ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

article-2298553-18E5CED9000005DC-591_634x361

প্রথমবার লন্ডন শহরের অভিজ্ঞতা আমার খুব একটা সুখকর ছিল না। সামান্য কিছু টাকা আর বেঢপ সাইজের ল্যাগেজ নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনেকটা কারো জন্য অপেক্ষা না করাটা খুবই ভীতিকর ছিল। ভয়ের মাত্রাটা তখন না বুঝলেও এখন বুঝি। আমি হয়তো সেদিন কোন না কোন ভাবে শুরু করেছিলাম আমার লন্ডনের জীবন। কিন্তু অনেকের এই শুরুটা হয় মসজিদের মাদুরে রাত কাটিয়ে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় মসজিদ লন্ডন শহরের বাঙালি অধ্যুষিত ব্রিকলেনে। কত ছেলে পেলে এই মসজিদে ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ রাত কাটায় তার হিসেব নেই।

ইস্ট লণ্ডনের এই মসজিদের ভিতর আরামদায়ক সোফা থেকে শুরু করে জীবন-যাপনের আনুষাঙ্গিক প্রায় অনেক কিছুই আছে। একটা লাইব্রেরি যেখানে কেউ বসে বই পড়ছে আর হয়তো কেউ নামাজ পড়ছে। কেউবা হয়তো সোফায় বসে আছে। আমার দেখা দেশীয় মসজিদগুলোর ঠিক বিপরীত। আমাদের পাড়ায় মহল্লায় বেশিরভাগ মসজিদ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময়ের বাইরে প্রায় বন্ধই থাকে। আর খোলা থাকলেও ইমাম সাহেবের অনুমতি ছাড়া খুব একটা ঢোকা যায় না এইসব মসজিদে। তবে তবলীগ বা রোজার সময়ের ব্যাপার ভিন্ন। সোজা কোথায় আমাদের মসজিদগুলোতে সার্বক্ষণিক অবস্থানের খুব একটা সুযোগ নেই। আর থাকলেও এটা শুধুমাত্র আমাদের মানে মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত। ছোটবেলা থেকে এমনটাই জেনে আর দেখে আসছি।

সম্প্রতি ইংল্যান্ডের ১৫০ টি মসজিদ অমুসলিমদের মসজিদে যাতায়াতের উপর বিধি-নিষেধ তুলে নিয়েছে। এর মানে এখন থেকে এই সব মসজিদে অন্য সম্প্রদায়ের লোকজন প্রবেশ করতে পারবে। এই ব্যাপার নিয়ে বিশদ আলোচনার চেয়ে আমার গল্পের মধ্যে দিয়ে যাওয়াটাই পরিচ্ছন্ন মনে হচ্ছে।

নিউইয়র্কের বাসায় ইউটিউব দিয়ে একটা ডকুমেন্টারী দেখছিলাম। ডকুমেন্টারিটা ছিল আমাদের নবীজী রাসূল করিম (সা: ) এর উপর। বিবিসি এর করা ডকুমেন্টারিটা অনেকের কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। তবে আমি পুরো ডকুমেন্টারি থেকে শুধুমাত্র ইতিহাসের অংশটুকু নিলাম। যেটা কিনা অবিকৃত। আর যার মানেটা খুবই সরল আর পরিষ্কার।

নবী করিম (সা: ) এর সময় মক্কা আর মদিনা এই দুই শহরের ভিন্ন রকম চিত্র ছিল। নবীজীর মদিনার মসজিদে অবাধে যাতায়ত ছিল প্রায় সব সম্প্রদায়ের মানুষ জনের। তিনি মসজিদে বসেই প্রায় সব ধরণের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতেন। এমনকি এই সময় জিউস বা ইহুদি গোত্রের লোকরাও নবীজির কাছে নানান ধরনের পরামর্শ বা বিচারের জন্য আসতেন। আর ঠিক এভাবেই রচিত হয় সর্বকালের সেরা চুক্তি মদিনা সনদ। সবাইকে নিয়ে সব ধর্মের লোকদের নিয়ে এবং সবার নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে। অনেকটা এই রকমই ছিল নবীজির মসজিদের কর্মকান্ডের ইতিহাস। এটুকুতে সম্ভবত সবাই একমত হবেন। কালক্রমে বিশ্বের নানা প্রান্তে মসজিদ ভিত্তিক কর্মকান্ড নির্দিষ্ট সামাজিক প্রেক্ষাপটকে ঘিরে গড়ে উঠে। এখনো মসজিদে দাওয়াত বা অন্য ধরনের আলাপ-আলোচনা এসব হয় কিন্তু সর্বসাধারণের প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে।

