ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

‘বাম্বু-টাইট’ বলে একটা কথা ব্যাপক প্রচলিত। এই ‘বাম্বু-টাইট’ কথাটাই উত্তরাঞ্চলে বলে ‘মরং কষা’! সবাই জানি, বাম্বু মানে বাঁশ (Bamboo), টাইট মানে কষা, কষণ (Tight)। কেউ কাউকে চরমভাবে কাবু করতে পারলে বলে, ‘বাম্বু-টাইট দিলাম।’ আবার কেউ এধরনের কোনো ব্যাপারে কাবু হয়ে পড়লে বলেন, ‘বাম্বু-টাইট খাইলাম।’

একসময় এই গরু-মোষের গাড়িই ছিল গ্রাম্যজীবনের প্রধান বাহন। এ গাড়ির চালককে বলা হয় গাড়িয়াল, যা আমাদের সবার জানা! ‘‘ও কি গাড়িয়াল ভাই,,,,, হাঁকাও গাড়ি চিলমারীর বন্দরে রে… …’’ গানটি নিশ্চয়ই শুনেছেন সবাই। বলা বাহুল্য গ্রাম্য সংস্কৃতিতে, গ্রামের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের একটা বিরাট অনুষঙ্গ ছিল এই গরু বা মোষের এই গাড়ি। গরুগাড়ি বানাতে লাগে বাঁশ, কাঠ আর লোহার তৈরি কিছু সামগ্রী। তেমন কোনো প্রযুক্তির দরকার হয় না। গ্রামের মানুষেরা নিজেরাই তৈরি করে নিতো এসব। অবশ্য বর্তমান যান্ত্রিকতার যুগে গ্রামে গরুরগাড়ি কিংবা মোষের গাড়ি দেখা যায় না বললেই চলে।

যাক সেসব কথা! ‘মরং কষা’ কথাটা কীভাবে এলো সেটাই বরং বলি। গরুগাড়ির মূল কাঠামোতে থাকে বাঁশের দুইটি লম্বা শক্ত দন্ড যার উপর কাঠের দুইটি পাটাতন, যাকে বলতে পারি চেসিস। এই চেসিস দুটি বাঁশের লম্বা দন্ডের উপর শক্ত করে জুড়ে দিতে হয়, তার সাথে আর একটি লোহার শক্ত দন্ডের সাথে (আঞ্চলিক ভাষায় ‘ধুড়’) গাড়ির দুইটি চাকা লাগানো হয়। আর কিছু টুকিটাকি বাঁশের তৈরি জিনিষ দিয়ে বানানো হয় গরুরগাড়ি।
এই গাড়ির সম্পূর্ণ ভার বহন করে যেটি সেটি ঐ কাঠের দু’টি পাটাতন বা চেসিস (যা ‘ধুড়’ এর উপর শক্তভাবে লাগানো) গাড়ি চলার সময় যাতে এই চেসিস নড়বড়ে না হয়ে যায়, তাই মোটা দড়ি দিয়ে এগুলোকে অত্যন্ত শক্ত করে কষণ দিতে হয়।

মোটা দড়ির মাঝে একটি ছোট বাঁশের টুকরা দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কষতে হয়। এভাবে কষতে কষতে গাড়ির কাঠামোটি এমন শক্ত হয় যে, যতই বারে বারে ভার বহন করা হোক না কেন আর নড়বড়ে হয় না। গরুরগাড়ির এই দু’টি পাটাতন শক্ত দড়ি আর বাঁশ দিয়ে কষণ (Tight) দিয়ে বাঁধতে হয় বলে এটাকেই বলে “বাম্বু-টাইট”। আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় “মরং কষা”। হাহ্ হাহ্ হা!

মরং কষা, আমজনতার দশা! এক্কেবারে বাম্বু-টাইট!!

আমার এই উদ্দেশ্যটা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন। আঞ্চলিক ভাষার শব্দগুলো হারাতে বসেছি আমরা। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এসব আঞ্চলিক শব্দ বললে ওরা বলে, ‘‘এটা আবার কী জিনিস?” কোনো এক সময় হয়তো ওরা বলবে, ‘‘গরুরগাড়ি/মোষের গাড়ি দেখতে কেমন?’’ আঞ্চলিক ভাষা আর এর শব্দগুলো আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ওই ভাষাতেই আমাদের শেকর প্রোথিত। আঞ্চলিক ভাষা আমাদের মায়ের ভাষা! আসুন আমরা আমাদের আঞ্চলিক ভাষাকে ভালোবাসি, যেমন মা’কে ভালোবাসি। পরবর্তীতে ঠাকুরগাঁওয়ের আঞ্চলিক ভাষায় কিছু লেখার আশা রইল। সবাই ভালো থাকুন। ধন্যবাদ!