ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

শ্রদ্ধেয় লেখক, গবেষক  সৈয়দ আবুল মকসুদ একজন প্রথিত যশা বুদ্ধিজীবী, তিনি নিজেও চান বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটুক। তবে ভাস্কর্য ইস্যুতে তার বক্তব্য আমাকে ভীষণ ভাবে হতাশ করেছে। যেহেতু তিনি অপর কয়েকজন গুণী মানুষকে অযৌক্তিক ভাবে কটাক্ষ করে কথা বলেছেন, সেহেতু আমি তাঁর যৌক্তিক সমালোচনা করতেই পারি। ৩০ মে মঙ্গলবার ২০১৭-এর প্রথম আলোতে ‘ভাস্কর্য ইস্যুতে গ্রিক ট্র্যাজেডির উপাখ্যান’ শিরোনামে তাঁর একটি লেখা প্রকাশ হয়েছে।

31_BRAC_Migration+Media+Award_120417_0005

তিনি ২৭ মে, ২০১৭-এর সকালের খবরের একটি উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তা হলো এরকম- ‘চিত্রশিল্পী হাশেম খান সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের সামনে যে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল, সেটি নকল। তিনিই তো পরিষ্কার করে দিয়েছেন, ঢাকা শহরে এমন অনেক ভাস্কর্য রয়েছে, যেগুলো অপরিকল্পিত, রুচিহীনতার পরিচয়। বাংলা একাডেমির সামনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, উদয়ন স্কুলের সামনে যা করা হয়েছে, তা আদৌ কোনো ভাস্কর্য নয়। এগুলো ভাস্কর্যের নামে অনাচার। এগুলো বানিয়ে ঢাকা শহরকে নোংরা করা হচ্ছে। এসব সরিয়ে ফেলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ভাস্কর্য স্থাপন করতে হবে। ভাস্কর্যের নামে এসব ধোঁকাবাজি বন্ধ করা দরকার।’

এখন প্রশ্ন হছে, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশে শিল্প সংস্কৃতির তিনি গুরুজন, এতোদিন তাঁর চোখে পড়েনি বিষয়টি? সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হলো হেফাজতে ইসলামকে? তাঁর মানে কি হাশেম খানের চেয়ে হেফাজতে ইসলামের শিল্পজ্ঞান বেশি? বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, উদয়ন স্কুলের সামনে যা করা হয়েছে তা আদৌ নাকি কোন ভাস্কর্য নয়। শ্রদ্ধেয় হাশেম খান কি এতদিন এগুলো দেখেননি? এতো দিন পরে এসে হেফাজতের চোখে শিল্প দেখছেন কেন? একই রকম কথা শ্রদ্ধেয় সৈয়দ আবুল মকসুদকে নাকি বলেছেন আরও কোনো কোনো প্রখ্যাত শিল্পী।

জনাব আবুল মকসুদ লিখেছেন, ‘কোনো সরকারি স্থাপনায় ভাস্কর্য স্থাপনের সিদ্ধান্ত হলে তার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি থাকা আবশ্যক। তাতে থাকবে খ্যাতিমান শিল্পীদের একটি পরামর্শ পরিষদ। ভাস্কর্যের জন্য টেন্ডার হবে যে রকম দরপত্র আহ্বান করা হয় বিভিন্ন কাজের জন্য। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পরামর্শ পরিষদের অনুমোদন নিয়ে কাজ করানো উচিত। সেই কাজের পরে যদি কোনো তৌহিদী বা তালেবানি কেউ তলোয়ার উঁচিয়ে প্রতিবাদ করতে আসে, তাহলে তা প্রতিহত করবে দেশের মানুষ। গ্রিক দেবী তৈরি ও স্থাপনের সিদ্ধান্ত কবে হলো, কোন কর্মকর্তা তাঁকে ওয়ার্ক অর্ডার দিলেন কত তারিখে, স্থাপনে ব্যয় হয়েছে কত এবং শিল্পী কত টাকা পারিতোষিক পেয়েছেন—এ সবকিছুই পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনে আসে নাই।

এখানে আমার সেই একই প্রশ্ন, যখন একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি শিল্প মান বিচার নয়, কেবল সাম্প্রদায়িক কারণ দেখিয়ে আন্দোলনে নামে এবং তাদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে তা অপসারণ করা হলো, তখন কাজের সচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিল? বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা এতোটাই ঘুম কাতুরে?

