ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

ব্যাথা কমে গেছে, সময়ের সাথে বিলীন হয়েছে ক্ষত চিহ্ন। বড় প্রিয় সেই ক্ষতের সৃতিগুলো ফিরে আসে ফুটবলের পতনে। আবাহনী-মোহামেডান খেলা দেখে ফিরছি। মনে বড় সুখ, আবাহনী চ্যাম্পিয়ন।

ফিরে আসার পথে যানবাহন নেই, শহর জুড়ে ফাইটিং। কোন মতে এক বিআরটিসির লাইটের গ্রিলে এক আঙ্গুল ঝুলিয়ে বাম্পারে এক পায়ে ঝুলছি। বায়তুল মোকারম ঘুরছে বাস, টার্গেট করা বোধহয়, পাশ থেকে এসে উপড়ানো মাঝারি সাইজের পেপে গাছ চার্জ করল পিঠে, চোখে অন্ধকার দেখছি, কিন্তু জানি পড়ে গেলে আর পৈত্রিক প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারব না। প্রাণখানি বড় ভালোবাসি তো, অতঃপর প্রাণ হাতে ঝুলে থাক বাছা! প্রান হারানোর চেয়ে বড় দুঃখ ওটা হারালে কে চিৎকার করবে — তোমরা কারা- আবাহনী, আমরা কারা- আবাহনী, জিতবে কারা – আবাহনী অথবা বিশেষ খেলার দিনে, একটা কইরা মোহাামেডান ধর, সকাল বিকাল নাস্তা কর!

মনে আছে ফুটবল ঝগড়ায় প্রিয় বন্ধু একতলার ছাদ থেকে পড়ে  (!) হাত ভেঙ্গে হসপিটাল! আবার এক জায়গায় ভীষণ মিল। ঠোলা আক্রান্ত হলে আমরা কিংবা ওরা তখন সব এক!  এক বিখ্যাত মোহামেডান সমর্থককে বাঁচাতে যেয়ে বড় ভাইদের ঠোলা মামুর নাকের বারান্দা ফাটানোর আওয়াজ এখনো কানে আসে! এ ছিল মাঠের বাইরে, আর মাঠে?

বাঁ পায়ের শিল্পী চুন্নু ভাই ( তখন বাপ, চাচা সব ভাই ) মাঝ মাঠ থেকে বল নিয়ে পায়ের  চুম্বুকে বল আটকে, দু-তিন মোহামেডানের খেলোয়াড়কে কোথায় ছিটকে দিলেন (সম্ভবত ডজ খেয়ে সাগরে পরেছে যেয়ে )!  বক্সের কোনা থেকে জোরালো শট সেই স্বর্ণ মোড়া বা পায়ে, কিন্তু না বার পোস্টের মাথায় লেগে গোল হয়নি। তবে যে ভয়াবহ আওয়াজ হয়েছিল এখনও কানে শুনি তা! সাধে কি আর সেই বা পায়ে লুটাতো সহস্র তরুণী হৃদয়! কিংবা উনার জেলা থেকে উঠে আসা এমিলি!

হায় ডজ! হায় ডজ! মোহামেডান কোচ বোধহয় পরের দিন খেলোয়াড় খুঁজতে ভারত মহসাগরে ডুবুরি নামাতেন। ডজ খেয়ে সব তো ওখানে যেয়ে পরেছে! আবার জানের দুশমন হলেও বাপের ব্যাটা গোল কিপার মহসিন ভাই! কি ফ্লাইং কিকটা মারল জনি (সম্ভবত) ভাইকে! একবারে ওস্তাদি মাইর! আর গুরু আসলাম ভাই! আহা আহা গুরু চুন্নু ভাইয়ের লবে করছে হেড।  গোওওওওওল !

ছিল মামা আবুল! থ্রো করবা? ইয়া আল্লাহ ওর হাত দুইটা লুলা কইরা দাও, ও যেন হাই কোর্ট মাজারে ভিক্ষা করে, যে লম্বা থ্রু একেবারে পারলে গোলে ঢুকাই দেয়! এই আবুল আবার যখন জাতীয় দলের হয়ে থ্রো করে। তখন কি প্রার্থনা, মামু তোর দুই পা ধরি গোলে মার, গোলে!

