ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

“ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা, সব শিশুরই অন্তরে”। আমরা আমাদের শিশুদের এমনভাবেই গড়তে চাই সে যেন সুশিক্ষিত, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষ হিসেবে গড়ে উঠে। এমন কল্পনা সকল পিতা-মাতাই করে থাকে, শিশুকে গড়ে তোলার জন্য প্রতিটি পিতা-মাতা অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাদের সকল শক্তি ক্ষয় করে সন্তানকে গড়ে তুলবার চরম ত্যাগটা করে থাকেন।

কিন্তু আজ আমাদের শিশুরা ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে বেড়ে উঠছে, শরীরের পুষ্টি ঠিক থাকছে না। নানান ধরনের রোগে আক্রান্ত, ঠান্ডা কাঁশি, এলার্জি, মুটিয়ে যাওয়া, থাইরয়েড সমস্যা, হরমোন জনিত সমস্যা, চোখের সমস্যা, হজমে সমস্যা, খাওয়ায় অনীহা, শ্বাস-প্রশ্বাসে ত্রুটি ইত্যাদি রোগগুলোর সাথে বেড়ে উঠছে আমাদের সন্তানরা। এই শিশুদের নিয়েই আমরা স্বপ্ন দেখি যে, তার অন্তরে পিতা ঘুমিয়ে আছে। এই ভগ্ন দেহের শিশুরা কতটা সাবলীলভাবে তার এই দেহ টেনে নিবে? অসুস্থতা মন মনন বিকাশের অন্তরায় একথা কেউ অস্বীকার করবে না। কেন ঘটছে এমনটি?

প্রথম কারণ হচ্ছে শিশুর খাদ্যভাস। আজ আমরা আমাদের শিশুদের যা খাওয়াচ্ছি তা কতটা মানুষ্য খাদ্য হিসেবে গ্রহণীয় তাই বিরাট প্রশ্ন। আমাদের শিশুদের কি খাওয়াচ্ছি?

১. দুধ- শতকরা ৯০ % ভেজাল (বেশি দুধ দেওয়ার জন্য গরুকে নানান ঔষধ খাওয়ানো হয়) যা বিষ।

২. চাল (পলিশ করা)- চালের যত ধরনের মিনারেল আছে তা থাকে চালের আবরণের উপর অথচ তা ফেলে দিয়ে শুধু শর্করা রেখে শিশুর হজম প্রক্রিয়াকে চিরতরে নষ্ট করা হচ্ছে।

৩.আটা বা ময়দা- চালের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে গমের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে এতে গ্লুটেন শিশুকে মোটা করে দেওয়ার কাজ করে।

৪. ফল- দেশের ফলের মধ্যে জন্ম থেকে বেড়ে উঠা পর্যন্ত রাসায়নিক ব্যবহার স্তরে স্তরে যার দরুণ ফল বিষময়।

৫. মাছ- বেশি দিন তাজা রাখার জন্য মাত্রারিক্ত রাসায়নিক দেওয়ার ফলে মাছ আর খাদ্য হিসেবে নাই, মাসের মাস মাছ পঁচেনা, বাজারের মাছে মাছি বসেনা (মাছিও সেই মাছ ধরে না)

৬. মুরগীর মাংস- শিশুদের প্রিয় খাবার। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে মুরগি বেড়ে উঠলে ফার্ম ওয়ালাদের লাভ হয় না বলেই তারা বলে থাকে। তাই তারা নানান হরমোন দিয়ে অতিদ্রুত বৃদ্ধির জন্য রাসায়নিক দিয়ে বড় করে যা সরাসরি বিষ!

৭. চকলেট, চিপস, বিস্কুট, ফাস্টফুড, রং মিশ্রিত নানান খাবার- শিশুর স্বাস্থ্য গড়তে দেয়না এই খাবারগুলো, যা শিশুদের খাদ্যের মাইক্রোচক্রকে দুর্বল করে দেয়।

cwch 115

শিশুর পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্য একে অপরের পরিপূরক। পুষ্টিতে আমরা উন্নতির দিকে যাচ্ছি অথচ অধিক পুষ্টি ও অপুষ্টি দুটোই ক্ষতিকর। আমাদের মধ্যে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে দ্রুত ফাস্টফুড কালচার গড়ে উঠেছে। আমরা জানি ফাস্টফুড শরীরের জন্য ক্ষতিকর কিন্তু তার পরও দিনের পর দিন এটি খাচ্ছি। শহর-গ্রামের স্কুলের গেটে অনিরাপদ খাদ্যের সমারোহ থাকে। এসব খাদ্য খোলা থাকে। খাবারে ধুলাবালি পড়ে এবং মাছিসহ নানা ধরনের জীবাণুর সংমিশ্রণ ঘটে এসব খাবারের সঙ্গে। দুঃখজনক হলেও সত্য, শিশুদের কাছে এটি প্রিয় খাবার। কোন ধরণের উদ্যোগ গ্রহন করা হয়না যে, এই খাবারগুলো একটু শিশুদের জন্য খাদ্যপযোগী করে পরিবেশন করতে। অথচ এই খাবার খেয়ে শিশুর পেটের সমস্যা, মাথা ব্যথা, ঘুমের সমস্যা, খাদ্যে অরুচি, লেখাপড়া মনোযোগ কম, খেলাধুলায় অনিহা, হিংস্র প্রকৃতি, মিথ্যা বলার প্রবণতা, হিংসা মনোবৃত্তি, অর্ধয্য এবং অকাল যৌনকাংখার মত জটিল সমস্যায় ভুগছে।

আমাদের শিশুদের যে স্বাস্থ্যহানী ঘটছে তা যদি এখনই খেয়াল না করি তাতে বেশিদিন দূরে নয় আমাদের বাসাবাড়িগুলো হাসপাতালে রুপান্তর হয়ে যাবে। শিশুকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত কল্পে সরকারের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। আমরা দেখেছি একজন রোকন উদ দৌলাই দেশের সকল দই সাদা (রং ব্যতীত) করে ফেলেছিল। আজ আমরা দেখছি আমাদের পাশের দেশের তিনটি রাজ্যে স্কুলের ২০০ মিটারের মধ্যে ফাস্টফুড বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। এখই দরকার উদ্যোগ, শুধু কথা কিংবা সেমিনার শিম্পেজিয়াম দিয়ে কোন কাজ হবে না প্রয়োজন উদ্যোগ।

নিরাপদ খাদ্য নিয়ে সরকারের সদিচ্ছার চরম অভাব রয়েছে, তাই আমাদের সন্তানের জন্য আমাদেরই সচেতন হতে হবে। শিশুর পুষ্টির চাহিদা এবং ভেজালমুক্ত খাবারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। এখনকার মা-বাবাদের প্রধানতম চাহিদা হচ্ছে শিশুর লেখাপড়া। এটি ভুল চিন্তা। প্রথমে শিশুর সুস্বাস্থ্য, দ্বিতীয় চিত্তবিনোদন তৃতীয় লেখাপড়া। এই বিষয়টি মেনে নিলে আগামীতে আমরা একটি সুস্থ জাতি পাবো, নয়তো চরম ক্ষতির মাশুল দিতে হবে যার প্রস্তুতি আমাদের নেই।