জনাব আবুল মকসুদ লিখেছেন, ‘গত সাড়ে আট বছরে খালেদা জিয়ার বিএনপি আন্দোলন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাবমূর্তির যতটা না ক্ষতি করেছে, এই মূর্তি সরানোর কথা হওয়ার পর থেকে তাঁর অনুগ্রহধন্য বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীরা তার চেয়ে বহুগুণ ক্ষতি করেছেন। গত কয়েক দিনে তাঁরা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তা মির্জা আলমগীর, গয়েশ্বর রায় ও রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর।’

১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি পরদিন যে বিবৃতি দিয়েছেন তারই সমালোচনা করেছেন তিনি। এই সমালোচনায় যে শব্দগুলো তিনি ব্যবহার করেছেন তা আমার কাছে ভীষণ অশালীন মনে হয়েছে। শব্দগুলোর  অর্থ এই দাঁড়ায় যে, বাংলাদেশের লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পীরা দেশের সরকার প্রধানের করুণায় বেঁচে আছেন এই সব কবি, লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীরা করুণার দান গ্রহণ করেও অকৃতজ্ঞের মত তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। যে অন্যায় কাজ তিনি করেননি, উপরন্তু তোষামোদির চরম নগ্নতা প্রদর্শণ করে করুণা গ্রহণের বিনিময় মূল্য পরিশোধ করেছেন।

তিনি লিখেছেন, দেশব্রতীদের কিছু কিছু বক্তব্য আমার অল্প বুদ্ধিতে বোধগম্য নয়। তাঁদের কেউ কেউ বলেন, এই ভাস্কর্য অপসারণ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। স্বাধীনতা কি এতই ঠুনকো? এক ভাস্কর্য বা মূর্তি অপসারণেই তা চলে যাবে? আমরা কাকে বড় করছি আর কাকে ছোট করছি?

একথা থেকে আমি এই শিক্ষা পেয়েছি যে দেশের সামগ্রীক স্বার্থর চেয়ে যখন কোন বুদ্ধিজীবীর কাছে ব্যক্তি স্বার্থ প্রধান হয়ে দাড়াঁয় তখন তাঁর বুদ্ধি লোপ পেতেই পারে। স্বাধীনতা ঠুনকো না কি সেই বোধ যদি তাঁর এখনও অবশিষ্ট থাকত তবে তিনি ৭১ সালের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশের পার্থক্য বুঝতে পারতেন।

ড. আনিসুজ্জামান, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, ডঃ সন্‌জিদা খাতুন এমন কি জনাব আবুল মকসুদ, তাঁরা প্রত্যেকে আমাদের কাছে অনুসরণীয় এবং পরম শ্রদ্ধার। নতুন প্রজন্মকে নির্বোধ ভাবা ঠিক না। প্রবীণদের মনে রাখা দরকার প্রবীণদের চেয়ে নবীনদের চেতনা অনেক মজবুত থাকে। তাই বলি এই বয়সে এসে অনেক হারিয়ে পাওয়া প্রিয় মাতৃভূমির সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করা ঠিক না। যে মানুষগুলির সমালোচনা তিনি করেছেন তারাই মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা বলুন আর আজকের বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল গুলো বলুন তাদের পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন। ভাস্কর্য অপসারণ নিয়ে তাদের অবস্থান এবং এর ফলাফল বোঝার মত সততা এবং তাঁর ভাষায় যদি বলি অল্প বুদ্ধিতে বোধগম্য হবার কথা নয়। এই মানুষগুলোই প্রকৃত মুক্তি যুদ্ধের পক্ষের শক্তি। এঁরাই ক্ষমতা কেন্দ্রের বাইরে থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ছায়া দিয়ে রাখেন। আর যারা ধান্দাবাজ তাঁরা ঘর পুড়লেই আলু নিয়ে দৌড়ায় পোড়া দেবার জন্য।