ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

কেনেথ টাইনান ছিলেন একজন প্রভাবশালী নভেলিস্ট এবং বিখ্যাত ড্রামা ক্রিটিক। কিন্তু তিনি কখনও নাটক লেখেননি!!!। তার এই নাটক না লেখার বিষয়ে এক ইন্টারভিউতে তিনি বলেছিলেন,

“একজন মানুষ তার জীবনে যা কিছু লিখতে পারে, তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন হলো নাটক লেখা। “

হয়তো কঠিন বলেই কেনেথ টাইনান নাটককে এড়িয়ে গেছেন! কিন্তু তিনি বলে যাননি আমাদের জীবনটাই একটা নাটক এবং সমস্যা আর সংকটে ভরপুর জীবনের নাটক এড়ানো সম্ভব নয়।
আমি ভাবছিলাম, যুক্তিবিদ্যার সেই জটিল সমীকরণ- গরু ঘাস খায়, মানুষ গরু খায় অর্থাৎ মানুষ ঘাস খায়!

আচ্ছা, জীবনটা যদি নাটক হয়, আর আমাদের জীবন জুড়ে যদি রাজনীতি হয়, তবে কি রাজনীতিও একটা নাটক? রাজনীতি নাটক হলে সেটা কি বানিজ্যিক নাটক, নাকি শিল্প সমৃদ্ধ নাটক? সম্ভবত, রাজনীতি বানিজ্যিক নাটক! তবে টিভি নাটকের সাথে রাজনীতি নাটকের পার্থক্য হলো, টিভি নাটকের বানিজ্য টাকায় আর রাজনীতি নাটকের বানিজ্য ক্ষমতায়! টিভি নাটকে সংঘর্ষ হয় না, হয় অভিনয়। স্ট্যানম্যানরা মার খায় না, মার খাবার অভিনয় করে। সেখানে রক্ত ঝরে না, ঝরে আলতা( লাল রং)। কিন্তু রাজনীতি নাটকে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সংঘর্ষ হয়, সাধারন মানুষ মার খায়, যে নাটকে আলতা নয় বরং রক্তই ঝরে।

আর এমন রাজনীতিক নাটকে আজ রক্ত ঝরলো চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে। চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে নিহত চার জন কোন স্ট্যানম্যান ছিলোনা ছিলো সাধারণ মানুষ। তারা নিহত হলো আমাদের ক্ষমতা কেন্দ্রিক মহাকাব্যিক রাজনীতির দ্বন্দ্বে। যে দ্বন্দ্বটি সাম্প্রতিক সময়ে হয়েছে প্রকট।

উদ্বেগ-উৎকন্ঠা নিয়ে আমি খেয়াল করছিলাম এ সংকটের নানা ঘটনা প্রবাহ-

ঘটনা প্রবাহ এক. ৯ জানুয়ারী চট্টগ্রাম জনসভা থেকে খালেদা জিয়া ২৯ জানুয়ারী ঢাকা সহ অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহর সদরে গন মিছিলের কর্মসূচী ঘোষনা করেন।

ঘটনা প্রবাহ দুই. ২৬ জানুয়ারী, মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় বিএনপি-জামায়াত জোটের দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে দেড় মাস ব্যাপি কর্মসূচির অংশ হিসাবে ২৯ জানুয়ারী পাল্টা সমাবেশ করার ঘোষনা দেয়।

ঘটনা প্রবাহ তিন. ২৮ জানুয়ারী, প্রধান দুই দলের পরস্পর বিরোধী অবস্থানে সংঘর্ষের আশংকায় ডিএমপি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ২৯ জানুয়ারী মিছিল সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

ঘটনা প্রবাহ চার. ২৮ জানুয়ারী, পুলিসের নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষিতে বিএনপি তাদের গনমিছিল একদিন পিছিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। এবং রাতে আওয়ামী লীগ তাদর সমাবেশ কর্মসূচি স্হগিত করে।

ঘটনা প্রবাহ পাচ. ২৯ জানুয়ারী, মহানগর আওয়ামী লীগ তাদের স্থগিত করা কর্মসূচি ৩০ জানুয়ারি বিএনপির গনমিছিলের দিনে করার ঘোষনা দেয়। এদিন চাঁদপুর ও লক্ষিপুরে বিএনপির গনমিছিলের সাথে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ চার জন নিহত হয়।

ঘটনা প্রবাহ ছয়. ??????

