ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

আজকাল হুজুররা কোন দাবী-দাওয়া উঠালেই বিশেষ কিছু শ্রেনির মানুষ এমন ভাবে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন যে মনে হয় যেন অচিরেই এদেশে বোরখা পড়া, মসজিদে আযান দেয়া, জামাতে নামায আদায় করা, কোরবানি দেয়া এসব বন্ধের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর অফিস ঘেরাও কর্মসূচি নেয়া হবে । এই বিশেষ শ্রেণির মানুষেরা এদেশে সব ধর্মের অনুভুতির বিষয়ে অত্যন্ত সজাগ, কেবল মুসলিমদের ধর্মানুভুতি ও ইসলামী অনুশাসনের ব্যাপারেই তাদের সব অনীহা! তবে তাদের এই বৈষম্যমূলক মনোভাবের পিছনে উপমহাদেশের ধর্মীয় বিবর্তনের ইতিহাসটার যথেষ্ট ভূমিকা আছে বৈকি।

ইতিহাসে খোঁজ করলে দেখা যায়, অতীতে এ অঞ্চল ছিল হিন্দু প্রধান এবং এ অঞ্চলের অধিকাংশ মুসলিমই ধর্মান্তরিত মুসলিম। ৬-৭ পুরুষের খোঁজ লাগালেই এই সত্যের সত্যতা মিলবে। তাই মুসলিম হলেও আমাদের ভেতরে পূর্ব পুরুষদের প্রতি জেনেটিক টানটা রয়েই গেছে। আর সে কারণেই মুসলিম নেতারা কোন দাবী করে বসলেই বাই ডিফল্ট এরা আক্রমণ করে ওঠে।

এদেশে সব ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির সাথে বাস করে। মুসলিম ধর্মে মূর্তি পুজা, মূর্তি বানানো নিষেধ। কোরআনে বলা আছে। কিছু কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি হই হই করে উঠবে কোথায় বলা আছে কোথায় বলা আছে করে। তাদের বলবো, কুরআন পড়ে দেখেন ঠিক যেভাবে অন্যান্য স্কলারদের বই আগ্রহ করে পড়েন, পেয়ে যাবেন। আপনি বা আপনারা ধর্ম মানতে নাই পারেন, ধর্মীয় অনুশাসন আর আল্লাহর আদেশকে আপনারা অস্বীকার করতেই পারেন কিন্তু যারা তা বিশ্বাস করে, মেনে চলতে চায়, তাদের চাওয়াকে অস্বীকার করার আপনি কে? আপনি আল্লাহর হুকুমকে অস্বীকার করতে পারেন, কিন্তু একজন সাধারণ মুসলিমের ধর্মীয় অনুভূতিকে আপনারা কোনভাবেই অসম্মান করতে পারেন না যেভাবে আপনি পারেন না একজন অমুসলিমকে আঘাত করতে!

ভাই, সাধারণ মানুষ আপনাদের মত ভাস্কর্য আর মূর্তির পার্থক্য বুঝে না। তারা সবাই আপনাদের মত শেকসপিয়ার, মাও সে তুং বা টলস্টয় পড়া নয় কিনা, তাই সবই তাদের কাছে মূর্তি মনে হয়। আর সেই মূর্তিটা দেবী দুর্গারও নয় যে তা সরিয়ে ফেললে। অমুসলিমদের অসম্মান করা হবে। বিতর্ক বা অসহনশীল পরিস্থিতি এড়াতে ভাস্কর্যের থিম বদলে সেখানে নতুন ভাস্কর্য বানানো যেতেই পারে, তাতে আপনাদের অসুবিধা কোথায়? নাকি আমাদের নান্দনিকতা ওই নারী দেবতার অবয়বে এমন ভাবে ক্ষয়ে গেছে যে সেখানে অন্য কোন সৃজনশীল ভাস্কর্য করা সম্ভব নয়?

