ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

আজ মঙ্গলবার। হুগলা বাজারের সাপ্তাহিক ও কুরবানির পশু কেনার শেষ হাট। দুপুর ১২টা থেকে দূর-দুরান্ত থেকে লোকজন আসতে শুরু করেছে। হাটের যে জায়গাটা পশু বেচা-কেনা হয়, সেখানে অনেক ভীড়। এদের অনেকেই কুরবানির জন্যে পশু কিনে ফেলেছে। তাদের মুখে হাসি ও বিজয়ের চিহ্ন সহজেই বুঝা যায়। তারাও চাচ্ছে তাদের এ আনন্দ, বিজয় ও গর্বের ব্যাপারটি সবাই জানুক। তাছাড়া এত টাকা দিয়ে কিনে পশু কুরবানি করে কী লাভ যদি কেউ না-ই জানলো! প্রদর্শনের এ যুগে যে যত ক্রয়ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারে তার তত পরিচিতি ও বাহবা মেলে। প্রদর্শনের ধরনও বদলে গেছে। আগে মুষ্টিমেয় কিছু লোক তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের মাধ্যমে কৌশলে নিজের প্রচার চালাতেন। আর এখন কেউ কারও চেয়ে কম না। জাহির করার কাজটা তাই নিজেকেই করতে হয়।

সামাজিক মাধ্যম এ কাজটি আরো সহজ করে দিয়েছে। এটি এখন হয়ে উঠেছে আত্মপ্রচারের সেরা মাধ্যম। মোবাইলে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় যে যেভাবে পারছে ছবি তুলছে। ছবি তুলে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে দামসহ। কমেন্টও আসছে বিচিত্র ধরনের। যেমন: হাম্বা ঈদে জমবে বেশ! দামটা বেশি হয়ে গেলো! এত কম দাম! হারকিপটা! জিতেছেন! ওয়াও কী সুন্দর, বেশ ভালো মানিয়েছে!

অন্যদিকে যাদের কেনার সামর্থ্য নেই তারাও এসেছে। এদের কেউ এসেছে অন্যকে সহযোগিতা করতে, কেউ মজা দেখতে, কেউ দালালি করতে, কেউ এসেছে অন্যের ক্রয়ক্ষমতার বাহবা ছড়িয়ে দিতে। এদের কারও কারও অবস্থা অনেকটা বিশ্বকাপ চলাকালীন অতি উৎসাহী দর্শকদের মতো। এরা হাটে ঘাটে বাজারে গ্রামে চা দোকানে আলোচনা করে কার পশুটা কেমন, কার দামটা বেশি, কার দামটা কম, কার পশুর গোশত বেশি বা কম হবে, কে কৃপন, কে বড় মনের, কার টাকার উৎস কোথায় ইত্যাদি। এরা এগুলো করেই তৃপ্তি ও আনন্দ পায়। ঈদের দিন এরাই অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকবে কখন গোশত পাবে!

আর যারা এখনও পশু কিনতে পারেনি, তারা আছে দুশ্চিন্তায়। বাজেটের সাথে দামের সঙ্গতি হচ্ছে না। এদেরই একজন সীমিত বেতনের চাকরিজীবী কফিলউদ্দিন ছেলেকে নিয়ে হাটে এসেছে কুরবানির পশু কিনতে। বাবার অবস্থা দেখে সপ্তম শ্রেণিতে পড়া ছেলেটি জানতে চায়- আচ্ছা বাবা, ঈদে পশু কিনতে না পারলে কি ঈদ হবে না? এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ এরকম প্রশ্ন শুনে কফিলউদ্দিন কিছুটা থেমে যায়। তারপর বলল, হবে। আসলে সবকিছু নির্ভর করে আন্তরিক নিয়তের উপর। ছেলে পাল্টা প্রশ্ন করার আগেই বাবা বলতে লাগল, পশু কুরবানি করা একটি ইসলামী রীতি। এর অন্তর্নিহীত তাৎপর্য হচ্ছে আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ সমর্পনের বা তাঁর নৈকট্য লাভের অন্তরায়গুলো (অর্থাৎ নিজের পশুত্বকে) কুরবানি করা। এখানে পশুত্ব বা আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ সমর্পনের অন্তরায়গুলো হচ্ছে আমিত্ব, অহংকার, লোভ-লালসা, ক্রোধ, ঘৃনা, ঈর্ষা, হিংসা, মোহ ইত্যাদি। এগুলো কুরবানি বা ত্যাগ করা শুধু আল্লাহর জন্যেই নয় বরং নিজের জীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা এবং সুষ্ঠু ও মানবিক সমাজের জন্যে অপরিহার্য। বাবার কথা শুনে ছেলেটি চুপ হয়ে যায় এবং কুরবানির মূল উদ্দেশ্য ও বর্তমান বাস্তবতা মিলাতে পারে না।