আর কি সব বিদেশি! আহ বলটা ধরে কোমরে ঢেউ তুললো, প্লেয়ার তো প্লেয়ার পুরো স্টেডিয়াম ছিটকে গেল মাঠের বাইরে!  মনে পড়ে বাপ কা বেটা , ’মোনেম মুন্না’ টান টান সিনা, তর্জনীর ডগায় নির্দেশ- আক্রমণ।

মনে হতো গ্যালারি থেকে জীবন দিয়ে দেই! সালাউদ্দিন, হাফিজ, মঞ্জু, এনায়েতদের খেলা দেখিনি, কিন্তু নাম শুনলে বুক কাঁপত, নত মস্তকে সালাম ঠুকতাম সেইসব স্বর্ণ মোড়া পায়ে। আর মালদ্বীপের সাথে খেলায় তো একবার বড় মায়া লেগেছিল, ধুর এই পোলাপানেরে আর গোল দেয়ার কি দরকার?

আফগানরা বোধহয় ডাংগুলি খেলে তখন। নেপালের সাথে খেলায় ভাবতাম পরের দিন কয়টা ডিম দিয়ে নাস্তা করব! মানে যে কয়টা গোল দিবে আমাদের ছেলেরা সেই কয়টা ডিম নাস্তায়!

আরও কত কাহিনী, কত আবেগ, হাসি কান্না, প্রিয় বন্ধু বিচ্ছেদ।  জায়গা দখলের জন্য ৪২ ফুট পতাকা বানানো আবাহনী সমর্থক নোয়াখাইলা – কান পচা – ফোরকান, যত চেকিং থাক, চাপাতি নিয়ে ঢুকবেই স্টেডিয়ামে যদি চান্সে দু’চার জন মোহামেডান  পায়!

অথবা মোহামেডান এর অসীম সাহসী সেই সাদা প্যান্ট-শার্ট পড়া ছেলেটি, যে একা চাপাতি হাতে লাফিয়ে পড়েছিল আমাদের গ্যালারিতে বীর পুঙ্গব আমরা দৌড়ে পালিয়েছি! শেষে অন্তত ১৫ মিঃ ঠোলা কোম্পানির সাথে ফাইট করে ধরা খেল।

আজো সালাম তোমায় নাম না জানা ভাই আমার- সালাম তোমার সাহসকে। সেই ফুটবল! প্রানের ফুটবল, ব্যাডা মানুষের খেলা ফুটবল, জান দেয়া নেয়ার খেলা ফুটবল! জান কবুল করা কোটি মানুষের ভালোবাসার খেলা আজ কোথায়? সেই পাগল সমর্থক আজ হাতে চুড়ি পড়ে মেয়েলি ক্রিকেট এর গান গায়? না আমরা তা নই, আমাদের বুকে এখনও সেই ঘাউরা রেফারির বাঁশি বাজে, এখনও চুন্নু, মুন্না, বাদল, সালাম দৌড়ায় সৃতিতে আরে ‘ম অক্ষরে গালি দিলেও মোহামেডান তো জীবনেরই অংশ। খেলার দিন ফাইটিং, খেলা শেষে ওরাও তো ভাই আমাদের ।

আজ বুকের ভেতর কান্নার ঢেউ জাগে এ কোন ফুটবল? মাঠের মরদ কি ফিরে আসবে আর? আসবে জানি, আসতেই হবে। আজ বাংলাদেশের, মেধাহীন ক্রীড়া সাংবাদিকদের কাছে জানতে চাই কেন এই পতন? শুরুর বিন্দুটি চিহ্নিত করতে পারেন কি? আপনাদের দায়িত্ব ছিল সেটা। ফুটবল বেঁচে অনেকে অনেক কিছু করেছে, দেয়নি কিছুই। সেই চেহারাগুলো সামনে আনুন, এখনও সময় আছে। আর নইলে আমাদের কান্না যদি ক্রোধে রুপ নেয় তাহলে সব … …!