ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
মরতে মরতে শুধুমাত্র ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাওয়া এক নারী সহকর্মীর চোখে-মুখে ফুটে ওঠা ভয় এখনও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ঘটনার পর থেকে একটাই ভাবনা আচ্ছন্ন করে রেখেছে, দায়িত্বশীলদের চোখে কি পড়ছে না এই দুর্ঘটনাগুলো? কোন পদক্ষেপ কেন নেওয়া হচ্ছে না? কেউ কি নেই এই বিষয়গুলো দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে দুর্ঘটনা থেকে, প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়া থেকে, অকালে মরে যাওয়া থেকে এই মানুষদের মুক্তি দিতে পারে? কত কিছুই তো হয় এই সব সম্ভবের দেশে। কিন্তু যা প্রয়োজন তা-ই কেন সবসময় উপেক্ষিত থেকে যায়?
ঘটনাটি ৮ আগস্ট ২০১৭ দুপুরবেলার। বাগেরহাট এসেছি অফিসের কাজে। সকালবেলার সংক্ষিপ্ত সভা সেরে রামপাল ইউনিয়ন পরিষদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। সেখানে রামপাল প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থার সাথে সভা হওয়ার কথা। আমরা চারজন একটি ইজিবাইকে চড়ে বসলাম। পেছনের সিটে দু’জন, সামনের সিটে দু’জন। কথায় কথায় সময় কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎই আমার সামনে মুখোমুখি বসা নারী সহকর্মী চিৎকার করে উঠলেন। এক পলকেরও কম সময়ের মধ্যেই আবিষ্কার করলাম উনার ওড়না ইজিবাইকের মোটরের সাথে পেঁচিয়ে গেছে। আকষ্মাৎ এক হেঁচকা টানে তা চলে গেছে বাইকে নিচে থাকা মোটরের দখলে। ভাগ্য ভালই বলা চলে যে, জর্জেটের ওড়না হওয়ার কারণে এবং তা গলায় পেঁচানো না থাকার কারণে সহকর্মীটির গায়ে তেমন কোন চোট লাগেনি, হাতে হালকা হেঁচকা টান ছাড়া। চালক তাৎক্ষনিক বাইক থামিয়ে ওড়নাটা বের করে আনলেন। অনেক বড় একটি দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেলাম আমরা। কিন্তু এমন সৌভাগ্য অনেক মেয়ে আর নারীর হয় না।
২০১৬ সালের মে মাসে বিবিসি বাংলা ইজিবাইকে ওড়না পেঁচিয়ে ঘটা দুর্ঘটনা নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বাইকের কাঠামোগত প্রকৌশল ত্রুটির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। চালকের আসনের ঠিক পেছনে বসানো দু’জন পেছনে মুখ করে বসার সিটের পাশ দিয়ে ছোট্ট ফাঁক রয়েছে। সেই আসনে মেয়েরা বসলেই অজান্তে ঝুলে থাকা ওড়না বা চাদর নিচের মোটরে জড়িয়ে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গলার সাথে ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ হয়ে মারাত্মক আহত হন। এ সংক্রান্ত দুর্ঘটনার সংবাদ গত ২০১৬-১৭ সালে প্রায় প্রতি মাসেই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সারা দেশ থেকেই এধরণের দুর্ঘটনার কথা সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসতে থাকে। ২০১৬ সালে এক বছরেই সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি)এ ৩৮ জন রোগী ভর্তি হয়। বিভিন্ন মহল বেড়ে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় আশঙ্কা প্রকাশ করতে থাকেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানা নেই।
