ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

গেল শুক্রবার এক অবিশ্বাস্য বিজয়ের বিস্ময়কর স্মৃতির ভাগিদার হলো বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা। এ যেন খেলা নয়, কোন চতুর ম্যাজিশিয়ানের সে এক ম্যাজিকের ভেল্কি। যে ম্যাজিক মুহূর্তে হাসি এনে দেয় কোটি জনতার অভিমানি মুখে। হ্যা, অভিমান!

তারাবির নামাজ পড়েই নেট অন করে ক্রিকবাজে ঢু মারি। স্কোর দেখেই কপালে ভাজ পড়ে যায়, ১১ ওভার, ২৮ রান, ৩ উইকেট (১২ রানের ভেতরেই তিন উইকেট পড়ে গিয়েছিল)। গোল হয়ে দাড়িয়ে আছি সবাই। আমি একটু বড়বড় করে স্কোর পড়ছিলাম পাশে দাড়িয়ে থাকা এক বন্ধু স্কোর শোনে বলল “ধূর বেটা মুডটাউ নষ্ট অইগেল, মনেমনে খইছলাম নামাজ ফড়িয়া খেলাটা দেখমু, আর দেখতায় কিতা এখেবারে গাঁউত।”  তার কথায় সায় দিয়ে বললাম “অয়রে”। তখন ক্রিজে সাকিব আর মুশফিক। একজন পাশ থেকে বলল “ভরসা এখনো আছে” তাঁর কথায় তেমন একটা সায় দিতে পারলামনা, তবু মুখ ফসকে হাল্কা করে বেরিয়ে গেল “অয় কোনতা এখটা অইলেও অইতো ফারে”!

1db89e850789c9390d5ee032700dfdbb-593bb4d21929d

“গপ্পার স্টোরে” বিকেলে ছিল আর্জেন্টিনা ব্রাজিল দর্শকদের চাপা উত্তেজনা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই সে উত্তেজনায় ভাটা পড়ে গেছে, কারণ আজ যে বাংলাদেশের খেলা। স্কোর দেখে অনেকটা মনমরা হয়েই দোকানের দিকে পা বাড়াই। ক্রিকেট কিংবা ফুটবলের উত্তেজনাকর কোন ম্যাচ হলেই আমাদের গ্রামের “গপ্পার স্টোর” নামের এ দোকানে, সব বয়সী দর্শকদের সরব উপস্থিতি থাকে চোখে পড়ার মতো। দোকানে গিয়ে দেখি বিকেলের সে উত্তেজনা এক চূড়ান্ত ভালোবাসার কাছে হেরে গিয়ে প্রবল স্নায়ুচাপে রূপ নিয়েছে। আত্মবিশ্বাসী দর্শকরা তখনও ক্রিজে থাকা সাকিব মুশফিকের দিকে এক বুক আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। কিন্তু বোল্ড! শেষ ভরসা মুশিফক বোল্ড হওয়ার সাথে সাথে দর্শকদের সব আশাও যেন বোল্ডআউট হয়ে যায়, ৩৪ বলে ১৪ রান করে মুশফিক সাজঘরে।

বলের সাথে রানের তারতম্য দেখে মনে হয় মাঠের মাঝে কামড় মেরে এক কঠিন বাঁচার লড়াই করছিলেন এতোক্ষণ, তবে রক্ষা আর হলোনা। স্কোর বোর্ডে তখন ৩৩ রান ৪ উইকেট। নিরাশ দর্শকরা অনেকটাই এলোমেলো। একজন মাঝবয়সী দর্শক বলে উঠলেন ‘আর খেলা দেকিয়া কিতা অইতো? অবা খবরউবর দেওরেবা দুনিয়াদারির খবর লই।’ কেউ খবর দেখায় ব্যাস্ত, কেউবা ফেইসবুকিংয়ে, কেউকেউ আবার বাড়ি চলে যাচ্ছে। খবরের ভেতরও খেলার খবর ‘খবরে বলা হচ্ছে চাপের মুখে বাংলাদেশ।’ একজন অনেকটা বিরক্ত হয়েই বললেন ‘ইকান আবার খবরো খওয়া লাগেনি!’ অর্থাৎ বাংলাদেশের সম্ভাব্য নিশ্চিত পরাজয়ের চিন্তায় দর্শকদের মনে যেন চাপা অভিমান ভর করেছে। নিউজিল্যান্ডের ২৬৫ রান।  টাইগারদের জন্য একেবারে মামুলী টার্গেট। তবু কেন লড়াই জমছেনা? কোন হতাশা ছুয়ে গেল টাইগারদের? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে দর্শকদের মাথায়।