যারা সৌদি আরব থাকেন তারা বলতে পারেন মক্কা আর মদিনার লোকদের মাঝে আচরণগত পার্থক্য কতটা। বেশিরভাগ মক্কার লোকজন বেশ রাগী আর বদমেজাজী হয়ে থাকে আর মদিনা বাসীরা বেশ আন্তরিক। অবস্থানগত কারণে আমাদের আচরণ ভিন্ন হতেই পারে। তবে আমাদের আচরণের উপর মসজিদের কার্যক্রম নির্ভর করবে নাকি  মসজিদের কার্যক্রমের উপর আমরা আচরণ করবো এই ব্যাপারটি এখনো বেশ জটিল অবস্থায় রয়ে গেছে। আমি যদি বলি নিউইয়র্কের এক মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে একজনকে হাফ প্যান্ট পরে নামাজ পড়তে দেখেছি। এটা প্রায় অনেকের কাছেই একটু বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। হয়তো ভাবতে পারেন থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। অনেকেই তো এখন থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে নামাজ পড়ছে।

সে যাই হোক। যখন বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলিমরা একস্থানে জড়ো হয় তখন ব্যাপারটা নিজের চিন্তার গন্ডির বাইরে যেতেই পারে। অনেকটা এই কারণেই হজের সময় সবার এক ধরণের পরিধান পড়তে বলা হয়। তারপর তো কেউ সেলফি তুলে কেউবা ভিডিও করছে। এটা কখনোই বাধা দেবার ব্যাপার নয়। আমার ছোটবেলা আর লন্ডনের একটা ছেলের ছোটবেলা কখনোই এক হতে পারে না। লন্ডনের অনেক মসজিদের নিচে বার বা নাইট ক্লাব। এই পরিবেশের একজন মুসলিম আর আমি কিভাবে প্রায় একইভাবে একই ব্যাখ্যা বুজতে পারবো?

আমার স্ত্রী ওর মোবাইলে নামাজের ওয়াক্তের সময় আজান সেট করে রেখেছে। এই ধরনের অনেক এপস আছে এখন মোবাইলে। হঠাৎ একদিন বাস এ আযান বেজে উঠায় আমি রীতিমতো আতংকিত হয়ে উঠি। নিউইয়র্কের কোন পাবলিক বাস এ এই ধরনের হঠাৎ আযানের শব্দ অনাকাঙ্খিত বিপদের কারণ হতে পারে। বাধ্য হয়ে আমার স্ত্রী পরে এই অ্যালার্ম বন্ধ করে দেয়। ফেসবুকে নিজের নামের পাশে আরবি হরফ অনেকের কাছে ইদানিং ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে। সার্বিকভাবে যদি ব্র্যান্ডিং এর দিক থেকে দেখি তাহলে বলা যায় যে কোন ধরনের ইসলামিক ব্রান্ডকে অন্যভাবে দেখা হচ্ছে। এর কারণ না হয় বিশ্লেষণ নাই করলাম। কিন্তু পসিটিভ ব্র্যান্ডিং এর দিকে নজর না দিলে এর আকার আরো মারাত্মক হতে বাধ্য।

বিশ্ব গণমাধ্যম ইসলামের প্রায় সব ধরনের প্লাটফর্মকে নেগেটিভ ভাবে উপস্থাপন করে থাকে। এর মাঝে যারা ভালো কিছু করছে তারা প্রায় অগোচরে থেকে যাচ্ছে। এমন একটা প্লাটফর্ম নেই যেখানে সুন্দরভাবে সব কিছু উপস্থাপন করা যায়। মিডিয়া বা চারপাশের সমাজকে তো অবজ্ঞা করার কারণ নেই। আমরা তো সবাই আর ডোনাল্ড ট্রাম্প এর মতো না। মসজিদ নামক একটা স্থান যদি এই প্লাটফর্ম এর কাজ করে তবে তাতে কি খুব বেশি ক্ষতি হবে?

আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যখন এই ধরনের একটা লেখা লিখতে হলে আলাদা ভাবে শব্দ নিয়ে ভাবতে হয়। কেন? সহজভাবে সরলভাবে সবাইকে নিয়ে আমার বা আমাদের উদারতা কি আমরা দেখতে পারি না? নিজেদের আইসোলেটেড না ভেবে নতুন করে পসিটিভ ব্র্যান্ডিং তো আমরা করতে পারি।

গণিতের আলজেব্রা শব্দটি আগে আল একটা ইসলামিক শব্দ এটা কজন মানুষ জানে? আজকের ইংরেজি নম্বর এর উত্থান যে মুসলিম বিশ্ব থেকে হয়েছে এটাও বা কজন জানে? ভাবলে অবাক লাগে আমেরিকার স্ট্যাচু অফ লিবার্টির নারী মূর্তি মিশরের এক মুসলিম নারীর। এতো সব ব্র্যান্ডিং আমাদের মাঝে থাকার পরও আমরা এগুলোকে ব্যবহার করতে পারছি না। একটা জায়গা থেকে তো শুরু করতে হবে। ইংল্যান্ড এর মসজিদের এই নীতি আমি সমর্থন করি বা না করি তাতে কিছু যায় আসে না। তবে এই প্লাটফর্ম ব্যবহার না করাটা আমাদের জন্য বোকামি হবে এটা আমি হলপ করে বলতে পারি।