ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

নাট্যজগতের কলাকুশলীরা সবাই মাঠে নেমেছেন তাদের অধিকার আদায়ে। যে কোন কিছুই একটা সিস্টেমে চলা উচিত। টেলিভিশন মিডিয়ার ক্ষেত্রেও তেমনটাই প্রযোজ্য। ন্যায্য দাবী আদায়ে অান্দোলনের অধিকার প্রত্যেকের আছে। উনাদের মনে হয়েছে আন্দোলনের প্রয়োজন আছে, তাই আন্দোলন হচ্ছে।

ধরুন আপনি একজন ভালো ছাত্র। কিন্তু ক্লাসে আপনার সাথে প্রতিযোগিতায় নামার মতো কোন স্টুডেন্ট নেই। সেখানে আপনার ভালোত্বের মূল্যায়নটা কি করে হবে? আপনার প্রোগ্রেসটা কোন মাপকাঠিতে মাপা হবে সেখানে? গ্লোবালাইজেশনের কথা বলে আমরা যখন নিজেদের প্রতিভাকে জাহির করতে চাইছি, তখন বিশ্ব বাজারের প্রতিযোগিতাকে আমরা অস্বীকার করবো কি করে? নিজেকে প্রমাণ করতে হলে প্রতিযোগিতায় তো নামতে হবে, তাইনা? তাহলে কিসের ভয়ে প্রতিযোগিতার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া?

বাংলাদেশে সম্ভবত ২৮ টির মতো টিভি চ্যানেল আছে। সব চ্যানেল মিলিয়ে ধরলাম ২০টা বিদেশি সিরিয়াল প্রচার করা হচ্ছে। সেটাতো মোট সম্প্রচার সময়ের হিসাবে ১ শতাংশও হয় না। তারপরও কি করে এটা টেলিভিশন কলাকুশলীদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বিষয়টি মোটেও বোধগম্য নয়! তাছাড়া সুলতান সুলেমান তো সেদিন শুরু হয়েছে। কিন্তু দর্শকরা তো তার অনেক আগে থেকেই টেলিভিশনে নিয়ম করে নাটক দেখা ছেড়ে দিয়েছে। খামোখা দোষটা শেষবেলায় এসে সুলতান সুলেমানের কাঁধে কেন পড়লো সেটাও এক রহস্যের বিষয়! 🙂

বিদেশি চ্যানেলে দেশীয় বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে হবে। কিন্তু কেন? কোটি কোটি টাকা খরচ করে কোম্পানীগুলো ক্রেতা ধরতে বিজ্ঞাপন তৈরি ও প্রচার করে। অথচ যে চ্যানেলগুলোকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে আমি বিজ্ঞাপন দিচ্ছি সেগুলোর দর্শক নেই বললেই চলে। কোম্পানী হিসাবে আমার তো সেই চ্যানেলেই বিজ্ঞাপন চালানো উচিত যা ক্রেতার চোখে পড়বে। কোম্পানী সেই চ্যানেলে বিজ্ঞাপন কেন দেবেন যেই চ্যানেল দর্শক মান সম্মত অনুষ্ঠানের অভাব আর বিজ্ঞাপনের অত্যাচারে দেখেই না! তাও যদি সব কোম্পানীগুলো ভারতীয় চ্যানেলে ঢালাও ভাবে বিজ্ঞাপন দিত সেও এক কথা ছিল। শুধু এক প্রাণ কোম্পানীর অ্যাডই তো দেখা যায়। এই টাকা টুকু হাত ছাড়া হওয়াতেই এত শোরগোল? একটা কোম্পানী তার ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে যেকোন জায়গায় বিজ্ঞাপন দিতে পারে। সেখানে আমি বা আপনি কোম্পানীকে আটকানোর বা না বলার কে? আর্টিস্টরা যখন বাইরের চ্যানেলে বিজ্ঞাপন চালানো নিয়ে প্রতিবাদ করে তখন বোঝাই যায় এখানে তৃতীয় কোন পক্ষের মদদ, উস্কানী ও স্বার্থ জড়িত আছে।

20170101_020749
দর্শক ভারতীয় চ্যানেল দেখবে, কিন্তু সেটাকে বন্ধ করে দেয়ার দাবি এসেছে। দর্শক কি দেখবে না দেখবে তা নির্ধারণ করে দেয়ার অধিকারতো কারো নেই! বরং সেই সিদ্ধান্তের মালিক দর্শক নিজেই। আপনি আমি জোর করে সেটা আটকাতে পারিনা।

