ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 
uber 1

সপ্তাহে ২০০০০ টাকা ইনকামের আশ্বাস দিয়ে উবার সবাইকে ইমেইল দিচ্ছে ট্যাক্সি চালানোর জন্য। আমাদের মতো দেশে সপ্তাহে ২০০০০ টাকা মানে মাসে ৮০০০০ টাকা বিশাল ব্যাপার। লেখাপড়া করে বড় সাহেব হলেও এতো টাকা বেতন হয়তো কল্পনা করা যাবে না। আসুন সবাই মিলে উবার ট্যাক্সি চালাই। মা বাবাকে একটা ট্যাক্সি কিনে দিতে বলুন আর দেখবেন সপ্তাহ শেষে কারিকারি টাকা । অথবা সিনেমা হলের টিকেট কালোবাজারিও করতে পারেন। কারণ উবার ট্যাক্সি চালানো আর টিকেট কালোবাজারি এই দুই এর মধ্যে তাত্ত্বিকভাবে তেমন কোন পার্থক্য নেই। তবে চাইলে টিকেট কালোবাজারির একটা এপপ্স করে নিতে পারেন। পুলিশ বা সরকার কোন আইনেই আপনাকে কিছু করতে পারবে না। কারণ অনলাইনে টিকেট কালোবাজারির যেমন সুনির্দিষ্ট কোন আইন নেই ঠিক তেমনি উবারের জন্যও সরকারের কোন আইন নেই।

uber 2

উবারের ঢাকাতে অফিস কোথায় এখনো জানা নেই কারো। অথচ দেশের প্রায় সব কটি ব্যাংকের মাধ্যমে উবারের ট্যাক্সি ভাড়া আদান প্রদান করা হয়। যে ইমেইলের মাধ্যমে উবার সবাইকে ট্যাক্সি চালানোর কথা বলছে সেখানে উবারের অফিস দেখানো হয়েছে হল্যান্ড। সব কিছু বাদ দিলেও সামান্য এই ইমেইলের কারণে একটা তত্ত্ব প্রযুক্তি আইনে একটা মামলা করা যেতে পারে উবারের বিপরীতে । পৃথিবীর প্রায় সবদেশ এইতো করছে এই রকম মামলা। আমরা করতে সমস্যা কোথায়? চলুক না উবার নিজের মতো আর সাথে সাথে মামলা মোকদ্দমাও তো চলতে পারে। এটাই তো ব্যালান্স অফ ডেমোক্রেসি। আমেরিকা ইউরোপ এর মতো জায়গা গুলোতে উবার নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সরকার । কারণ যে জিনিসের অস্তিত্ব নেই তাকে আইনের আওতায় আনা একটু জটিল বৈকি। তাহলে বিলিয়ন ডলারের উবার কি এমনি এমনি এতো বড় গ্লোবাল কোম্পানি হয়ে উঠলো?

https://consumerist.com/2017/03/03/uber-used-secret-tool-to-avoid-regulators-law-enforcement-worldwide/

গ্লোবালি কি হচ্ছে তা জানার কি খুব প্রয়োজন আছে? নিজের ঘরে বাইরের মানুষ ঢোকার আগে একবার নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করা খুবই স্বাভাবিক আচরণ বলে সবাই জানে । নাকি আমেরিকা থেকে এসেছে দেখে যে কাওকে আপনি আপনার বাসায় কিছু জিজ্ঞেস না করেই ঢুকতে দিবেন? খুব সম্ভবত এই দিনটুকু বাংলাদেশে এখন আর নেই । তবে সরকারের আচরণ বলছে এখনো সরকার শুধুমাত্র আমেরিকান বললেই সাত খুন মাফ করে দেবেন। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে শত শত মামলা মোকদ্দমা উবারের নামে। যাত্রী হয়রানি ড্রাইভারদের সাথে লুকোচুরি এই সব উবারের জন্য মামুলি ব্যাপার। যেহেতু উবার একটা ভার্চুয়াল অ্যাপস সুতারং কোন দেশের আইনই উবারকে খুব একটা শক্ত করে ধরতে পারছে না। আর এই কারণেই উবার সাধারণত বেস বা নিজস্ব অফিসের ব্যাপারে খুব একটা সচেতন না।

https://www.theregister.co.uk/2015/03/26/dutch_transport_inspectorate_raid_uber_amsterdam_office/

