ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

প্রতীকি হলেও সে সময় খুব অসহায় লাগছিলো....'শিরোচ্ছেদের সময় এর থেকেও অসহায় ছিলেন সেই অভাগা আট বাংলাদেশী'

সৌদি আরবে আট বাংলাদেশীর মৃত্যুদন্ড কার্যকরের নৃশংস পদ্ধতি নিয়ে ক্ষুব্ধ ও শোকার্ত ব্লগগুলোতে হঠাৎ চোখে পড়লো, আশীফ এন্তাজ রবি ভাইয়ের লেখা। “নিজের শরীরে দড়ি বেঁধে আমরা মাথা নিচু করে রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকবো কিছুক্ষণ” শিরোনামে তার আহবান ছিলো-

সৌদি আরবে ৮ বাংলাদেশীকে শিরচ্ছেদ করার সময়, সেই অসহায় মানুষেরা যেভাবে হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, যেভাবে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল, অবিকল সেইভাবে। নিজের শরীরে দড়ি বেঁধে আমরা মাথা নিচু করে রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকবো কিছুক্ষণ। আমাদের বিশ্বাস- প্রকৃত ব্যাপারটা কতখানি বিভৎস্য ছিল, এই কর্মসূচীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সেই বিভৎস্যতার স্বরূপটি ধরতে পারবেন। আর এভাবেই আমরা আমাদের ঘৃণা, আমাদের প্রতিবাদ আমরা ছড়িয়ে দেবো সবখানে।

আমি ভাবছিলাম, এই তো সেদিন হঠাৎ করে বিডিনিউজে দেখেছিলাম নিউজটি! আমি শিউরে উঠেছিলাম, আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের দৃশ্য দেখে রাতে আমার ঘুমাতে সমস্যা হয়েছে। বর্বর এ হত্যাযজ্ঞের দৃশ্য সবসময় আমার চোখে ভেসেছে আর মনে হয়েছে- সভ্যতার কোন যুগে আমরা দাঁড়িয়ে?

শনিবার সকালে রবি ভাইয়ের লেখার আহবানে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গেলাম, চরম কষ্টবোধ নিয়ে যেতে বাধ্য হলাম। ঘৃনা আর প্রতিবাদ ছড়িয়ে দিতে, বিভৎস্যতার স্বরূপটি ধরতে সে ভাবেই দাঁড়িয়ে গেলাম, সৌদি আরবে ৮ বাংলাদেশিকে শিরশ্ছেদ করার সময়, সেই অসহায় মানুষেরা যেভাবে হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা আটজন হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়ালাম, ঠিক যেমন পত্রিকায় দেখেছি। মরুর বুকে হাঁটু গেরে মৃত্যু প্রতিক্ষায় থাকা আট বাংলাদেশি, আটজন মানুষ।

আগেই অনুরূপ কসটিউম পড়ে নিয়েছি, সাদা পোশাক, শরীর দড়ি দিয়ে বাধাঁ, কাপড়ে মুখ ঢাকা। আট আসামি, দুই জল্লাদ! কিছু সময় পর গরমে ঘেমে উঠলাম, যে ঘাম ভেজাচ্ছে শরীর, শরীর বেয়ে ভেজাচ্ছে রাজপথ! রাজপথের পিচ জিন্স ভেদ করে ব্যাথা করে দিচ্ছে পা! চারিদিকে উৎসুক দৃষ্টি অনুভব করছি। আমি ভাবছিলাম, জীবন হারানো সেই অভাগা মানুষগুলোকি এভাবেই ঘেমে উঠেছিলো? মনে হয় তারা ঘামেনি!!! তারা তো পরিবারকে একটু সুখে রাখতে, আর্থিকভাবে সচল রাখতে, ঘাম বিক্রি করতেই গিয়েছিলো……! তাদের ঘামেই তো বেড়েছে এদেশের বৈদেশীক মূদ্রার রিজার্ভ। এদেশের উন্নয়নের ইট-বালু-সিমেন্টের মাঝে মিশে আছে তাদের প্রবাস জীবনের অবর্ননীয় পরিশ্রমের ঘাম। এ দেশের পতাকার মাঝে একটু হলেও লাল রয়েছে তাদের শ্রমে ঘামে পানি করা এক ফোঁটা রক্ত!

সময় বাড়ার সাথে সাথে আমাদের কষ্টও বেড়ে যাচ্ছিলো, ঘামে পুরো শরীর ভিজে উঠেছে, পা দুটো ব্যাথায় টনটন করছে! তবুও সান্তনা খুঁজছিলাম- এটাতো প্রতীকি, আমাদেরতো আর শিরোচ্ছেদ হবে না! কিন্তু আরবের সেই অভাগা গুলো সে সান্তনা পায় নি! আমি ভাবতেই শিহরিত হই কি কঠিন সময় ছিলো সেটা! ভয়ংকর এক অনুভূতি আমাকে গ্রাস করছিলো।

তারা কি ভাবছিলো, তাদের ছোট্ট মেয়ের কথা, সামনের ঈদে যার পুতুলের বিয়ে হবার কথা ছিলো, সৌদি থেকে একটা বর পুতুল আনার কথা দিয়েছিলো সে! কিম্বা ভাবছিলো, তাদের স্ত্রী’র কথা। এয়ারপোর্টে বিদায় দিতে আসা বউকে লাল শাড়িতে নতুন বৌয়ের মতোই লাগছিলো। কিন্তু হায়, শিরশ্ছেদের রক্ত তাদের বৌয়ের শাড়ির রং কেড়ে নেবে!!

মরুর বুকে হাটু গেড়ে থাকা, দড়িতে বাধা, মুখ ঢেকে রাখা সেই মানুষ গুলো, তাদেরও হয়তো ব্যাথা হয়েছিলো পা! তারাও হয়তো অনুভব করেছিলো উৎসুক দৃষ্টি! তারা হয়তো ভেবেছিলো, এ এক বিভৎস দুঃস্বপ্ন! কিছু সময় পর তারা ফিরে আসবে বাস্তব পৃথিবীতে, মানবিক পৃথিবীতে। শিরশ্ছেদ হওয়ায় তারা হয়তো জেনে যেতে পারেনি, সভ্যতার উৎকর্ষের পরও এ পৃথিবীর অনেক কিছুই আজো অমানবিক, আজো বিভৎস দুঃস্বপ্ন!

পুনশ্চঃ কর্মসূচি চলার সময় যোগ দেন বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট জয়ী মূসা ইব্রাহীম। আমি ভাবছিলাম, মানবের উন্নত শির এভারেস্ট জয় করার জন্য, এভারেস্টকে ছাড়িয়ে যাবার জন্য, বর্বরের আঘাতে ভূলুন্ঠিত হবার জন্য নয়।

***
ফিচার ছবি: কৌশিক আহমেদ

৬ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. prasenmithu বলেছেনঃ

    “এন আই ফর এন আই উইল মেক দ্য হোল ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড”- মহাত্মা গান্ধী।
    এই হারে (১ঃ৮) শিরোচ্ছেদ চলতে থাকলে একদিন হইত পৃথিবীতে বাস করার মত কোনও মানুষ থাকবে না। মানবতার জয় হউক।

  2. মওদুদ মোমেন মিঠু বলেছেনঃ

    রইস ভূইয়া- নিজের খুনির মুক্তির লড়েছিল যে বাংলাদেশী। শান্তির ধর্ম ইসলামে ক্ষমার কি স্থান নেই? রীড দিস

কিছু বলতে চান? লিখুন তবে ...