ক্যাটেগরিঃ অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড - ব্লগ সংকলন, আইন-শৃংখলা

 

অভিজিৎ হত্যার প্রেক্ষাপটে তাকে দেশে আসলে হত্যা করা হবে বলে ঘোষণা দেয়া ফারাবীর পূর্বে একটি মামলায় জামিন লাভ, জামিন বিষয়টিকে ব্যাপক আলোচনায় এনেছে। যেন ফারাবিকে জামিন মঞ্জুর না করলে এই হত্যা কাণ্ডটি ঘটত না ! তাই আদালতের হাতেও রক্তের দাগ রয়াছে ! অভিদা’র( আমি তাকে অভি’দা বলতাম ) চোখেও যদি দেখি বিষয়টি হাস্যকর, অভি’দা মুক্তচিন্তার মানুষ ছিলেন, স্বভাবতই আইনের শাসনে বিশ্বাস করতেন। আর আইনের শাসন সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করেই কথা বলে, প্রমানিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ অপরাধী নয়, এবং কাউকে অপরাধী ঘোষণার একমাত্র অধিকার আদালতের যেমন আদালতের অধিকার জামিন মঞ্জুর করা বা না করা। বেঁচে থাকলে অভিদা কি এতে দ্বিমত পোষণ করতেন? মনে হয় না। আমি জানি অনেকেই আবেগ থেকে কথা বলছেন, তাদের সবিনয়ে বলি , আবেগ মুক্তচিন্তার বন্ধু নয় শত্রু ।

আলোচনায় জামিন ধারনাটি বর্ণনা দাবী করে। আইনি বাবস্থার একটি অনন্য আবিস্কার বা সংযোজন এই জামিন । ফৌজদারি বিধির ৪৯৬ ও ৪৯৭ তে জামিন বিষয় টি বলা হয়েছে। এর বাইরে আরও ব্যাপক আলোচনা হতে পারে সেটি দীর্ঘ বিধায় এড়িয়ে যাই । এই দুটি বিধির প্রথম টি জামিন যোগ্য মামলার ক্ষেত্রে েএ বিষয়ে বলা হয়, এটি আসামির অধিকারের পর্যায়ে পরে। দ্বিতীয় বিধিটি জামিন অযোগ্য অভিযোগের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ জামিন অযোগ্য বলেই জামিন দেয়া যাবে না এমন কোন বিধান নেই ! এটাই সত্য। পরিস্থিতি ভেদে জামিন মঞ্জুর আদালতের বিবেচনা প্রসুত অধিকার । এ বিষয়ে ৩৫ ডি,এল,আর ২৯৭ এ, ডি দেখা যেতে পারে। আবার মানুষের বিশেষ অধিকারের পবিত্রতার প্রতি লক্ষ্য রেখে উহা রক্ষার জন্য ও জামিন মঞ্জুর করতে হয় ২২ ডি, এল, আর ৭১ ডাব্লিউ, পি ।

জামিন আসলে কী? এর মানে কি অপরাধীর দায় মুক্তি? এক কথায় জামিন কেবল হেফাজত পরিবর্তন। অর্থাৎ একজন গ্রেফতারকৃত অভিযুক্ত কে কারা হেফাজত থেকে অর্থ বণ্ড, অথবা জামিন্দারের জিম্মায় হস্তান্তর করা, এটি খুব সাধারন ভাবে বললাম। কেন করা হয় । আইন বলে প্রমান হওয়ার আগে প্রতিটি মানুষ নির্দোষ। অভিযোগ যাই হোক অভিযুক্ত কে নির্দোষ ধরে নিয়েয় বিচার কাজ শুরু হয়। এখন প্রশ্ন হল ধরুন দীর্ঘ ৫ বছর পরে একজন খালাস পেল অথচ দেখা গেল ঐ সময় টুকু সে জেলে কাটিয়েছে । অথচ মামলার অবস্থান বলছিল অভিযোগ টি জোরদার নয় তো সেই ক্ষেত্রে তাকে জামিন না দেয়া আর তাকে ৫ বছর বিনা বিচারে জেল খাটানো কি এক নয় ? ৩ বি, সি, আর ৫০ এ, ডি তে বিচারে বিলম্ব জামিন মঞ্জুরের কারন হিসেবে গ্রহন করে অসাধারন আদেশ আছে । মোট কথা জামিন অপরাধ প্রমানিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ অপরাধী নয় এবং মানুষের মুক্ত থাকার অধিকার এর প্রতি সন্মান করার ধারনাটি রক্ষা করে। জামিন মানেই রেহাই পেয়ে যাওয়া নয় ।