আমাদের দেশে উবারের ন্যূনতম অফিসিয়াল ইনভল্ভমেন্ট আছে কিনা আমার জানা নেই । কারণ ঢাকা শহরের উবার নামের ট্যাক্সি গুলো ঠিক কিভাবে কার মাধ্যমে উবার রেজিস্ট্রেশন নিচ্ছে কারো জানা নেই । এবং এই রেজিস্ট্রেশন এর সময় ন্যাশনাল আইডি কার্ড আর ব্যাংক ডিটেইলস ও কার কাছে যাচ্ছে কারো জানা নেই । একজন ক্রেতা হিসাবে এটা জানার অধিকার আইন সম্মত । শুধু তাই নয় বাংলাদেশ ব্যাংক কিভাবে উবারের ভাড়া পরিশোধের প্রক্রিয়া অনুমোদন দিলেন তাও প্রশ্নের সম্মুখীন । কারণ যেখানে একজন বিদেশী শ্রমিক তার রেমিটেঞ্চের টাকা পাঠাতে এখনো পে -পাল ব্যবহার করতে পারে না সেখানে উবার কি করে টাকাকে রেমিট করছে ডলার একাউন্টে? ভাববার বিষয় ।

http://sharespost.com/insights/white-papers-insights/uber-the-ride-sharing-market-the-650-billion-question-non-member/

খুব বেশি দিন হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক মোটা অংকের টাকা গচ্চা দিয়েছে নিজেদের ডিজিটাল প্লাটফর্মের সিকিউরিটির কারণে । যেকোন ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করার আগে যাচাই বাছাই করে অনুমোদন দেয়া প্রয়োজন । কিন্তু অনুমোদনের মাপকাঠি যদি পার্শবর্তী দেশের অনুমতির উপর নির্ভর করে তবে ব্যাপারটা আরো ভয়াবহ । ঠিক কি কারণে উবার কলকাতা এর অফিসিয়াল উবার ঢাকার অপারেশন মদ্ধস্ততা করেন আমার জানা নেই ।গেলো বছর এমনটিই হয়েছে ।

ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য যে কোন ডিজিটাল প্লাটফর্ম অবস্যই জরুরি । এর মানে এই নয় আমি চাইলেই অনলাইনে মাদক বেচতে পারবো অথবা জঙ্গিবাদ প্রচার করতে পারবো । যদি উবার সঠিক রেজিস্ট্রেশন ছাড়া অনলাইনে এর কার্যক্রম চালাতে পারে তবে যে কেও অনলাইনে অসামাজিক কার্যক্রম চালাতে পারার কথা । কিছু দিন আগে সরকারের তত্ত্ব প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের বেশ কিছু পর্ন সাইট বন্ধ করে দিলেন । যেখানে এই সাইটের উদ্যোক্তা এবং ব্যাবহারকারী কেওই কিন্তু কোন অভিযোগ করেন নি । সরকার নিজের উদ্যোগে এই সব পর্ন সাইট বন্ধ করে দিলেন । কেন ? কারণ এটা অনুচিত বা তাত্ত্বিকভাবে সমর্থন যোগ্য কোন ব্যবসা নয়। তাহলে উবার এর সাইট বন্ধ করতে বিটিআরসি এর বাধা কোথায়?

খুব সম্ভবত ’৬৫ বিলিয়ন ডলারের উবার’ এই একটি শব্দের উচ্চারণে আমাদের সবার চোয়াল নিচের দিকে নেমে যায় । আসুন জানি সিলিকন ভেলির টেক জায়ান্টদের অ্যাসেট ভালুয়েশন নিয়ে আসল কাহিনী।

