ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

stock-vector-anti-corruption-concept-hand-giving-money-bills-to-another-hand-through-a-handshake-with-377082133

বিষবৃক্ষ বিস্তার রোধ করতে, বিষবৃক্ষ কর্তনের চেয়ে উৎপাটন করা জরুরি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল বন্ধ করতে কোন সরকারই কঠোর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় আজকে বাংলাদেশ জঙ্গী রাষ্ট্রে পরিণত হতে চলেছে জঙ্গী প্রতিরোধ করতে বর্তমান সরকার সহ কোন সরকারই সফল না হলেও, কয়েকদিন আগে কওমী মাদ্রাসা সম্পর্কে সরকারের ভূমিকা একটা আশার সঞ্চার করছে হয়ত অনেকেই আমার যুক্তি বা মতামতের সাথে একমত হবেন না, তারপরেও বলবো, এটা একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ তবে, আমি কোন অবস্থাতেই এসব ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অবস্থান করছিনা

২০০৩ সালে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে মোট ৩৫ টি কওমী মাদ্রাসা ছিল। ২০০৪ সালে সারা জেলায় নতুন করে আরও ২০ টি কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়ে ৫৫ টি হয়। তবে, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সরকারের জেলা, উপজেলা এমনকি কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কোনও বিভাগের কাছে, এমনকি প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সহ মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের কাছেও এসব কওমী মাদ্রাসা সম্পর্কে কোন তথ্য উপাত্ত ছিলনা বা এখনও নাই। সারা দেশের চিত্র এই জেলার মতই।    

স্থানীয় পর্যায়ের কওমী মাদ্রাসা থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পরে, এসব শিক্ষার্থী দেশের মূল ধারার কোনও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ ছিল না বা আজও নাই। কওমী মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণে থাকা ঢাকার যাত্রাবাড়ি, রাজশাহী চট্রগ্রামে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসা, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব শিক্ষার্থীরা (তাদের দাবি অনুযায়ি) মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্জন করে, যা আজও বিদ্যমান। যেহেতু, কওমী মাদ্রাসার প্রতি বাংলাদেশ সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক কোন স্বীকৃতি নাই, তাই এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে আসা শিক্ষার্থীদের সনদের কোন মূল্য বাংলাদেশের কাছে নাই বা ছিল না। কারণে, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে আসার পরে শিক্ষার্থীরা সরকারের মূলধারার সাথে কখনও সম্পৃক্ত হতে পারেনি। পাশ করা শিক্ষার্থীরা, তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে / জন মিলে দেশের কোথাও না কোথাও একই আদলে আর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে। আর এভাবেই জ্যামিতিক হারে সারা দেশের আনাচে কানাচে হাজার হাজার কওমী মাদ্রাসা বিস্তার লাভ করেছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ব্যাঙের ছাতার মত এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তারপরের অবস্থা সবার জানা। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জঙ্গী সম্পৃক্তা থেকে শুরু করে সকল নাশকতা কাজের সাথে জড়িত হবার ঘটনা নতুন নয়

এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কারণে, ইতোমধ্যে দেশের অনেক ক্ষতি হয়ে গেলেও, সরকারের সম্প্রতি যে ঘোষণা তা অনেকখানি ইতিবাচক বলে আশা করা যায়। যদিও একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা কোন জাতিকে কখনও প্রগতিশীল কোন ভূমিকায় নিয়ে যেতে পারেনা, তারপরেও সরকারের সম্প্রতি স্বীকৃতির ফলে এজাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিস্তারের ক্ষেত্রে একটা লাগাম টানা হলো বলে মনে করা যেতে পারে

