ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

শিরোনামটা নিশ্চয়ই সবাই জানেন, ররিঠাকুরের গানের কলি–শেষের মধ্যে অশেষ আছে’। কী দারুণ! শেষের মাঝেও অশেষ…
মানুষের পরম কামনার বিষয় এই সুন্দর ধরণীতে বেঁচে থাকা। যে-ই অনাগত দিনগুলোর ছবি তার মানসপটে ভেসে বেড়ায় প্রতিনিয়ত তা একদিন বাস্তবে দেখার কী আকুতি! এই আকুতি জীবের মনের গভীরে অন্তঃসলিলা।
কিন্তু হায়!
জীবনটা বড়ই ক্ষণস্থায়ী… কালের অমোঘ নিয়মে দেখতে দেখতে শৈশব থেকে কৈশোর পেরিয়ে কবে যে বার্ধক্যে এসে পৌছে যায় টেরই পায় না। শেষতক মনের অনেক আশা আশা-ই থেকে যায়, আলোর মুখ দেখতে পায় না, আঁধারের অতলে ঢেকে যায়। আমরা যাকে ‘মানুষ’ বলি তার কি আসলেই মৃত্যু হয়!? মৃত্যুতে হয়তো একটা জীবনের অবসান হয় মাত্র!
প্রাসঙ্গিক বিষয়ে এক মণীষী’র ভাবনার কথাগুলো স্মরণে নিলে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যায়–

