ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

কণা যা করেছিলেন সেটা আসলেই অভাবনীয়, তাই সেটা পত্রপত্রিকার খবরও নাকি হয়েছিল বছর খানেক আগে। আমি দেখিনি সেদিনকার কণা’র কীর্তি, কিন্তু আজ মিডিয়ায় আসা তাঁর মৃত্যু সংবাদটা চোখে পড়লো। ভীষণ মন খারাপ হলো খবরটা পড়ে – যে এক বছর আগের আলোচিত ঘটনাটা না ঘটলে হয়তো কণা বেঁচে যেতো।

আসুন একটু জেনে নেয়া যাক কণার কথা – মনির ও কণা উভয়ের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মনির কণার সাথে শারীরিক সম্পর্কও করেন। কিন্তু এক পর্যায়ে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান। বিয়ের দাবিতে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর কণা মনি‌রের বাড়িতে অবস্থান নেন। এ নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মাতব্বররা সালিশে বসেন। খবর বের হয় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। ১৫ দিন অবস্থানের পর উভয় পরিবারের সম্মতিতে তাঁদের বিয়ে দেওয়া হয়। বোকা মেয়েটা ওভাবে বিয়ে তো করলো, কিন্তু এই বিয়ে তো কোনোভাবেই সুখী হবার কথা ছিল না; কেন, সেটায় পরে আসছি।

বিয়ের পর দেড় লাখ টাকা ও দেড় ভরি স্বর্ণালঙ্কার যৌতুক নেন মনির। বিয়ের পর থেকে সংসারের নানা বিষয় নিয়ে কনাকে বিভিন্ন সময় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করতেন মনির ও তাঁর মা-বাবা। এ কারণে কনাকে প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গেও কথা বলতে দিতেন না তাঁরা। সাথে সমান তালে ক্রমাগত চলছিল আরও যৌতুকের চাপ। কণার শরীরে নির্যাতনের চিহ্নের কারণে প্রাথমিকভাবে এটাই মনে হয়েছে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন করে করে কণাকে খুন করা হয়েছে। বিস্তারিত খবর পড়ুন – এ রকম বিয়ের পর এমন মৃত্যু!

অনেক কাল আগে টিভিতে বাংলা সিনেমা দেখতাম। মনে পড়ে কিছু সিনেমায় ঠিক এরকম ঘটনা দেখা যেতো। একটা সিনেমার এরকম ঘটনা স্পষ্ট মনে পড়ছে (সম্ভবতঃ আবার তোরা মানুষ হ সিনেমায়)। নায়কের বোনের সাথে প্রেমের সম্পর্ক থাকে এক বখে যাওয়া ছেলের। তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হয় এবং ওই খবরের মতোই ছেলেটি এরপর মেয়েটিকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে। এই দুঃখে মেয়েটি আত্মহত্যা করে। বোনের লাশ দেখে নায়ক ক্রুদ্ধ হয়ে গিয়ে সেই প্রেমিককে খুন করে। এদিকে সেই প্রেমিকের বাবা কিন্তু ভালো মানুষ, ছেলেকে মেরে ফেলা দেখে তিনি প্রথমেই নায়ককে বলে ওঠেন, তার বোনের সাথে তাহলে বিয়ে হবে কী করে? নায়ক জানায়…..

সাধারণ কান্ডজ্ঞান বলে যে মানুষ কারো ভালোবাসায় প্রতারণা করে বিয়ে করতে অস্বীকার করে, তার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়াই উচিৎ নিজ থেকে, এবং কষ্টের সাথে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাসও ফেলার কথা, যে আগে থেকেই ওই প্রতারকের খপ্পর থেকে সে বেঁচে গেল। কিন্তু গার্মেন্টকর্মী কণা রীতিমত অবস্থান ঘর্মঘট করে ওই ছেলেকে বিয়ে করতে চাওয়ার কী কারণ ছিল তাহলে?