কৃষ্ণের লীলা নিয়ে আপনাদের কোন বিরোধ নেই। বরং সেই রসে মজে আপনারা রসালো গান বাঁধেন, অথচ মুহাম্মাদ (সাঃ) এর বিবির সংখ্যা নিয়ে আপনাদের আপত্তির শেষ নেই। কনসার্ট এর আওয়াজে বা রাজনৈতিক দলের যাত্রা পালার মতো স্পিস ডেলিভারীতে আপনাদের কান ঝালাপালা হয় না, অথচ ওয়াজ হলে হুজুরের চিল্লানীতে আপনাদের রাতের ঘুম হয় না। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি সভাবেশ করে রাস্তা বন্ধ করে রাখলে আপনারা উচ্চ বাচ্য করেন না, অথচ হুজুররা ইজতেমা বা কোন ধর্মীয় সমাবেশ করলে আপনাদের স্পর্শকাতর জায়গায় জ্বালা ধরে যায়।
স্বপ্ল পোশাক আর অশোভন কার্যকলাপেও আপনারা সংস্কৃতি ও শৈল্পিক রস খুঁজে পান, অথচ বোরখা পড়া মেয়েদের দেখলেই কুপমন্ডুপ বলে গালি দেন।
কেন? সমস্যাটা কোথায়?

একই ভাবে মন্দিরের পুরোহিত বা দেবদাসীদের নিয়ে আপনাদের কোন সমস্যা নেই। এমনকি গির্জার পাদ্রী বা নানদের নিয়েও না। অথচ দাঁড়িওয়ালা টুপি পড়া হুজুর দেখলেই আপনাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনাবাদী সাজা শুরু হয়ে যায়, কেন বলুন তো? পূজার সময় ঢাকের শব্দ আর ধুপের গন্ধে আপনাদের অসুবিধা হয় না, অথচ গরু কোরবানি দিলে আপনার অন্তরাত্মা কেঁদে ফেলে। অবলা পশুর প্রতি অবিচার হচ্ছে বলে আপনারা মনে করেন। ভাবখানা এমন যেন, সারা বছর আসমান থেকে আপনার আমিষের যোগান আসে। রেস্টুরেন্টে বসে যখন খাসির রেজালাতে কবজি ডোবান, আপনার মানবিক মূল্যবোধের পদস্খলন দেখে তখন কসাইখানার গরুগুলোও লজ্জা পেয়ে যায়!

অসাম্প্রদায়িকতা দেখানোর নামে যা করা হচ্ছে, সেটাকে চুলকানি বলে।  আপনারা এই রোগটা মুসলিম এবং অমুসলিমদের ভেতর ছড়িয়ে দিতে চাইছেন।

এদেশটা চেতনাবাদীদের একার না। ৯৫ শতাংশ মানুষ যেই ভাস্কর্যের মানে বুঝে না, সেই ভাস্কর্য সরিয়ে নিলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। এদেশে ১ কোটি যদি আপনাদের মত চেতনাবাদী যদি থেকে থাকেন, তাহলে ১৪ কোটি সাধারণ মুসলিমও এদেশে আছে যারা কোরআন বিশ্বাস করেন। দেশ তাদেরও। তাদের কে আপনারা কুপমন্ডুপ ভাবতেই পারেন। ভাবতেই পারেন আপনারা সভ্য, বাকী অসভ্য, বর্বর। কিন্তু এই অসভ্য মানুষগুলোও এদেশের নাগরিক। আপনাদের মতো তারাও তাদের চাওয়া পাওয়ার দাম পেতে চায়!
দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সামনে কি ধরনের ভাস্কর্য থাকতে পারে, সে ব্যাপারে আপনার মত যেমন আছে, তেমনি তাদেরও মতামত থাকতে পারে। আর যে দেশে আপনারদের মতো প্রগতিশীল চেতনাবাদীদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়, সেখানে অধিকাংশ অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত চেতনাহীন মুসলিম এর মতামতকে গুরুত্ব দিতে দোষ কোথায়?

slide