781080fa9a9738fec14583e1a690b986-593b87469a202

বারবার চ্যানেল পাল্টাচ্ছে একজন, হঠাৎ আটকে গিয়ে সে পিছেন থাকায়, অন্যান্যরাও পিছনে থাকায়। পেছনের সারিতে বসা দু-ই তিনজন খুব তর্ক করছে। তর্ক হচ্ছে বাংলাদেশ নিয়ে। মাহমুদউল্লাহ তখন ক্রিজে। একজন বলছে মাহমুদউল্লাহ টিকে থাকলে বাংলাদেশ জিতবে। সাথে সাথে আরেকজন বলে উঠে সাকিব মাহমুদউল্লাহার জুটিই বাংলাদেশকে জিতাবে। একজন ঠোঁট বাকিয়ে বলে, ‘এটা কল্পনা, নেহাতই কল্পনা।’ তাঁর কথা আটকিয়ে আরেকজন বলে ‘তবে বাজি লাগাও।’ কিন্তু সে বাংলাদেশের বিপক্ষে বাজি ধরতে রাজি নয়। তবু তুমুল তর্কাতর্কিতে একধরনের বাজি হয়েই গেল। বাজিটা হলো খাওয়ার বাজি। অর্থাৎ এখনি সবাই মিলে খেয়ে নেবে, আর যে হারবে সে বিল দেবে। বাজি ফাইনাল। একজন বলে উঠলো ‘খেলার চ্যানেলো দেও, বাংলাদেশ জিতবো।’ সবার মনোযোগ আবারও খেলার দিকে,  দুই অলরাউন্ডারের ম্যাজিক দেখতে সবাই যেন উদগ্রীব।

মাহমুদউল্লাহ খেলছেনতো খেলছেন হঠাৎ একটু এগিয়ে গিয়ে সর্ট, বল হাওয়ায় ভেসে বাউন্ডারি লাইনে। একসাথে সবাই চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে। সিক্স। যে নিউজিল্যান্ডের হয়ে বাজি ধরেছিল সেও লাফিয়ে ওঠে উল্লাসে, হোকনা বাজির পরাজয় তবু জিতে যাক বাংলাদেশ। পরের বল ফোর। হাত খোলে খেলছেন সাকিবও। রানের সংখ্যা হুহু করে বাড়ছে, এ যেন কোন তপ্ত মরুর দেশে হঠাৎ করে বৃষ্টিঝড়ে বন্যা হওয়ার মতো।

স্কোরবোর্ড তখন পুরোপুরি বাংলাদেশের দখলে। ২১৫ রান ৪২ অভার, মাঠে তখনও আলো ছড়াচ্ছেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান আর মি. সাইলেন্ট কিলার খ্যাত অলরাউন্ডার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। খেলার প্রায় শেষ প্রান্তে এসে বোল্টের বলে সাকিব বোল্ড হলেও দর্শকরা তখন ‘নো টেনশন ডু ফুর্তি’ মেজাজে খেলা উপভোগ করছেন, কারণ ধুমধারাক্কা সেঞ্চুরি দিয়ে মূলকাজ ততক্ষণে সেরে ফেলেছেন এ অলরাউন্ডার। শুধু নিজের সেঞ্চুরিই নয় মাহমুদউল্লাহ-সাকিব সৃষ্টি করলনে বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে ২২৪ রানের এক ঐতিহাসিক রেকর্ড জুটি। এরই সাথে ভাঙলেন পাকিস্তানরে বিপক্ষে তামিম-মুশফিকের করা ১৭৮ রানের সর্বশেষ সেরা জুটির রেকর্ড।

রেকর্ড বক্সে ইতোপূর্বে পুরোনো হয়ে গেছে কেনিয়ার বিপক্ষে রাজিন-হাবিবুলের ১৭৫, ওয়েস্টইন্ডিজের বিপক্ষে এনামুল-মুশফিকের ১৭৪ এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শাহরিয়ার-মেহরাবের করা ১৭০ রানেরর জুটি গুলো। আর আজকের জুটির রেকর্ডে টিম বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে বিজয়ের বন্দরে। যারা অভিমানে চলে গিয়েছেলন তাঁরাও এক বিস্ময়কর ঐতিহাসিক জয়ের চির সাক্ষী হতে দৌড়ে আসেন গপ্পার স্টোরে। সব বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে, বিকেলের ফুটবল উত্তেজনাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে সবাই যেনে এক জাদুর কাটির ছোয়ায় একজোট হয়ে টিম বাংলাদেশের জয়উল্লাসের প্রস্তুতি নিতে থাকে।