মোটরে জাড়িয়ে যাওয়া ওড়না
ইজিবাইক সম্পর্কে অল্পবিস্তর খোঁজ-খবর করতে গিয়ে জানলাম বাংলাদেশে এটি প্রথম দেশীয় উদ্ভাবন হিসেবেই প্রচলিত হয়। পরে আমদানী করা হয়। কিন্তু কোন পর্যায়েই সরকার গুরুত্বসহকারে এর ইঞ্জিনিয়ারিং মাননিয়ন্ত্রণ বা এটি দেশীয় রাস্তায় চলার উপযোগীকরণ বা প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও নিয়মনীতি প্রণয়ন নিয়ে চিন্তাই করেনি। বরং সময়ে সময়েই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বদৌলতে জানতে পেরেছি এই বাহনটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, নিবন্ধনের অনুমতি দেওয়া হয়নি, এমনকি অবৈধও ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্ত এতকিছুর পরও ২০১৫ সালের হিসেব অনুযায়ী নিবন্ধিত (পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ) ও অনিবন্ধিত মোট ৩৩১,০০০ ইজিবাইক বাংলাদেশে রয়েছে বলে জানা যায়। ২০১৭ সালে এসে এই সংখ্যাটা কয়েকগুণ বেড়েছে বলেই আমি মনে করি। এর মানে হলো বাইকের সংখ্যার সাথে সাথে দুর্ঘটনা আর মৃত্যুর ঝুঁকিও বেড়েছে বহুগুণ।
এভাবেই প্রতিনিয়ত বেড়ে যাওয়া ঝুঁকি নিয়ে পথ চলছে লাখো নারী। কিন্তু দায়িত্বশীলেরা নির্বিকার। খুব ছোট্ট একটু মডিফিকেশন এই সমস্যার সমাধান করতে পারতো। চালকের আসন আর তার পেছনের আসনের মধ্যেকার ফাঁকটুকু জুড়ে দিলেই অনেকখানি সমস্যা দুর করা যেত। আর এই বিষয়ে আমদানীকারক ও দেশীয় প্রস্ততকারক সংস্থাগুলোকে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার বাধ্যবাধকতায় এনে কোন বাইক যেন এমন ত্রুটি নিয়ে রাস্তায় নামতে না পারে সেটা নিশ্চিত করার কাজটিও সরকারি কর্তৃপক্ষই করতে পারত। অহেতুক নিষিদ্ধ করা, অবৈধ ঘোষণা করা সমস্যার কোন সমাধান তো দেয়ইনি বরং কর্তৃপক্ষের অবহেলার আর দায়িত্বহীনতার কথাই আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
 easyBike
এই সমস্ত অবহেলা আর ঝুঁকির মধ্যে নারীদের তথাকথিত মার্জিত পোশাকের প্রতীক ‘ওড়না’ ঝুঁকির বাড়তি বোঝা হয়েই ঝুলে থাকছে নারীদের ঘাড়ে। আমরা এমন একটি সমাজে বাস করি যেখানে আমরা নারীকেই কাপড়ে মোড়াই, ওড়নাতে মোড়াই, তা সে ভেঙেই যাক অথবা মরেই যাক। জীবন মরণের সমীকরণে একটুকরো কাপড় ‘ওড়না’ নিয়ে নারী দাঁড়িয়ে আমাদের খুব কাছে। কিন্তু সম্ভ্রমের দোহাই, প্রথা আর সমাজ-সামাজিকতার দোহাই আমাদের চোখে ঠুলি পড়িয়ে রেখেছে। নারীকে একজন জীবন্ত মানুষ হিসেবে নয়, কাপড় আর ওড়নায় মোড়ানো লজ্জা-সম্ভ্রমের বাক্স বানিয়ে ফেলেছি।
একজন নারী ওড়না না নিলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়? রিক্সা, ভ্যান আর ইজিবাইকে অকালে প্রাণ তো দিতে হয় না! কি হয় ইজি বাইকগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিলে? অনেক জীবন আর স্বপ্নের মৃত্যু তো ঠেকানো যেত যদি কর্তৃপক্ষ একটু তৎপর হতেন! একটুকরো কাপড়ে মোড়ানো জীবন কি কখনো নারী থেকে জীবন্ত মানুষ হয়ে উঠতে পারবে এই অদ্ভুত অপরিচিত সময়ে!