আজকের আলোচ্য ফারাবীর জামিন প্রসঙ্গে আসি , আদালত কেন তাকে জামিন দিয়েছেন সেটি জামিনের আদেশে বর্ণিত আছে। আমি আদেশের কপি দেখিনি কিন্তু আইন বলে জামিন অযোগ্য ধারায় জামিন মঞ্জুর করলে আদালতকে অবশই কারন ব্যাখ্যা করতে হবে । এখন প্রশ্ন হল ফারাবি গ্রেফতারের পর মামলার তদন্ত কি গতিতে এগিয়েছে, ? পুলিশ আদালতে তদন্তের অগ্রগতির কি রিপোর্ট জমা দিয়েছে ? কিছু আইন জামিন যোগ্য নয় কিন্তু এও বলা আছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযোগ পত্র না দিলে বা মামলার কোন অগ্রগতি না হলে আদালত জামিন বিবেচনা করবেন। আপনি নিশ্চয়ই এমন কোন আইন চাইবেন না যে, একবার অভিযোগ করার পর আজীবন মামলার কোন অগ্রগতি নেই কিন্তু জামিন অযোগ্য বিধায় অভিযুক্ত আজীবন কারাগারে থাকুক । আপনি নিজেকে একবার ঐ অবস্থায় ভাবুন । এদেশে বিদ্যমান অনেক কঠিন আইন আছে যেখানে মামলা নির্ধারিত দিনে বিচার সমাপ্তির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ঐ সময়ে হয়ত অভিযোগ পত্রই এলো না ! সেক্ষেত্রে আসামীকে কি করবেন ? কাজেই জামিন অযোগ্য মামলা হলেই সমাধান মিলছে না। প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ। ন্যায়বিচার এমন একটি ধারনা যা অভিজিৎ ও ফারাবি দুজনের জন্য ই সমান । আমি, আপনি ফারাবি কে জঙ্গি বলছি কিন্তু আদালত তাকে জঙ্গি বলতে হলে প্রমান চাইবে। কোন অভিযোগে আটকে রাখতে হলে অভিযোগের সপক্ষে যথেষ্ট যুক্তি থাকতে হবে ।

আমাদের দায় । আমরা আজকে যারা ফারাবী কে কেন জামিন দেয়া হল প্রশ্ন করছি, তারা কি নিজেকে জিজ্ঞেস করেছি এই চিন্হিত জঙ্গি জামিনে মুক্তির পর একের পর এক হুমকি দিয়ে গেছে হত্যার, উস্কানি দিয়েছে আমরা কি আইন কে জানিয়েছি? খুব সহজ করে বলি,  হত্যার হুমকি দেয়ার অভিযোগে যে ফারাবী গ্রেফতার এবং তদন্ত দুর্বলতার সুযোগে জামিন লাভ, সেই একি কাজ সে বারবার করেছে এটি কিন্তু তার জামিন বাতিলের কারন হতে পারত। আজ আমরা আদালত, পুলিশকে দায়ী করছি ! আমরা যদি পুলিশ কে জানাতাম আজ পুলিশ এই দাবীটি করতে পারত না অভিজিৎ এর বিষয়টি আমরা জানতাম না ! দেখুন আইনের ১২ টি মৌল নীতির মধ্যে মূল একটি হচ্ছে — তুমি ঘুমিয়ে থাকলে আইন তোমাকে জাগাবে না , অর্থাৎ প্রতিকার প্রার্থীকে আইনের কাছে আসতে হবে। আমরা কী গিয়েছি? আবেগ থেকে এমন কোন আইন যেন আমরা প্রার্থনা না করি, যা জঙ্গি বাদ অপেক্ষা নির্মম,তারচেয়ে আমরা আইনের যথাযথ প্রয়োগ চাই , আইনের শাসন চাই । এখন যারা আইন ব্যাখ্যা করেন প্রায় সবাই আইনের রাজনৈতিক পাণ্ডা, কে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন বোঝা মুশকিল। সহজ কথায় প্রচলিত আইনেই সম্ভব যদি যথাযথ নিরপেক্ষ প্রয়োগ হয় ।

প্রস্তাব। আইনের শাসন ও ব্লগারদের নিরাপত্তার জন্য নিজেদের স্বার্থেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ আমাদের চাইতে হবে। এই প্রয়োগ যথাযথ হচ্ছে কিনা , অথবা কোন ব্লগার হুমকির মুখে আইনি সাহায্য যথাযথ পাচ্ছেন কিনা এটি দেখার জন্য আমরা একটি আইনি পর্যবেক্ষণ সংস্থা করতে পারি । যেখান থেকে ব্লগাররা আইনি সহযোগিতা পাবে। মনে রাখতে হবে ব্লগার রা কেবল জঙ্গিদের টার্গেট নয় প্রগতিশীল, সুবিধাবাদি সবার টার্গেট। এবং এর মোকাবেলা করতে হবে আইনে, সভ্যতায় এর কোন বিকল্প নেই । ভবিষ্যৎ ব্লগারদের জন্য একটি নিরাপদ জগত রেখে যেতে, নিজেদের রক্ষায় দেরী হবার আগেই এটি করতে হবে। মনে রাখবেন ফারাবী যদি খুনিও হয় তার অপরাধ নিয়ে মুখ না খুলে , দিনের পর দিন তার হত্যার হুমকি সয়ে আমরাও অন্যায় করেছি, রক্তের দাগ আসলে আমাদের হাতেই লাগে ।