের দেশে চলমান রেডিও, টেলিভিশনে প্রচারিত দেশি-বিদেশি কার্টুন, বিভিন্ন সিরিয়াল ও  চলচ্চিত্রে শিশু-কিশোরদের গঠন মূলক গল্প প্রচার করতে হবে। অল্প বয়সের শিশু-কিাশোরদের ইন্টারনেটে কি ব্যবহার করছে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি সর্বপরি পিতা-মাতাকে হতে হবে আরও যত্মশীল ও আন্তরিক।