এ প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন? কি হবে ৩০ জানুয়ারী? ডিএমপি কি আবারো নিষেধাজ্ঞা জারি করবে? বিএনপি কি নিষেধাজ্ঞা ভেঙ্গে গনমিছিল করবে? আওয়ামী লীগ কি বিদ্বেষপ্রসুত সমাবেশ করবে? পুলিশ-বিএনপি-আওয়ামীলীগের ত্রিমুখী সংঘর্ষে কি আবারো রক্ত ঝড়বে? লাশ পড়বে? আমি ভাবছিলাম, জনগনের জীবন ও জীবিকার এ নিরাপত্তাহীনতার দায় ও দোষটা কার?

এটা নির্বাচন করার জন্য মূল্যায়ন করতে হবে পূর্বের পাঁচটি ঘটনা প্রবাহ…..যেহেতু নির্দিষ্ট দিনের ২০ দিন আগে বিএনপি কর্মসূচি ঘোষনা করেছিলো, তাই বিএনপির গনমিছিল ছিলো প্রত্যাশিত। কিন্তু মাত্র ৩ দিন আগে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির দিনেই আওয়ামীলীগের সমাবেশ ঘোষনা ছিলো অপ্রত্যাশিত! এবং এ অযাচিত সিদ্ধান্ত উদ্বেগপূর্ন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে! আওয়ামীলীগের এ অনাকাংক্ষিত সিদ্ধান্ত যে সংঘাতের আবহ তৈরি করে তা নিরাপত্তার স্বার্থে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্র তৈরি করে। ফলে ডিএমপি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ২৯ জানুয়ারী মিছিল-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বিবাদমান এ অচলাবস্থায় বিএনপি তাদের রাজনৈতিক বিচক্ষনতার পরিচয় দিয়ে গনমছিল এক দিন পিছিয়ে দেয়। তবে ২৯ তারাখেই নির্ধারিত গনমিছিল করতে গিয়ে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে বিএনপির মিছিলে বাধা দেয়ায় সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে চার জন নিহত হয়! আমি নিশ্চিত নই, ২৯ জানুয়ারী চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে নিষেধাজ্ঞা চলছিলো কিনা! যদি নিষেধাজ্ঞা থাকে তাহলে স্থানীয় বিএনপি গনমিছিল একদিন না পিছিয়ে নির্দিষ্ট দিনে করার অতি উৎসাহ কেন দেখালো? আর বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য কিভাবে বিএসএফের মতো এ দেশের মানুষের বুকে গুলি চালিয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা জন্ম দিলো! রাজনীতি না হয় নাটক! কিন্তু পুলিশতো আর রাজনীতিবীদ নয়। নাকি পুলিশ প্রমান করলো, তারা ক্ষমতাশীন রাজনীতি নাটকের একটি চরিত্র!

আমার মনে হয়, ন্যাক্কারজনক এ ঘটনা শুধু লজ্জাজনকই নয় এতে একটি সতর্কবার্তাও রয়েছে!
যে সতর্কতা আগামিকাল আরেকটি সংঘাতের আশংকার, আরো রক্তের এবং লাশের আশংকার!

বিএনপির পিছিয়ে দেয়া গনমিছিলের দিনেই আওয়ামীলীগ আবারো অপ্রত্যাশিতভাবে সমাবেশ ডেকেছে! তাদের এ অগনতান্ত্রিক ও অসহিষ্ণু আচরনে সংঘাত, সহিংসতা ছড়িয়ে দিতে পারে, কাল আরো রক্ত ঝরতে পারে, লাশ ও পড়তে পারে! তাই এ ক্ষেতে বিএনপির সহনশীলতার বিপরীতে আওয়ামীলীগের এ অসহিষ্ণতায় যদি কোন অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম হয় তাহলে এর দোষটা আওয়ামীলীগের ওপরই পড়বে, দায়টা তাদেরই নিতে হবে।