ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ ঢাকাকে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করেছে। দিল্লির সাথে তার যে চরম প্রতিযোগিতা তা প্রমাণিত। যে করেই হোক এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। শুধু দিল্লি কেন ধর্ষণের শহর হবে? ঢাকা কম কিসে? তারই ধারাবাহিকতায় বাংলার মানুষ প্রত্যক্ষ করলো অভিনব পন্থার অপরাধ। মানুষ সংবাদে সংবাদে জানলো ঢাকার বুকে ফিরতি পথে খেটে খাওয়া নারীরা নরপশুদের শিকারে পরিণত হয়। কিন্তু ঢাকার মানুষ আজ ক্লান্ত। কাগজে, টিভিতে, সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে, ভার্চুয়াল মিডিয়ায় প্রতিমূহুর্তের দুঃসংবাদে মানুষ প্রায় অনুভূতিহীন হতে চলেছে। এমন সংবাদ প্রতিদিনই ঘন্টায় ঘন্টায় আসে। ক’টার খবর ক’জনে রাখবে! কষ্টই বা পাবে কিসে? হ্যাঁ, এমনই বাস্তবতা আজকের ঢাকার।

এই তো সেদিন বৈশাখের ভীড়ে কিছু দুষ্টু ছেলের দল দুষ্টুমী করল! শেরপুর থেকে এক আদিবাসী কিশোরীকে তুলে এনে হালুয়াঘাটে নিজেদের পাশবিক কামনা মিটালো ক’জন দুর্বৃত্ত! উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণ, পার্বত্যাঞ্চল থেকে সমতল সবখানেই চলছে এই দুষ্টু ছেলেদের দুষ্টুমী। অসহায় নারী, অসহায় শিশু সারা বাংলাময় এক একটি অদ্ভুতুরে ’নারী’ চরিত্রের চিত্রায়ন করেই যাচ্ছে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। সমাজ, সরকার, আইন-আদালত সবাই ব্যস্ত নির্যাতিত এই নারী স্বত্তাদের ‘হাত ধোয়া পিলাত’ এর মত এড়িয়ে গিয়ে দেশ ও দশের উন্নয়নে। শত শত পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে দেশের উন্নয়নের ইসতেহার। এযাবত দেখা সব স্বপ্নই পুরণের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু হায়! সেই নারী স্বত্ত্বাগলো প্রতিনিয়তই সয়ে যায় এই উন্নয়নের কারিগর ‘আমরা মানুষ’ অথবা ‘আমরা পুরুষ’দের অবর্নণীয় অবহেলা আর তীর্যক চাহনী। সারাদেশের দুষ্টু ছেলের দল আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই ‘আমরা পুরুষ’ নারীদেরকে প্রতিনিয়ত করে তুলছে মনুষত্বহীন নারী স্বত্ত্বায়। সেখানে নারী শুধুই নারী, নরের উপ অথবা অলংকার; কোন মানুষ নয়।

অতি সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া নারী নির্যাতনের ঘটনায় সমাজের এই অসম্ভব দাম্ভিক পুরুষালী চরিত্রের প্রকাশ ঘটেছে অনেকটাই প্রকাশ্যে। যখনই কোন ঘটনা ঘটেছে, কাগজ, টিভি, অনলাইন মাধ্যম, টকশো সবখানেই নারী চরিত্রের পোস্ট মোর্টেম খুব বেশি করে চোখে পড়েছে। নারীর ভেতর বাহির, আপাদমস্তক, চলন-বলন, পোষাক-পরিচ্ছদ – কি নেই আলোচনায়! কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, সব আলোচনাতেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নারীকেই দায়ী করা হয়েছে তার অবস্থার জন্য। কি নির্মম পৌরুষ আমাদের সমাজ-সামাজিকতার! তাই তো নারায়নগঞ্জের পোশাক শ্রমীক ধর্ষণ, বৈশাখের নারী লাঞ্ছনা, শিশু কিংবা ছাত্রী নির্যাতন, মাইক্রোবাসে তরুণী নির্যাতন এই ঢাকাকে দিল্লির সাথে প্রতিযোগিতায় নামিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সমাজ সামাজিকতা এই ঢাকার মানুষকে সাচ্চা ‘পুরুষ’ করে রেখেছে, প্রতিবাদে প্রতিরোধে রাজপথে নেমে আসার তাগিদ দেয়নি। কিছু কিছু প্রতিবাদ হয়েছে, তাও বলতে গেলে যাদের ঘর পুড়েছে শুধু তারাই। তথাকথিত সুশীল সমাজ, বড় বড় নারীবাদী, নারীপক্ষদেরকেও পুরুষ সামাজিকতার চশমা পড়ে ঘটনার বিশ্লেষণে দেখেছি, রাজপথের মিছিলে নয়। তাই আপাতঃ দৃষ্টিতে এটাই মনে হয় যে, মজ্জাগত পুরুষালী চেতনায় সমাজ, সংস্কার আর ব্যাক্তি মনন অবচেতন। সেখানে ধর্ষণ দর্শণ নারীর নারীত্বকে বিশ্লেষণ করে, বিকৃত মানসিকতার অপরাধ প্রবণতাকে প্রতিরোধ নয়। সেখানে মানসিক প্রবৃত্তি নির্যাতিতাকে উপকরণে পরিণত করে, আর নির্যাতক হয়ে রয় খল হলেও ‘নায়ক’।

দিল্লির সেই মেডিকেল ছাত্রী থেকে শুরু করে নারায়নগঞ্জের গার্মেন্টস কর্মী, উত্তরবঙ্গের বিচিত্রা তির্কি, মাইক্রোবাসের অসহায় তরুণীটি, শেরপুরের কিশোরী, কলমাকান্দার সপ্তম শ্রেণীর স্কুলছাত্রী, বৈশাখ উদযাপনের দিনে লাঞ্চিত নারী; সবখানেই নারীদের ’নারী’ হয়ে ওঠার চিত্রই জাজ্বল্যমান। এ সমাজ তার চির পুরুষোচিত চরিত্র নিয়েই সব ঘটনার বিশ্লেষণ করে। কেউ নারীর নারী হওয়ার কষ্ট দেখে না, দেখবার চেষ্টাও করে না, পাছে দায়বদ্ধতার শিকলে বাঁধা পড়ে! বড়ই অদ্ভুত এই সময় আর এই সময়ের মানুষগুলো! মুখে সহানুভূতির মেকি কথার আড়ালে নারীর নারীত্বকেই দোষ দিয়ে যায় প্রতিনিয়ত। খুব ভেতরে চিবিয়ে চিবিয়ে খায় এক টুকরো যৌন মাংসপিন্ড ‘নারী’!