ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

সম্প্রতি তুমুল আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ‘রামপাল’ আর ‘সুন্দরবন’। রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন হলে সুন্দরবনের বিপর্যয় ঘটবে, মৃত্যু হবে সুন্দরবনের। পরিবেশের বিপর্যয়ের আশঙ্কা! ‘সুন্দরবনও চাই, বিদ্যুৎকেন্দ্রও চাই।’; ‘সুন্দরবনের বিনিময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র চাই না।’ ‘আমি ‘ওমুক’ জন্মসূত্রে বাংলাদেশের একজন নাগরিক এবং সংবিধান (৭(১) অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক, দেশের মালিক। আমি রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’…ইত্যাদি ইত্যাদি নানান ধরনের বিশ্লেষণ, ব্যবচ্ছেদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এখন বলা যায় এ বিষয়ে সরগরম! কেউ হয়তো বিষয়টির সম্পর্কে বুঝে-শুনে, নিজ নিজ জ্ঞানলব্ধ অভিজ্ঞতায় বিশেষজ্ঞের মতামত ব্যক্ত করছেন। কেউ কেউ না বুঝেই বিশেষজ্ঞ! অন্যদের অনুকরণ করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে লেখালেখির অন্ত নেই।

বিষয়টি যে আমাকে ভাবনায় ফেলেনি তা বলি কী করে!? তবে এই বহুল আলোচিত বিষয়টি সম্পর্কে আমার মোটেও কোনো জ্ঞান নেই, তাই এর পক্ষে বা বিপক্ষে মতামত লিখতে দ্বিধান্বিত। আমি অনুকরণ করতে চাই না বলেই এই পোস্ট প্রসূত বলতে পারেন।

যা-ই হোক ‘অনুকরণ’ নিয়ে আমার ভাবনা-প্রসূত কিছু কথা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই। আভিধানিক অর্থে অনু [anu] অব্য. পরে, পশ্চাৎ সাদৃশ্য যোগ্যতা ইত্যাদি সূচক উপসর্গ। অনু-করণ [anu-karaṇa] বি. ১. নকল; ২. অনুসরণ। [সং. অনু + করণ]। অনুকরণকারী (-রিন্) বি. বিণ. নকল করতে ভালোবাসে বা অভ্যস্ত এমন।

অনুকরণ বিষয়ে কিছু উদ্ধৃতি প্রণিধানযোগ্য–

  • ‘‘প্রয়োজনের নিয়মে পরিবর্তন হইবে, অনুকরণের নিয়মে নহে। কারণ, অনুকরণ অনেক সময়ই প্রয়োজনবিরুদ্ধ। তাহা সুখ-শান্তি-স্বাস্থ্যের অনুকূল নহে’’

— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

  • ‘‘যাহা সাজে না, তাহা আপনার গাত্রে বলপূর্বক সাজাইতে যাওয়ার নামই অনুকরণ।”

— দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

  • ‘‘প্রতিভাশূন্যের অনুকরণ বড় কদর্য হয় বটে। যাহার যে-বিষয় নৈসর্গিক শক্তি নাই, সে চিরকালই অনুকারী থাকে তাহার স্বাতন্ত্র্য কখনো দেখা যায় না।’’

— বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

আগেই বলেছি আমি অনুকরণ করতে চাই না। অন্তত আলোচ্য ‘রামপাল’ আর ‘সুন্দরবন’ বিষয়ে। কাউকে যদি অনুকরণ/অনুসরণ করতেই হবে তাহলে নিজের স্বকীয়তা কোথায়? সব তত্ত্ব তো আর সবার ক্ষেত্রে একই কাজ করে না। তাই একজন লোক একটা পদ্ধতি অ্যাপ্লাই করে ভালো করতে পারে কিন্তু সেই একই বিষয় যে আমার ক্ষেত্রে ঘটবে সেটা তো নাও হতে পারে। শৈশবে অন্যের হাত ধরেই জলে নামতে হয়, সাঁতারের কৌশলও শিখতে হয় কিন্তু সাঁতার কাঁটতে হয় নিজের মত করে। শিক্ষকের লিখিত আদর্শ দেখেই বর্ণমালা শিখতে হয়। কিন্তু যে লিখতে শেখে বটে, কিন্তু সে তার মত করেই লেখে। তাই প্রত্যেকের হাতের লেখা অনন্য হয়। শিশু বয়ঃপ্রাপ্তদের বাক্যানুকরণ করে কথা বলতে শেখে কিন্তু আপন কন্ঠস্বর, অঙ্গভঙ্গি ও বাচনভঙ্গিতে সৃষ্টি করে অনন্যতা।