অল্প বয়সী এক নায়িকা অত্যন্ত আটোসাটো খাটো পোশাক পড়ে বয়ফ্রেন্ডের বা বন্ধুদের সাথে ন্যাকামো করছে, হাসির সংলাপ বলে আধপাগল কিছু মানুষ উদ্ভট কর্মকান্ড করছে, আধবুড়ো এক অবিবাহিত ছেলে বিয়ের জন্য হ্যাবলামি ক্যাবলামি করছে, এক মেয়ে ১৪ জন ছেলের সাথে ফ্লার্ট করছে…৯০ শতাংশ নাটক এমন উদ্ভট সব গল্প নিয়ে তৈরি। দর্শক নিজের সময় নষ্ট করে টিভির সামনে বসে এসব কেন দেখবে? রিয়েলিটি শো’ এর নামে বছর বছর গাদা খাদেক স্টার পয়দা করে তাদের নিয়ে নাটক নামের ছেলে খেলা চলছে। গুটি কয়েক গুণী নাট্যকার, ডিরেক্টর ও অভিনয় শিল্পী ছাড়া অধিকাংশ নাটক দেখার অযোগ্য। অথচ নিজেদের দূর্বলতার দিকটা ওনারা ভেবে দেখবেন না।

নাটকের বাজেট নিয়ে কমপ্লেইন সবার। আরে, কোয়ালিটির কথা না ভেবে কোয়ান্টিটি বাড়াতে হলে তো নাটকের বাজেট কমবে, সেটাই স্বাভাবিক! নাটকের বাজেটই নাকি থাকেনা, তাহলে বিদেশে গিয়ে এত নাটকের শুটিং হয় কি করে। বিদেশে গিয়ে নাটকের শুটিং হয় অথচ সেই নাটকের গল্প সাধারণ দর্শকের মাথার কয়েক মাইল উপর দিয়ে চলে যায়। আর সেখানে থাকে কিছু অতি আধুনিক তথাকথিত শিল্পীদের পোশাক আর শরীরের ফ্যাশন শো। একটা রেস্টুরেন্ট, একটা বিচ, একটা হোটেলের লবি আর একটা হোটেলের রুম… ব্যাস! হয়ে গেল নাটক! অথচ বিদেশে যাওয়া আসার প্লেন ভাড়া নষ্ট না করে ওই টাকায় একটা ভালো গল্পের অনেক সুন্দর নাটক দেশে বসেই বানানো যেত!

পুঙ্গা চিপা আলট্রা মর্ডান কাপড় পড়া সোসাইটির আদেখল্লাপণা দেখানো বা গ্রামের মানুষের জীবন যাপনকে অতিরঞ্জিত তামাশা দেখিয়ে শিল্প ও সংস্কৃতির কোনটা রক্ষা হচ্ছে আর কোন সংস্কৃতি ফুটে উঠছে কেউ বলতে পারবে? ভারতীয় চ্যানেলের যে নাটকগুলো মানুষ হুমড়ি খেয়ে দেখে সেসব নাটকই যে অত্যন্ত উচুঁ মানের তা মোটেও নয়। তবে মানুষ তা দেখে ধারাবাহিকতার কারণে, গোছানো নির্মাণের কারণে, প্রেজেন্টেশনের কারণে। ১৫০ টাকার ভাত মাছ মানুষ যে কারণে ভালো রেস্টুরেন্টে গিয়ে ১৫০০ টাকা খরচ করে খায় সেই একই কারণে।

ব্যাঙের ছাতার মতো যেমন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে, বিজ্ঞাপন বেড়েছে তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ডিরেক্টর, প্রোডিউসার আর আর্টিস্টের সংখ্যা। তাদের সবাই স্টার। চ্যানেল অধিক মুনাফার লোভে প্রোগ্রাম এর বদলে কেবল বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে। নির্মাতারা লাভ রেখে স্বল্প বাজেটে কম দামের আর্টিস্ট দিয়ে নাটক বানানো শেষ করছেন। কন্টেট নিয়ে রিসার্সের কোন তাগিদ নেই কারো ভেতর, প্রতিযোগিতার কোন তাগিদ নেই, ডেভেলপমেন্টের কোন তাগিদ নেই, আছে শুধু কেবল অর্থ চিন্তা! আর্টিস্টরা না খেতে পেয়ে মরে যাচ্ছেন? কই, তাদের জমজমাট ফেসবুক, ব্রান্ডেড পোশাকের বাহার, বিদেশ ভ্রমণ আর শপিং এর পোস্ট, দামী গাড়ী তো সে মন্দার চিত্র তুলে ধরে না!