বিষয়টি যদিও বিতর্কিত, তারপরেও এটা বলা যেতেই পারে যে, সরকারের হস্তক্ষেপের ফলে এখন অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতও নতুন কওমী মাদ্রাসা গড়তে হলে সরকারের একাডেমিক স্বীকৃতির প্রয়োজন হবে, পাঠ্য পুস্তকের ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই সরকারের শিক্ষা নীতিমালার একটা ভূমিকা থাকবে। অর্থাৎ, পূর্বে কওমী মাদ্রাসা তাদের নিজস্ব মতবাদ অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার ফলে দেশের মূলধারার শিক্ষার বিপরীতে আর একটি ভিন্ন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার যে প্রসার ঘটেছে, তা কিছুটা হলেও রোধ করা যাবে। যদিও এটা না বললেই নয় যে, ইতোমধ্যে কওমী মাদ্রাসার এতটাই প্রসার ঘটেছে, যা বাংলাদেশকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ভোগান্তিতে ফেলবে 

সরকারের সম্প্রতি ভূমিকার কারণে কওমী মাদ্রাসা যারা পরিচালনা করে আসছেন, তাদের বিজয় হয়েছে বলে আখ্যা দিতেই পারেন। সরকারের ভূমিকায় তারা অনেকটা বিজয় অর্জন করলো, কথার সাথে কোন অবস্থাতেই দ্বিমত পোষণ না করলেও, এই বলে আশাবাদী হওয়া যায় যে, সরকারের আগামী ভূমিকা বা কৌশলে বা নীতিমালার কারণে নতুন আর একটি দিক উন্মোচিত হবে। বিষয়টি যদি এমন ভাবা হয় যে, একটি সমুদ্র থেকে একফোটা জল তুলে এনে সরকার ক্ষরা রোধে কাজ করার কৌশল গ্রহণ করলো। এমন উদ্যোগ বা ভূমিকাকে সরকারের অনেক কৌশলী ইতিবাচক ধরে নিয়ে, এটা বলা যেতেই পারে যে, একটা বিবর্তনের যাত্রা শুরু হলো। মূল কথা হলো যেভাবেই হউক, একটা শুরু তো হলো

প্রারম্ভে যা লিখেছিলাম, ২০০৩ সালে এরকম মসজিদ মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল ৩৫ টি যা ২০০৪ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৫৫ টিতে পরিণত হয়। বর্তমানে এই জেলাটিতে কওমী মাদ্রাসার সংখ্যা শতাধিক এবং একই আদলের মসজিদের সংখ্যা অগনিত

২০০৫ সালের জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসের একটি অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রিভাইভ্যাল অব ইসলামিক হ্যারিটেজ সোসাইটি (আরআইএইচএস) ঠাকুরগাও সহ দেশের অন্যান্য জেলায় মোট ৭৬ টি মাদ্রাসা পরিচালনা করে আসছিল। এদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই কওমী মাদ্রাসার পুস্তক নীতিমালা অনুসরণ করতো। ২০০৫ সালে সারা দেশে বোমা হামলার পরে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জঙ্গী সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে। তৎকালীন প্রশাসনের কিছু ভূমিকার ফলে সংস্থাটি কৌশল অবলম্বন করে দেশের ৭৬টি কওমী মাদ্রাসার নামের পরিবর্তন এনে কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে

২০০৪২০০৫ সালে এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন চিঠিপত্র, তাদের নিজস্ব নিউজলেটার, ইসলামী মতবাদে বিশ্বাসী আত্তাহরিক পত্রিকার কয়েকটি সংস্করণ ঘেঁটে দেখা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের শিক্ষক . আসাদুল্লাহ আল গালিব, জেএমবি শীর্ষ নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আব্দুল আওয়াল, আতাউর রহমান সানি সহ তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকারের কয়েকজন সংসদ সদস্য মন্ত্রী আরআইএইচএস নামক সংস্থাটি ছাড়াও আল রাবেতা, তৌহিদি জনতা, জেএমজি নামক সংস্থার কার্যক্রমের সাথে জড়িত ছিলেন

মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক আরআইএইচএস এর দাওয়া বিভাগের প্রধান হিসেবে মদিনায় নিযুক্ত ছিলেন দুই সহোদোর ঠাকুরগাঁওয়ের আকতারুজ্জামান কামরুজ্জামান। বাংলাদেশে আরআইএইচএস এর আর্থিক পরিচালনার দিকটি পরিচালনা করতেন তাদের আর এক সহোদোর মোজাম্মেল হক। জঙ্গী সম্পৃক্ততার কারণে বাংলাদেশে আরআইএইচএস সহ এসব প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন ভাতা আরআইএইচএস নামক সংস্থাটি দিয়ে আসছিল। সরকারের নিষেধাজ্ঞার পরে আরআইএইচএস এর কার্যক্রম বন্ধ হলেও কওমী মাদ্রাসার অধীনে স্থানীয়ভাবে পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে কওমী মাদ্রাসার মূল নীতিমালার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নাম পরিবর্তন করে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলমান রয়েছে 

আরআইএইচএস এর পরিচালনার সাথে জড়িত ছিলেন, এমন কয়েকজনের মধ্যে, ২০০৩ সালে রাঙামাটিতে বোমা বিস্ফোরনে নিহত জন, দিনাজপুরের বড় গুড়গোলায় বোমা বিস্ফোরনে নিহত একজন জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে থানা লুটের ঘটনার অন্যতম একজন আসামীও ছিলেন

এসব সংস্থা এবং কিছু আলোচিত জঙ্গীর উদাহরণ টানলাম এই কারণে যে, শীর্ষ আলোচিত এসব জঙ্গীরা এই কওমী মাদ্রাসা থেকেই তাদের জঙ্গী সদস্য নেতা তৈরী করে আসছিল। সর্বশেষ ঢাকায় হেফাজত ইসলামের তান্ডব বাংলাদেশের মানুষকে তো বটেই বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলেছে

 এই তান্ডব রুখতে মতিঝিলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর রায়টস হেফাজত ইসলামের সমাপ্তি ঘটাতে পারেনি। যদিও বিষয়টি অমানবিক শোনায়, তারপরেও বলতে হয় যে, হেফাজতে ইসলামের সাথে জঙ্গী সম্পৃক্ততার অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও এদের সমূলে উৎপাটন করা যায়নি। বরং এই হেফাজতে ইসলাম বিভিন্ন কৌশলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল, যা আজও বিদ্যমান

 জঙ্গীবাদের উত্থান, বিস্তার কার্যক্রম বন্ধ করার ক্ষেত্রে সরকারের সামনে দুটি পথই খোলা রয়েছে। একটি হল, এই কার্যক্রমের সাথে জড়িতদের সমূলে হত্যা করে দেশ থেকে এদের নাম নিশানা মুছে দেওয়া, আর অন্যটি হলো, সরকারের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা

সমূলে হত্যা করতে হলে, কয়েক লাখ মানুষকে হত্যা করার কোন বিকল্প ছিলনা বা নাই, যা নিঃসন্দেহে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হবে। আমরা সবাই জানি যে, মাথা ব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যাবেনা। ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে

আপাতদৃষ্টিতে, সরকারের ভূমিকায় এই হেফাজতে ইসলাম তথা কওমী মাদ্রাসা সম্পৃক্তরা ভাবতেই পারেন যে, তাদের বিজয় হয়েছে। তাদের এমন ভাবনার সাথে আমিও একমত যে, সরকারের ভূমিকায় হেফাজতীদের বিজয় হয়েছে। তবে, এটাও একটা ভাবনার বিষয় যে, ভবিষ্যতে বংশ বিস্তারের ক্ষেত্রে এরা সরকারের নীতিমালায় কতটুকু সায় দিবে, অথবা সরকার কৌশলের ক্ষেত্রে সামান্য একটু ভুলের কারণে অনেক চড়া মূল্য দিতে হবে

রাজনীতির অপকৌশলে ইতোমধ্যে এরা যেভাবে বংশ বিস্তার করেছে, তা সামাল দিতেই হয়তো আমাদের অনেক মূল্য দিতে হবে। এমতাবস্থায়, সরকারের এই ভূমিকার কারণে নতুন আর একটি বিবর্তনের প্রত্যাশা করা ছাড়া আর কি পথ থাকতে পারে?