ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

বিদ্যুৎ না থাকলে আপনার ক্ষেত্রে হয়তো টিভি অফ থাকে, ফ্রিজ অফ থাকে, এক্সবক্স থ্রিসিক্সটি-টা কাজ করে না এবং এসি-টাও বন্ধ হয়ে যায় (অবশ্যই যদি আইপিএস থাকে তাহলে সেটাও হয় না)। কিন্তু আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে বিদ্যুৎ না থাকার মানে কেবল ফ্রিজ-টিভি বন্ধ থাকাই না, সঙ্গে মাথার উপরের বৈদ্যুতিক ফ্যানটাও বন্ধ থাকা। আর বৈদ্যুতিক ফ্যান বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে গরম চেপে ধরে তা নিশ্চয়ই নতুন করে জানানোর কিছু নেই। বিশেষ করে যখন উত্তপ্ত সূর্য সব পুড়িয়ে দিতে চাইছে, তখন ঢাকার বুকে বসেও যেন নরকের গরম কিছুটা হলেও অনুভূত হয়।

বিদ্যুৎ না থাকা বলতে আমি এমন কোনো প্রাচীন এলাকাকে বোঝাচ্ছি না যেখানে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। তৃতীয় বিশ্বে একে লোডশেডিং বলে শুদ্ধভাবে সম্বোধন করা হয়। লোডশেডিং-এর সংজ্ঞাটা ইংরেজি ব্লগে নিজের মতো করে দিলাম এইভাবেঃ In third world, it is called load-shedding. You run out of power frequently because your country’s total power production is a couple of times less than the demand. আসলেই হয়তো লোডশেডিং বলতে এটাই বোঝায়। কিন্তু আমার কেন যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে বাংলাদেশে লোডশেডিং হয় এই কারণেই। প্রায়ই খবরে দেখি এখানে সেখানে পাওয়ার প্ল্যান্ট অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সরকারের এগুলো মেরামত করতে এবং নতুন পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করতে নাকি কয়েক বছর সময় লেগে যাবে। ভালো কথা, কিন্তু কোনো অগ্রগতি তো চোখে পড়ছে না। সরকার নিশ্চয়ই এমন কোনো ভোজবাজির মাধ্যমে কাজ করছে না যে কয়েকবছর আমাদের চোখে কিছুই পড়বে না হঠাৎ একদিন হাওয়া থেকে নতুন নতুন পাওয়ার প্ল্যান্ট উদয় হবে।

হ্যাঁ, সরকারের অগ্রগতি চোখে পড়ে, তবে তা অন্যসব ক্ষেত্রে। এয়ারপোর্ট স্থাপন করতে সরকার রীতিমতো যুদ্ধ করতে রাজি। নভোথিয়েটার, বিমানবন্দর, চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র ইত্যাদির নাম পরিবর্তন করতে টাকা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। ভাবখানা এমন, নিজেদের টাকা খরচ করছে। অবশ্য বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসলে সব টাকা ব্যক্তিগত ফান্ডের মতোই হয়ে যায়। অন্তত দেশটার জন্মলগ্ন থেকে লিখিত হয়ে আসা ইতিহাস তা-ই বলে। কিন্তু আমি ওসব বাদ দিয়ে কেবল লোডশেডিং-এর কথা বলবো। এই ভয়াবহ তাপদাহে যখন একমাত্র আশ্রয় ফ্যানটাও বন্ধ হয়ে যায়, তখন সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে সরকারের উপর। তাদের জন্যই আজ সাধারণ মানুষের এই দুরবস্থা। কিন্তু তবুও তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কেন জানেন? কারণ, তারা জানেই না লোডশেডিং কী জিনিস।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীদের কেউই কখনোই তপ্ত রোদেলা দুপুরে বিদ্যুৎ চলে গেলে কেমন লাগে তা জানেন না। কিংবা রাত দুপুরে ফ্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘুম ভেঙে গেলে কেমন লাগে সেই অনুভূতিও তাদের নেই। এমনকি বিরোধী দলে গেলেও তারা বেশ আরামেই থাকেন। অর্থাৎ, এই পাঁচ বছর হোক বা পরের পাঁচ বছর, এই মানুষগুলো কখনো জানতেই পারবে না লোডশেডিং যে কতোটা যন্ত্রণাদায়ক।

এই তপ্ত গ্রীষ্মে যখন প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছাড়া কাটাতে হয়, তখন মনে হয় এর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। প্রচণ্ড গরমে বাইরে থেকে এসে একটু ফ্যানের নিচে বসবেন, সেই উপায় নেই। বিদ্যুৎ নেই। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে একটু শান্তিতে ঘুমাবেন, সরকার সেই উপায়ও খোলা রাখেনি। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে দেখবেন ঘেমে অবস্থা কাহিল। কারণ উপরের ফ্যানটা ঘুরছে না। বিদ্যুৎ নেই ঘুরবে কীভাবে!