আমার একটা প্রশ্নের উত্তর জানার খুব ইচ্ছা। অভিনয় শিল্পীরা কি কোন ইনকাম ট্যাক্স দেন? ভারতে প্রায় মাঝে মাঝেই তারকাদের ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া সংক্রান্ত ঝামেলায় পড়তে দেখা যায়। আমাদের এখানে তেমন কোন গল্প আজও শুনেছি বলে মনে পড়ে না। তার মানে কি? প্রফেশন হিসাবে যে অর্থ উনারা অভিনয় করে আয় করছেন তার উপর ট্যাক্স প্রযোজ্য নয়? কেন নয় যদি এটাকে সত্যি প্রফেশনই বলা হয়ে থাকে? এদেশে তো শুনি রিকশাওয়ালাদেরও ট্যাক্স দিতে হবে, আর্টিস্টদের বেলায় হিসাবটা ঠিক কেমন হওয়া উচিত তবে?

বিশেষ ক্ষেত্রে অনুমতি ব্যতীত বিদেশী শিল্পীরা এসে এদেশে অভিনয় করুক আর্টিস্টরা তা চান না। মানছি দাবী ঠিক আছে। কিন্তু এখানকার আর্টিস্টদের অনেকেই যে প্রায় ঘটা করে ভারতে গিয়ে ভারতীয় সিরিয়াল আর সিনেমাতে অভিনয় করে আসছে, তাদের বেলায় কোন নিয়ম প্রযোজ্য হবে সেটাও তো দর্শকদের জানার প্রয়োজন আছে, নাকি?

ধরে নিচ্ছি বিদেশী সিরিয়াল প্রচার, ভারতীয় চ্যানেলে দেশীয় বিজ্ঞাপনের জেরে অভিনয় শিল্পীদের রুটি রুজিতে টান পড়েছে। মাসে ক’ টা নাটক, রিয়েলিটি শো বা প্রোগ্রাম থেকে আর্টিস্টদের নিয়মিত ইনকামের পরিমাণ টা আসলে কত যা দ্বারা এত জৌলুসপূর্ণ জীবনযাপন করা সম্ভব হয়? সত্যি যদি আর্টিস্ট পেমেন্ট বা নাটকের বাজেট এত কম হয়ে থাকে তাহলে ফেসবুকে নাটকের নায়ক এবং বিশেষত নায়িকারা ঝলমলে জীবনের যে প্রদর্শনি করে থাকেন, সেই টাকাটা ওনারা ঠিক কোন সোর্স থেকে ইনকাম করেন, বলতে পারেন? নাকি উনারা সবাই ধনী পরিবারের সন্তান? কোনটা?

টেলিভিশন কলা কুশলীদের আন্দোলনে কোন এজেন্ডাতে দর্শকের কথা উল্লেখ নেই। একবারের জন্যেও উনারা নিজেদের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেন নি, মেধা চর্চার বা সৃজনশীলতার ঘাটতির কথা বলেন নি। দর্শকের পছন্দ অপছন্দ কে অগ্রাহ্য করে উনারা একতরফা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর দিকে আঙ্গুল তুলে যাচ্ছেন। আঙ্গুল তুলছেন বিদেশী সিরিয়ালের দিকে, বিদেশী চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচারের দিকে যা অত্যন্ত একপেশে এবং প্রাচীন প্রবাদ নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকার মতো একটি বিষয়। যে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো হওয়ার কারণে প্রোগ্রামের খোরাক জোগাতে আজ এত অভিনয় শিল্পী, এত এত নাট্যকার, ডিরেক্টর আর কলাকুশলী এই প্রফেশনে আসার সুযোগ পেয়েছে, সাহস করেছে, আজ তারাই টেলিভিশন চ্যানেলের দিকে আঙ্গুল তুলছে!

আসলে টেলিভিশন শিল্পের এই দূরাবস্থার জন্য কোন পক্ষ একা দায়ী নয়। দোষ ভাগে জোগে সবার। একটার পরিপ্রেক্ষিতে সময়ের সাথে সাথে আরেকটি ডালপালা মেলেছে। শোধরাতে হলে সবাইকে সম্মিলিত ভাবে শোধরাতে হবে।