ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

প্রতিবছর নববর্ষের নানান অনুষ্ঠান হয় শাহবাগ এলাকাকে কেন্দ্র করে, ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সেই ৫০ বছর ধরে হয়ে আসছে, মঙ্গল শোভাযাত্রা ২৮ বছর যাবত হয়ে আসছে, এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এই নববর্ষের নানান আয়োজন করে থাকে শাহবাগ এলাকায়। গতবছর এবং এবছরে বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বির্তক শুরু হয়।

সেই বিতর্কের সাথে নানান উড়ো হুমকি আর তথাকথিত সাংস্কৃতিক নেতাদের নানান কথা-বার্তায় নিরাপত্তার একটি ইস্যু তৈরী করে যা আর মানুষের স্বাভাবিক মিলনমেলা আর স্বাভাবিকতা থাকে না। এবছর নিরাপত্তার কথাগুলো মন্ত্রী বাহাদুর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের কর্মচারী পুলিশ র‌্যাবের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ নানান ফরমানে আনন্দ যাত্রাকে আতঙ্ক যাত্রায় রূপ দিয়েছেন। শেষ পরিণতি মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে শুরু করে পুরো শাহবাগে মানুষ চার ভাগের একভাগও হয়নি এবং যারা এসেছেন শুধু বিভিন্ন স্থাপনার সামনে ছবি ও সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে চলে গেছেন।

21_Boishakh_Mongol+Sovajatra_140417_0033

এমনই ফাঁকা প্রাণহীন আতঙ্কগ্রস্থ মানুষের মাঝে উৎসব

এর একটি ক্রটিপূর্ণ বিষয় ঘটেছে, মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে। সেটা হচ্ছে, সময় ঠিক ছিলনা। প্রতিবছর সাড়ে আটটায় মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার রেওয়াজ ছিল, কিন্তু এ বছর শুরু হয় ন’টায় এবং কোন কোন টেলিভিশনে লাইভ টেলিকাস্টে ১০টায় শোভাযাত্রা বের হবে বলে বলতে থাকে। এতে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়ত, প্রতি বছর শোভাযাত্রাটি চারুকলার গেট থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ মোড় ঘুরে টিএসসি, বাংলা একাডেমি, দোয়েল চত্বর হয়ে হাইকোর্টের মোড় ঘুরে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে শেষ হয়।

কিন্তু এ বছর শাহবাগ মোড় থেকে শুরু করে চারুকলা ইনস্টিটিউটের গেট পর্যন্ত বড়জোড় ১০০ মিটার মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়। এতটা কাটছাট, নানান বিশৃঙ্খলা, লোকজন ফাঁকা, নিরাপত্তাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষ শোভাযাত্রায় অংশ না নিয়ে রাস্তার দু’ধারে নিরাপত্তাকর্মীদের ঘিরে রাখা পায়রা, বাঘ, হরিণ, প্যাঁচার কাঠামোগুলো দূর থেকে দেখেছে। মুখোশগুলো যেন আর দোলেনি, সবাই হাতে হাতে বাড়ি নিয়ে গেছেন বসার ঘরের শোভা বাড়ানোর জন্য। এই হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রার চিত্র!

বারবার যখন হুমকির নানান উপাত্ত প্রাকাশ্যে বলে বলে মানুষের মধ্যে ভয় পাইয়ে দেয় তখন উৎসব আর প্রাণবন্ত থাকে না। নিরাপত্তার বাড়াবাড়িতে মানুষের মাঝে আতঙ্ক থাকায় মানুষ আর শাহবাগমুখী হয়নি। পুলিশ খুব কঠোরভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করেছে যা নজিরবিহীন। কাঁটছাট আর সংক্ষেপ বিষয়টি চারুকলার নেতা শিক্ষকগণও জানতেন না, যার দরুণ লাইভ দেখানোর জন্য টিএসিতে যে কটি টেলিভিশন কর্মীরা নানান স্থাপনার উপর থেকে শোভাযাত্রার ভিডিও করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তারা বসেই প্রহর গুনেছেন, মানে হচ্ছে তারাও জানতো না মঙ্গল শোভাযাত্রা এতটা কাটছাঁট হবে।

কিন্তু ঢাকা শহরের মানুষ বাসায় বসে ছিল না, ধানমন্ডি লেক, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ-এ সারাদিন মানুষের ব্যপক উপস্থিতি ঘটেছে কোন ধরনের নিরপত্তার আতঙ্ক ছাড়াই। মানুষ একটু বেড়িয়ে আসতে চায় পরিবার পরিজন নিয়ে, তারা একটু খোলা আকাশের নিচে শান্তিতে কোলাহল উপভোগ করতে চায়। সেটা নিয়ে যদি এমন হতেই থাকে তাহলে মানুষ হয়তো একদিন এফডিসিতে তৈরী হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখবে।

সরকারের কয়েকটি বিষয় ভাবা দরকার-

১. নিরাপত্তার যদি এতই ঘাটতি থাকে তবে কি আর মঙ্গল শোভাযাত্রার কোন প্রয়োজন আছে কি না?
২. শাহবাগকে কেন্দ্র করে দেশে নববর্ষের যে অনুষ্ঠানমালার জাগরণ তৈরী হয়েছে তা কি বজায় থাকবে না কি সরকার কৌশলে এর গলায় চাপা দিচ্ছে?
৩. নববর্ষের যে রেওয়াজ চালু হয়েছে তাতে নাকি ১০ হাজার কোটি টাকার মার্কেট তৈরী হয়েছে সেটার কী হবে?
৪. বিভিন্ন দেশীয় পোশাক তৈরী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে তার দিকে কি কোন দৃষ্টি আছে?

সবকিছুর মূলেই শাহবাগকে কেন্দ্র করে মানুষের মিলনমেলায় আমাদের নববর্ষের সাংস্কৃতিক যে বলয় তৈরী হয়েছে তা শুধু সরকারের কৌশলে আতঙ্ক ছড়ানোর কারণেই তার গতি প্রকৃতি, সার্বজনীনতা, অসম্প্রদায়িকতা, জন মিলন ইত্যদি দিকগুলো হারাচ্ছে। যার ফলে শুধু চেতনাগত বিষয়ই না, মানুষের মাঝে চিত্তবিনোদনের একটি বিরাট হাতিয়ারও হারাচ্ছে। বিষয়টি ভাবা দরকার।