কারণটা সম্ভবত বোঝা যাবে, এর চাইতেও ভয়ঙ্কর বিষয়ে আমরা কী করি, সেটা নিয়ে আলোচনা করলে। চোখ-কান খোলা রাখলেই দেখা যাবে আমাদের দেশে কোন নারী ধর্ষিতা হলে অনেক ক্ষেত্রেই (বিশেষতঃ দরিদ্র পরিবারগুলোতে) প্রথমেই চেষ্টা করা হয় ধর্ষকের সাথে বিয়ে দেবার। এই মানসিকতা শুধু দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের মধ্যে যে সেটা না, এটা আমাদের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের কলেজ-ভার্সিটি পাশ দেয়া (‘শিক্ষিত’ শব্দটা ব্যবহার করিনি সচেতনভাবেই – পাশ দেয়া মানে শিক্ষিত না) মানুষের মধ্যেও আছে। আমার এক বন্ধুর কাছে শুনেছি একবার কোন এক সিনেমায় ধর্ষিতাকে ধর্ষকের সাথে বিয়ে দেবার তোড়জোড় দেখে সে যখন এটা নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করে, তখন তারই এক বন্ধু বলে, “ঠিকই তো করছে, মেয়েদের শরীরের একটা দাম আছে না?”

কণাও নিশ্চয়ই ওই উক্তির বক্তব্য জেনেই বড় হয়েছে এই সমাজে। যৌক্তিকভাবেই অনুমান করা যায়, এ কারণেই একজন প্রতারককে চাপ দিয়ে, রীতিমত জোর করে বিয়ে করেছিল। সে নিশ্চয়ই কোনোভাবেই কল্পণাও করেনি, সেদিনই তার মর্মান্তিক মৃত্যুর পথ তৈরি হয়েছিল। মৃত্যু যদি নাও হতো, তবুও কণার সংসার কেমন হতে পারতো সেটা অনুমান করাই যায়।

আমাদের সমাজে প্রাক বিবাহ যৌনতাকে নানা জন নানা দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। আমরা ভালো/খারাপ যে দৃষ্টিতেই দেখি না কেন, এটা বাস্তবতা যে আমাদের সমাজে এটা আছে দীর্ঘদিন থেকে এবং এর পরিমাণ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। কোন মেয়ের জীবনে তেমন কিছু ঘটে থাকলে সেটাকেই কোন পুরুষকে বিয়ের করার একমাত্র কারণ মনে করা বোকামী – মেয়েদের জানা উচিৎ এতে কোনোভাবেই বিন্দুমাত্র কমে না মেয়েদের শরীরের মূল্য। কিন্তু এই বোকামী অনেক মেয়েই করছে – ভুল মানুষ বুঝতে পেরেও তাকে বিয়ে করছে, এমনকি বিয়ে করতে অস্বীকার করা পুরুষকেও বিয়ে করছে চাপ দিয়ে বা আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে। আর এই তথাকথিত শরীরের মূল্য রাখতে গিয়ে তো ধর্ষকের সাথে বিয়ে হবার মতো বিভৎসতা তো আছেই আমাদের সমাজে।

যে অনলাইন নিউজ পোর্টাল থেকে এই খবরটি নেয়া হয়েছে তারা এর শিরোনাম করেছেন, “এ রকম বিয়ের পর এমন মৃত্যু!” রিপোর্টার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন কণার এই মৃত্যু নিয়ে। রিপোর্টারও কি কণার মতো করেই ভেবেছিলেন যে, কণার বিবাহিত জীবনে সুখের হবে। কমন সেন্স বলে এমন বিয়ের পরিণতি এমনই হবার কথা, বা এর কাছাকাছি কিছুই হবার কথা। তাই কণার এমন মৃত্যু নিশ্চয়ই আমাকে দুঃখিত করেছে, কিন্তু বিস্মিত করেনি একবিন্দুও।

Facebook: https://www.facebook.com/Ana.nasrin.7