https://uberpeople.net/threads/uber-ipo-and-fake-valuations.41347/

আমেরিকার সিলিকন ভেলির কোম্পানি গুলোর বিরুদ্ধে ওভার ভালুয়েশন এর অভিযোগ অনেক আগের । এর কারণ এখানে একটা কোম্পানি কত টাকা ট্যাক্স দিচ্ছে তার উপর নির্ধারণ হয় অ্যাসেট ভালুয়েশন । অর্থাৎ উবার যদি ৬৫ বিলিয়ন ডলারের ট্যাক্স দাখিল করে তবে সবাই উবারের অ্যাসেট ৬৫ বিলিয়ন ডলারই ধরে নিবে । এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন উবার এতো বেশি ট্যাক্স দিয়ে নিচের ভালুয়েশন বাড়াবে ? অনেকটা আমাদের দেশের শেয়ার বাজারের মতো একটা ব্যাপার । টেক কোম্পানি গুলো ওয়াল স্ট্রিট শেয়ার মার্কেট নিজেদের শেয়ার ছাড়ার আগে এই ওভার ভালুয়েশন করে থাকে যাতে মার্কেট থেকে বেশি পরিমান ইনভেস্টমেন্ট তুলে আনতে পারে । এটা অনেকটা ওপেন সিক্রেট একটা ব্যাপার আমেরিকাতে । সম্প্রতি স্ন্যাপ চ্যাট বা ফেইসবুক সবাই এই ধরণের ওভার ভালুয়েশন করেছে । এই ভালুয়েশন কে বলা হয় উনিকরন ইনভেস্টমেন্ট ভালুয়েশন । যার আদতে সঠিক কোন পরিমাপের মাপকাঠি নেই ।

উপরের ইতিহাস টুকু এইজন্য বলা হলো যাতে সরকার বা উবার প্রেমীরা ৬৫ বিলিয়ন ডলার কোম্পানি এই শব্দটা বলার আগে একবার ভাবেন । যেহেতু উবার আমাদের দেশের কিছু না সুতারং হাজার বিলিয়ন ডলার হলেও আমার কিছু যায় আসে না । আমার শুধু দেখার বিষয় আমাদের সরকার বা বি আর টি এ কিভাবে উবারের মতো টেক জায়ান্টকে সামাল দিচ্ছে। সম্প্রতি সকারের উচ্চপর্যায়ের এক প্রতিনিধি দল ফেসবুককে বাংলাদেশের ন্যাশনাল আইডি কার্ড দিয়ে একাউন্ট ওপেন করতে অনুরোধ জানান। ঠিক কি কারণে ফেসবুক এই কাজটা করবে বাংলাদেশের জন্য এটা না ভেবেই অনুরোধটুকু করা হয় । তবে আমার ধারণা সরকার হয়তো ভেবেছে যেহেতু উবার আমাদের ন্যাশনাল আইডি গ্রহণ করছে ফেসবুকও হয়তো করবে। পুরো ব্যাপারটা আবার আমাদের ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলো নিয়ে ভ্রান্ত ধারণার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় । ফেসবুক সিলিকন ভেলি কোম্পানি যার বাংলাদেশে কোনো অফিস নেই। সুতারং ফেসবুকের বাংলাদেশের জন্য আলাদা সার্ভিসও নেই। যেখানে সার্ভিস নেই সেখানে এই রকম আবদার নিতান্তই হাস্যকর।

মাঝে মধ্যে সরকারের সাথে এই সব কোম্পানির যে সকল দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করতে যারা আসেন তাদের বেশির ভাগই ফ্রাঞ্চাইজি অথবা টেম্পোরারি এমপ্লয়মেন্ট এ অথবা গ্লোবাল ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের আওতায় থাকা ব্যক্তিবর্গ। গ্লোবাল ব্র্যান্ড হবার কারণে আমরা সবসময় এই সূক্ষ ব্যাপারগুলো নিয়ে চিন্তা করি না। তবে এখনকার বাংলাদেশ চিন্তা করতেই পারে। চিন্তা করা উচিত। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে ডিজিটাল গভর্নমেন্ট এর ধারণা আবশ্যিক।

নিজের স্বার্থ বিকিয়ে ব্র্যান্ড হবার মাঝে কোনো আনন্দ নেই । বরং নিজের ব্রান্ডকে গ্লোবালি তুলে ধরতে পারলেই সফলতা আগামী দিনের বাংলাদেশের ।

(উবার নিয়ে আমার আগের লেখার জন্য নিচের লিংক ক্লিক করুন)
বিআরটিএ বিজ্ঞপ্তি এবং ঢাকায় ‘উবার’ চলা না চলা