গৌতম বুদ্ধ কারও অনুকরণ করে বোধি লাভ করেননি, আইনস্টাইন কারও অনুকরণে আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিষ্কার করেননি, রবীন্দ্রনাথ কারো অনুকরণে কবিতা লেখেননি, লালন সাঁই কারও অনুকরণে গান করেননি, চার্লি চ্যাপলিন কারো অনুকরণে অভিনয় করেননি। এখানেই তাঁদের অনন্যতা!! নয় কি?
এ প্রসঙ্গে আরও একটা প্রাষঙ্গিক পবন্ধ পড়েছিলাম–

‘‘মায়ুকাজি ছিলেন জাপানের এক বৌদ্ধমঠের প্রধান গুরু। ধ্যান করার সময় তিনি পায়ের কাছে তাঁর পোষা বিড়ালটিকে রাখতেন। একদিন মায়ুকাজি পর্দা নিলেন। এলেন নতুন এক গুরু। নতুন গুরুকে এক শিষ্য জিজ্ঞেস করল, ‘বিড়ালটা কী করব?’ গুরুর প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ হিসেবে নতুন গুরু বিড়ালটিকে যথাস্থানে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। আশেপাশের মঠেও বিড়ালের কথা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। বিড়ালটি একসময় মারা গেল। কিন্তু, মঠবাসীরা ধ্যানের সময় বিড়ালের উপস্থিতিতে এতই অভ্যস্ত হয়ে পড়ল যে, তারা আরেকটা বিড়াল ধরে আনল। মায়ুকাজি মঠের অনুকরণে অন্যান্য মঠেও বিড়াল পোষা শুরু হয়ে গেল। তাদের বিশ্বাস ছিল মায়ুকাজির বোধিলাভ ও অসাধারণ পাঠদানের মূলে রয়েছে ‘বিড়াল’।

এক প্রজন্ম পার হয়ে যাবার পর ‘ধ্যানে বিড়ালের গুরুত্ব’ শীর্ষক গবেষণা শুরু হলো। অনেক বই প্রকাশিত হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ঘোষণা করল- বিড়াল নেতিবাচক এনার্জি ফিল্ডকে নিষ্ক্রিয় করার মাধ্যমে একাগ্রতা বৃদ্ধি করে। এভাবে ওই এলাকায় ১০০ বছর ধরে ধ্যানচর্চার ক্ষেত্রে বিড়াল অপরিহার্য হয়ে উঠল।

তারপর এক আলোকিত গুরু এলেন, তিনি ধ্যানচর্চার ক্লাস থেকে বিড়াল বাদ দিতে চাইলেন। সব শিক্ষার্থী ও সাধুরা প্রতিবাদ শুরু করল। কিন্তু, গুরু অনড়। জ্ঞানচর্যার মাধ্যমে অবশেষে তিনি মায়ুকাজি মঠ থেকে বিড়াল খেদিয়েই ছাড়লেন। যেহেতু তিনি আলোকিত গুরু ছিলেন, তাঁর তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা বিড়াল ছাড়াই উন্নতি করতে লাগল।

অন্যান্য মঠগুলো এত বিড়ালকে খাওয়ানো নিয়ে আগে থেকেই সমস্যায় ছিল। বিড়াল তাড়ানোর খবর পেয়ে তারাও মঠ থেকে ঝেটিয়ে বিড়ালগুলো বের করে দিল। পরবর্তী ২০ বছর গোটা জাপানে আগুন ঝরানো সব প্রবন্ধ লেখা হলো: বিষয়- ‘বিড়াল ব্যতীত ধ্যানের গুরুত্ব’। কথিত আছে- পুরো অঞ্চলে ধ্যানচর্চা বিড়ালমুক্ত করতে একশ বছর লেগেছিল।’’

অতএব আমরা কী করবো!? অনুকরণ নাকি অন্য কিছু!!? ভেবে পাচ্ছি না…