ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

কিছুটা দূরে হলেও আমার এই লিখার বিষয়বস্তুর সাথে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল এর কিছুটা সম্পর্ক আছে। আমার খুব শ্রদ্ধার মানুষদের একজন ছিলেন তিনি। ‘ছিলেন’ বলছি, কারণ এখন আর তিনি সেটা নন। যখন তিনি আমার শ্রদ্ধার মানুষ ছিলেন, তখন তাঁকে মনে করতাম ভালো মানের একজন ‘Public Intellectual’ (ইংরেজি শব্দটাই ব্যবহার করলাম, কারণ এর পরিবর্তে যে ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটা ব্যবহৃত হয়, সেটা বিভ্রান্তি তৈরি করে)।

আমাদের সমাজের বিরল প্রজাতি ‘Public Intellectual’দের একজন হিসাবে তাঁর অবস্থান আমার কাছে একজন দলান্ধ বুদ্ধিজীবীর পর্যায়ে নেমে এসেছে ২০০৯ সালের আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে। আমি স্তম্ভিত হয়ে দেখলাম এই ভদ্রলোকের কলম আর চলছে না। আওয়ামী লীগ কি দল হিসাবে বিএনপি’র তুলণায় এতোটাই ভালো হয়ে গেলো যে জাফর ইকবাল এর কলম বন্ধ হয়ে যায়? আওয়ামী লীগ কি এই দেশে একটা মোটামুটি দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন উপহার দিতে পেরেছে যে এখন লিখার মতো বিষয় তিনি আর খুঁজে পাচ্ছেন না?

গৌরচন্দ্রিকাটা বেশি বড় হয়ে গেলো সম্ভবতঃ। মূল কথায় চলে যাওয়া যাক। এই সরকারের আমলে যে অল্প দুই একটি বিষয় নিয়ে সরকারের সমালোচনায় নেমেছিলেন তিনি তার মধ্যে প্রধানটি সম্ভবত শিক্ষা। বেশ কয়েকবার তিনি প্রশ্ন ফাঁস, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়া, শিক্ষার মানের অধঃপতন ইত্যাদি নিয়ে বেশ কড়া ভাষায়ই বেশ কয়েকটি লিখা লিখেছিলেন (কয়েকদিন আগেও লিখেছেন)। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা অধঃপতিত হলে জাফর ইকবাল এর মতো মানুষেরা ‘বাংলাদেশকে নিয়ে স্বপ্ন’ কিংবা ‘তরুণরাই পারবে’ টাইপ বিষয়ের বাইরে গিয়ে এমন লিখা লিখেন!

এবার কয়েকদিন আগে প্রকাশিত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সাক্ষরতা নিয়ে নিয়ে একটা গবেষণার কিছু তথ্য জানা যাক। দেশের ২৭০টি গ্রাম বা মহল্লায় ১১ বছর ও তদূর্ধ্ব ১১ হাজার ২৮০ জনের ওপর গবেষণার লক্ষ্য অনুযায়ী জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের এক পাশের ঘরে বিড়াল ও লাঙলের ছবি দিয়ে অন্য পাশের ঘরে এগুলোর নাম লিখতে বলা হয়েছে। জেলেরা নদীতে মাছ ধরে ও আমাদের পতাকার রঙ সবুজ ও লাল — এ দুটি বাক্য লিখে দিয়ে শব্দ করে পড়তে বলা হয়েছে তাদের। এছাড়া ৭৯ থেকে ৩৪ এবং ৪২ থেকে ৪-এর বিয়োগফল জানতে চাওয়া হয়। এরকম ২৪ টি প্রশ্ন করে ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় যোগ্যতা যাচাই করা হয়েছিল।

সাক্ষরতার মানের নানা শ্রেণীবিভাগ করা হলেও মাত্র ২৫ নম্বর প্রাপ্তকে প্রাক-সাক্ষর বিবেচনা করে এর নিচে অবস্থানকারীদেরকে অ-সাক্ষর বলা হয়েছে। এতে যে ফলাফল এসেছে, সেটা রীতিমত ভয়াবহ। এই অতি সাধারণ প্রশ্নের উত্তরে ব্যর্থ হয়ে অ-সাক্ষর হয়েছে তৃতীয় শ্রেণী উত্তীর্ণ ৬৮% ছাত্র। আর প্রাইমারি স্কুল পাশ করে অ-সাক্ষর থাকে ৩২%। এমনকি অষ্টম শ্রেণী পাশ করেও ৮% ছাত্র অ-সাক্ষর থেকে যায়! (বিস্তারিত পড়ুন)।

এ তো গেল ন্যূনতম মান অর্জনকারীদের অবস্থা। কী অবস্থা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ মান অর্জনকারীদের? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ মান অর্জনকারী জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের বিদ্যার হাল নিয়ে তো ক্রমাগত রিপোর্ট আসছেই। সবচাইতে আলোচিত বিষয় হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের পারফর্মেন্স। এই রিপোর্টে (দুটি জিপিএ-৫ নিয়েও ভর্তি পরীক্ষায় ফেল!) দেখা যায়, এসএসসি এবং এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়া স্টুডেন্টদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করে। স্তম্ভিত হবার মতো ব্যাপার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাস মার্ক তুলতে না পারা স্টুডেন্টদের গায়ে আমরা ‘সর্বোচ্চ মেধাবী’ এর তকমা লাগিয়ে দিচ্ছি! আর ‘সর্বোচ্চ মেধাবী’র সংখ্যাটা হাজার হাজার।

আসা যাক শিরোনামে লিখা প্রবচনটির কথায়। আমাদের সমাজে প্রচলিত একটা লোকজ প্রবচন ‘মোটাসোটা বেকুবও ভালো’। একটা সমাজে প্রচলিত প্রবচন সেই সমাজের অনেক মানুষের চিন্তার এক ধরণের বহিঃপ্রকাশ তো বটেই। তাই বলা যায় আবহমানকাল থেকেই সমাজের একটা অংশের কাছে মানের চাইতে আকার বা পরিমানে বড় হওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

সার্বিক দিক বিবেচনায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক ‘মোটাসোটা বেকুব’ বলাই যায়। আর আমাদের সরকার সেই প্রবাদ মতো আমাদেরকে অনেক বেশি পাশের হার, অসংখ্য জিপিএ ৫ দিয়ে ভরিয়ে ফেলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনেক ভালো বলে দেখানোর চেষ্টায় লিপ্ত। কিন্তু আমাদের সমাজে প্ৰচলিত কিছু প্রবচনের মতো এই প্রবচনটিও যে কোন বিচারেই পরিত্যাজ্য, কারণ মানহীন আকার/পরিমাণ বাস্তবে কোন কাজে লাগে না।

প্রতি বছরের মতো আজ সারা দেশের সব স্কুলে বিনামূল্যে নতুন বই বিতরণের উৎসব হলো বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে। এই ঢাকটা অনেক বেশিই বাজানো হয় সরকারের পক্ষ থেকে। সরকার মনে করে এই পদক্ষেপ শিক্ষা ক্ষেত্রের আর সব সমালোচনাকে ছাপিয়ে যাবে। কিন্তু আমি মনে করি বিনামূল্যে নতুন পাঠ্যবই বিতরণ করার শাক দিয়ে মানহীন শিক্ষার মাছটিকে ঢাকা যাচ্ছে না আর।

facebook: https://www.facebook.com/Ana.nasrin.7