‘‘মানুষ তো একটা দ্বৈত সত্ত্বা, কেননা প্রত্যেক মানুষই তো আসলে একটা ‘দৈহিক-মানুষ’ আর একটা ‘মানসিক-মানুষ’। দৈহিকভাবে তো মানুষ এই পৃথিবীতে থেকেই যায়, মানসিকভাবেও থেকে যায়। আর অমৃত পান করলে তো কোনও কথাই নেই। তার মৃত্যু হবার কোনও উপায়ই নেই তখন।
দৈহিকভাবে মানুষ থেকে যায় কেমন করে? ‘পুত্ররূপে জন্মে লোক ভার্য্যার উদরে। তেকারণে জায়া বলি বলয়ে ভার্য্যারে।’ দেখা যাচ্ছে, স্ত্রীর গর্ভে আপনি যে-সন্তান উৎপাদন করলেন, সে আসলে তা আপনিই। তাই তো সন্তান উৎপাদনকে ‘রি-প্রোডাকশান’ বলে। সেই কারণেই তো রাজা হেনরি-১-এর ছেলের নাম হয় হেনরি-২, তার ছেলে হেনরি-৩ ইত্যাদি। কিন্তু ‘স্ত্রী’ (যাহাতে গর্ভ সংহত হয়’) তো মানুষের একটি নয়, হতে পারে না। তাই তার ‘গর্ভ সংহত হয়’ আরও অনেক ‘ক্ষেত্রে’ই। জমিতেও গর্ভ সংহত হয়, সেখানে আপনার লিঙ্গের কাজটা করে ‘লাঙ্গল’। ‘পুত্র’-রূপে সেখানে ‘উপজাত’ হয় শষ্যফল। এমনকি যে-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আপনি পড়াচ্ছেন, সেখানেও ‘গর্ভ সংহত হয়’। সেখানে আপনার লিঙ্গের কাজটা করে আপনার ডিগ্রির লেজ বা ‘লাঙ্গুল’, যেটা থাকে আপনার নামের পিছনে। আর সে ক্ষেত্র থেকে বহু এম.এ.পাস বি.এ.পাস উৎপাদিত হয়। ‘পুত্র’ উৎপাদনের জন্য মানুষের এরূপ অজস্র রকমের লিঙ্গ ও অজস্র রকমের যোনি (zon-e বা ক্ষেত্র) রয়েছে। তার মানে, একটা মানুষ সারাজীবন ধরে যত রকমের ক্ষেত্রের সংস্পর্শে এসে যত রকমের ‘পুত্র’ উৎপাদন করে, সে-সব কিছুর মধ্যেই সে দৈহিকভাবে একটু একটু করে থেকে যায়। এর পরও যে-মানুষটা বাকি থাকে, তার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয় গেলে আমরা তাকে গোর দিয়ে দেই। বাকি মানুষটা তখন গিয়ে জমা হয় আমাদের মাটির তলায় সংগৃহীত পেট্রলের রেকারিং ডিপজিটে আর বসুধার ফিক্সড্ ডিপজিটে। দৈহিকভাবে মানুষটার মরার কোনও উপায়ই নেই।
আর ‘মানসিক-মানুষ’টাও শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হলেই তৎক্ষণাৎ মরে যায় না। সে জায়গা নেয় উত্তরসূরিদের মনের মাটিতে। সেখানে দুটো ‘লোক’ বা স্ফিয়ার রয়েছে। উত্তরসূরিদের মনের মাটির ওপরটা ‘স্মৃতিলোক’, আর তলাটা ‘বিস্মৃতিলোক’। ‘মানসিক-মানুষ’টা প্রথমে জায়গা নেয় স্মৃতিলোকে। সেখানে যতদিন সে থাকে ততদিন সে মরে না, ততদিন সে অমর হয়ে থাকে। তবে কতদিন সেখানে সে থাকতে পারবে, সেটা নির্ভর করে সে কী পরিমাণে ‘পুণ্য’ অর্জ্জন করেছে তার ওপর। ‘পুণ্যক্ষয়’ হয়ে গেলেই তাকে মনের মাটিতে গোর দিয়ে দেওয়া হয়; সে চলে যায় বিস্মৃতিলোকে। একমাত্র বিস্মৃতিলোকে চলে গেলেই ‘মানসিক-মানুষ’টা মরে যায়। রবীন্দ্রনাথের অর্জিত সমস্ত ‘পুণ্য’ ক্ষয় হয়ে এখনও শেষ হয়ে যায়নি বলে বাঙলা সাহিত্য-পাঠকেরা তাঁকে তাঁদের মনের মাটিতে এখনও গোর দিয়ে দেননি, তাই তিনি আজও অমর। কিন্তু ‘পুণ্য’ ফুরিয়ে গেছে বলে, সৌরীন্দমোহন, শৈলজানন্দদেরকে বাঙলা সাহিত্য-পাঠকেরা তাঁদের মনের মাটিতে গোর দিয়ে দিয়েছেন। তাই তাঁরা আজ মৃত। কারণ উত্তরসূরীর স্মৃতিলোকে বেঁচে থাকতে হলে ‘পুণ্য’ চাই। ‘পুণ্য’ই এই ‘লোক’-এর মাস্টার কার্ড, পাশপোর্ট ভিসা। হাতে ‘পুণ্য’ নাই তো স্মৃতিলোকে মানুষটার স্থান নাই। সে তখন বিস্মৃতিলোকে প্রেরিত এবং অতএব মৃত।
অমৃত পান করতে পারলে মানুষ নাকি অমর হয়ে থাকে অর্থাৎ উত্তরসূরীদের স্মৃতিলোকে দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু ‘অমৃত’ জিনিসটা কোথায় পাওয়া যায়, সেটা এখনও কেউ জানে না।”

আসা যাক সেই কথায়– ‘শেষের মধ্যে অশেষ আছে’।
আমগাছে আমই ফলে, বটগাছে তেঁতুল ফলে না। ‘বেঁচে থাকি চিরকাল’– এই পরম কামনা বাস্তবায়ন করি পুণ্য অর্জনের মাধ্যমে। পুণ্য রোপন করি উত্তরসূরীর মনের মাটিতে। ‘পুণ্য’ নামক বীজে রোপিত চারাগাছের পরিচর্যা করি পুণ্য ফলের আশায়। .

‘‘গন্ধ চলে যায়, হায়, বন্ধ নাহি থাকে,
ফুল তারে মাথা নাড়ি ফিরে ফিরে ডাকে।
বায়ু বলে, যাহা গেল সেই গন্ধ তব,
যেটুকু না দিবে তারে গন্ধ নাহি ক’ব।’’

যা অর্জন করি তা-ই হোক পুণ্য, আর এই পুণ্যই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত করি। না-থাকা দিনগুলোতে দেখি সেই আশার আলো।অনাগত দিনগুলোর ছবিগুলো আমাদের আশার মানসপটে ভেসে বেড়াক প্রতিনিয়ত !! মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকি। শেষের মাঝেও রেখে যাই অশেষ..