কিছু পূর্বেও যে ফেইসবুক টাইমলাইন ছিল আর্জেন্টিনা ব্রাজিল দর্শকদের খোঁচাখোঁচি স্টেটাসে ভরপুর। সেখানেও যায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। পুরো টাইমলাইন তখন বাংলাদেশময়। যে আশার কলসিতে ছিলনা এক ফোটা জল, সেখানে যেনো খুশির জল উপচে পড়তে শুরু করলো। পড়বে নাইবা কেন একেতো ডবল সেঞ্চুরির উষ্ণ স্বাদ, তার উপরে অবিশ্বাস্য বিস্ময়কর জয়েরর উন্মাদনা আর আত্মবিশ্বাসের চোখরাঙ্গানি। এ যেন থ্রিপল আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাওয়া দর্শকদের আবেগের জয়।

bdadcf8589b2e03d570dd2af79b0c1c6-593bb44d0a42e

খেলা শেষ তবু যেন শেষ হচ্ছিল না হিসাব, কারণ মূল হিসাব মিলাতে তখনও অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডের ম্যাচেই দিতে হয়েছিল দৃষ্টি। সেখানেই ছিল বাংলাদেশের ভাগ্যের ফয়সালা। অস্ট্রেলীয়া হেরে গেলেই বাংলাদেশ সেমিফাইনালে। হিসেব যখন এই তখন ব্রিটিশরা পেয়ে গেলো ১৬ কোটি বাধ্যগত সাপোর্টার। সেমি ফাইনালের স্বপ্নে বিভোর তখন পুরো জাতি। যা করার তা আগেরদিনই করে ফেলেছিল বাংলাদেশ। এখন কেবল ভাগ্যের মারপ্যাঁচেই ভর করে থাকতে হয়েছিল টিম বাংলাদেশকে।

তবে এবাবের আইসিসি চ্যাম্পিয়ান ট্রফির ভাগ্য যেন বাংলাদেশেরই পক্ষে। না হলে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচে বাংলাদেশের বাড়ি ফেরার টিকেটতো ছিল প্রায় প্রস্তুত, কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি এসে পরম ভালবাসায় যেন আটকে দিল বাংলাদেশকে। বৃষ্টিভেজা ম্যাচে প্রাণ সঞ্চার হলো বাংলাদেশের। আর গতকালকে অস্ট্রেলীয়া ইংল্যান্ড ম্যাচেতো বাংলাদেশের ভাগ্যভেল্কি দেখলো গোটা বিশ্ব। কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাকিব-মাহমুদউল্লাহ যে কাজটা করেছিলেন, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যেন সেটিই করে দেখালেন এউইন মরগান-বেন স্টোকস। সাথে ছিল সেই বৃষ্টির আশির্বাদ। ব্রিটিশ জয়েই তখন উচ্ছ্বসিত কোটি বাঙ্গালীর প্রাণ। কেননা এ জয় যে ব্রিটিশদের একার নয় হিসেবের মারপ্যাঁচে এ জয় বাংলাদেশেরও। কারণ এ জয়েই বাংলাদেশ ছোঁয়ে ফেলেছে আরো একটি ইতিহাসের মাইলফলক। স্বপ্নের সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে টাইগাররা। অবশ্য সেমিফাইনালে পৌঁছার আগেই ম্যাশবাহিনীর ম্যাজিক ভেল্কিতে এমনিতেই তাঁদের উপর কৃতজ্ঞ হয়েছিল গোটা জাতি। তবে সুযোগ যখন হাতের মুঠোয় তখনতো সবাই চাতকের দৃষ্টিতে চেয়ে থাকবে ফাইনালের দরজায় দাড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের দিকে, আর এটাই স্বাভাবিক।

শুধুতো এক পা, হ্যাঁ এক পা। অর্থাৎ আর মাত্র একটা জয় পেলেই যা ঘটবে তাঁর খুশিতে যে কেউ কেঁদে ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। আর দুইটা জয়ের আশা নিয়ে না হয় আরো একটি বিস্ময়কর স্মৃতির সাক্ষী হতে স্বপ্নের জাল বুনুক কোটি ভক্তের আবেগী প্রাণ। কারণ বাঙ্গালী যতোটানা অকুতোভয় তারচেয়ে বেশী আবেগ প্রবন। তাইতো বাঙ্গালী বারবার খুশিতে কাঁদতে চায়। বারবার দেখতে চায় ম্যাশবাহিনীর ম্যাজিক ভেল্কি। আর বলতে চায় লাগ ভেল্কি লাগ বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলতে আশা সবক’টি টিমের চোখেমুখে লাগ।