তবে এসব কথা আবার সবার ক্ষেত্রে সাজে না। শ্রেণী বিভেদটা বাংলাদেশে চোখে পড়ার মতো। তাই যাদের টাকা আছে তারা দিব্যি আইপিএস, জেনারেটর ইত্যাদি ব্যবহার করছেন। কিন্তু মধ্যবিত্তদের যন্ত্রণার কোনো শেষ নেই। উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তদেরই সব সুযোগ-সুবিধা। মধ্যবিত্ত শব্দটাই যেন অভিশপ্ত।

অবশ্য ভাগ্য আমাদের এখনো ভালো যে রাত ২-৩টা থেকে সকাল ৭-৮টা পর্যন্ত সাধারণত লোডশেডিং হয় না। এর কারণ খুব সম্ভবত যারা বিভিন্ন এলাকার বিদ্যুৎ লাইন অফ করেন তারা এই সময়টা ঘুমাতে যান। :|

আমরা যারা ঢাকায় থাকি, তাদের ভাগ্য এতোটাই খারাপ যে কেউ আমাদের কষ্ট বুঝবে না। তথাকথিত মন্ত্রীরা তো নয়ই, অন্য কেউই বুঝবে না আমাদের দূরবস্থা। এমনকি বিদেশ থেকে যদি কোনো টুরিস্টও আসেন বাংলাদেশের এই খবর শুনে, তারাও দেখবেন না আমাদের দুর্দশা। কারণ, তারা থাকবেন কয়েক তারা হোটেলে, যেখানে অবশ্যই পাওয়ার ব্যাকআপ থাকবে।

সৃষ্টিকর্তা যদি কখনো আমার কোনো রাজনৈতিক ইচ্ছা পূরণ করতে চাইতেন, তাহলে আমি বলতাম মন্ত্রী-মিনিস্টারদের সবাইকে ২৪ ঘণ্টা টানা লোডশেডিং-এর আওতায় আনা হোক টানা দুই বছরের জন্য। ২৪ ঘণ্টা লোডশেডিং আসলে প্রয়োজন নেই। তপ্ত গরমে এক ঘণ্টার লোডশেডিংই যন্ত্রণা বোঝার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এই মানুষগুলোর জন্য যেন একটু বেশি শাস্তি পাওনাই হয়ে গেছে।

গরমে পুরো দেশটা যখন এমনিতেই তপ্ত, তার উপর নরকের যন্ত্রণা যেন এনে দিয়েছে এই লোডশেডিং। অথচ এই মানুষগুলো ঠিকই আছে শান্তিতে। তাদের জন্য এটাই বেহেশত। আর যাদেরকে তারা মূল্যায়ন করে তারা হচ্ছে উচ্চবিত্তের মানুষ, লোডশেডিং-এ তাদের রয়েছে বিকল্প ব্যবস্থা। মধ্যবিত্তের কথা তাদের ভাবার সময় কই?

যারা বিদেশে আছেন, পারমানেন্টলি দেশে ফেরার চিন্তা করছেন তারা যদি আমার উপদেশ চান, তাহলে বলবো ভুলেও আসবেন না। ঢাকা কেবল পৃথিবীতে অন্যতম বসবাসের অনুপযুক্ত শহরই না, বরং এটি পৃথিবীর বুকেই যেন নরকের প্রিভিউ।

***
প্রথম প্রকাশঃ AIS Journal

Featured on Global Voices Online.

৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. আইরিন সুলতানা বলেছেনঃ

    আমাদের দেশে সরকার ( সব সরকারই এই ক্ষেত্রে এক) যে সমস্ত প্রজেক্ট করে, সেখানে প্রজেক্ট বাজেটে কেবল নির্মাণ ব্যয়ই থাকে আমি নিশ্চিত। রক্ষনাবেক্ষণ যে কতটা প্রয়োজনীয় এবং তার জন্য বিশেষ অর্থ বরাদ্দ থাকা দরকার সেটা কোন উন্নয়ন সেক্টরেই নাই। সেতুগুলোর বেলায় দেখো, ফাটল ধরে যাচ্ছে। তাই নিয়ে আবার টেন্ডার! মহাখালী ফ্লাইওভারের নীচে সিটি বিউটিফিকেশন শুরু করল। সেটা এখন মাটির ঢিবি, জঙ্গল হয়ে আছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনায় চুড়ান্ত রকমের দুর্বলতা আছে সেটা সব ক্ষেত্রেই নজরে পড়ে। বিদ্যুতের বেলাতেই তাই।

    সরকার হলো বুঝ দেয়ার মত উদ্যোগ নেয়। যানজটে নাকাল হলে তখন রাস্তা বানায়। মানুষ ভাবে এই রাস্তা বানানো হলে জ্যাম কমবে। হায়রে! রাস্তা হতে হতে তো গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাবে। মানুষ বেড়ে যাবে। যাতায়াতের হার বেড়ে যাবে!

    একই কাহিনী বিদ্যুতের বেলায়। এখন ‘এত’ ওয়াটের লোডশেডিং হয়, সরকার সেই ‘এত’ ওয়াট পূরণে একটা পাওয়ার প্লান্ট করবে। সেটা ছয় মাসে প্রডাকশন দিবে। সেই ছ’মাসে তৈরী হয়ে গেছে অসংখ্য নতুন অ্যাপার্টমেন্ট, অসংখ্য মানুষ কিনেছে এসি/টিভি/ফ্যান/ওয়াশিং মেশিন/ওভেন!

    এই যে সময়ের বিপরীতে নিড এনালিসিস…এইটা সরকার করে না বলেই শোডশেডিং কমে না। কমবেও না।

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...