ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

বর্তমান সাহিত্য ও সংস্কৃতি সমাজে মাদকের মধ্যে সেলিব্রিটি দুইটা মাদক হল তামাক আর গাঁজা। ব্রিটিশরা আসার আগে তামাকের নামগন্ধ কিছুই ছিল না। গাঁজার একচ্ছত্রবাদে গমগম করত উপমহাদেশ। ভারতবর্ষের আদি উপাখ্যানগুলোতেও গাঁজার ধর্মীয় মূল্য অফেরতযোগ্য। ব্রিটিশরা ভারতে এসে নেশার রাজ্যেও হাত লাগিয়ে রাজা হিসেবে গাঁজার রিপ্লেসমেন্টে তামাককে বসালো। তাদের শাসনামলে বেশ কিছু দশক ভারতে গাঁজার চাষ নিষিদ্ধ ছিল। কারণ গাঁজার তুলনায় তামাক-বাণিজ্যে মুনাফা বেশি। স্বাস্থ্যের দিক থেকেও তামাক সাইলেন্ট কিলার। আনন্দ ক্ষণস্থায়ী, অশান্তি দীর্ঘস্থায়ী।

ভারতের অনেক প্রদেশে আগে গাঁজাকে ভাং বা অন্য কোন শরবতের সাথে মিশিয়ে খেত।ধোঁয়া হিসেবে না গ্রহণ করায় হৃদপিণ্ড ও ফুসফুসের ক্ষতি কম সাধিত হতো। মেডিকেল সায়েন্সে দেখা যায়, কালেভদ্রে কম মাত্রার গঞ্জিকাসেবনে ক্ষতির পরিমাণ অন্যান্য নেশার তুলনায় কম। গাঁজাকে আয়ুর্বেদেও স্থান দেওয়া হয়েছে।কারণ মেডিসিন শিল্পের বিপ্লবের আগে গাঁজার আয়ুর্বেদীয় গুণাগুণ মানুষের রোগমুক্তিতে আশার আলো জাগাতো।

বিশেষ উৎসবে গাঁজা নেওয়ার প্রবণতা ছিল গড়পড়তায়। অথচ তামাকের প্রচলনের পর সকাল-দুপুর ইচ্ছামত একটু একটু করে এক মহাদেশ নিকোটিন শরীরে গাঁথতে থাকে; মাঝখানে মুনাফা লুটে কোম্পানির পুঁজিপতিরা। অবশ্য নিকোটিনের রাজ্যে আফিমও ভাগ বসাত, যদিও সেভাবে নয়। দেশি মদের প্রচলনও ভাল পরিমাণেই ছিল, কিন্তু ক্ষতির সিরিয়ালে গাঁজার অবস্থান একটু নিচে থাকায় মানুষের স্বাস্থগত ঝুঁকি আপেক্ষিক ভাবে লাঘব হত।

ব্রিটিশরা হারিয়ে গেল ইতিহাসের পাতায়, বিশ্বব্যাপী রেখে গেলো তাদের সন্তান তামাককে। এই সন্তানের দাপট ভারতবর্ষে আজো অক্ষুণ্ণ।সে হিসেবে গাঁজা ছিল উপমহাদেশের বৈধ সন্তান। পূর্বে পাবলিকলি গাঁজার চাষ ব্যাপকভাবে হলেও সেই তুলনায় এখন তার তেমনই হয়না; বরং সরকারীভাবে নিষিদ্ধ। যেহেতু পৃথিবী থেকে নেশার বিলুপ্তি ঘটানো অলীক কল্পনাপ্রায়, তাই অপেক্ষাকৃত লঘু ক্ষতির চিন্তা করে গাঁজাকে প্রেফারেন্স দেওয়া যেতে পারে হয়তো। লাভক্ষতির সমীকরণের পাল্লায় প্রতিবছর ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যাবাকো কোম্পানি শুধুমাত্র বাংলাদেশ থেকেই হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা নিচ্ছে।

আমরা বরং আমাদের আপাত ‘নিষিদ্ধ’ আদিশিল্পের পুনঃরুত্থান ঘটিয়ে বৈদেশিক কোম্পানির হাতে সহস্রকোটি টাকা বিলিয়ে দেওয়া থেকে বাঁচতে পারি।তাছাড়া নিজের ঘরের তৈরী খারাপ জিনিসেও বাইরের খারাপ থেকে কম দোষ থাকে।

একটি সমাজের মেইন রুট সাহিত্য ও সংস্কৃতি। আজকালকার তরুণ সমাজে নেশার প্রাধান্য আক্ষরিকভাবেই বিরাজ করছে। বিশ্বায়নের অপকারীতা এবং সমাজের পরিবর্তবশীলতার নীতিকে মেইনস্ট্রিম ধরে মেনে নিতে হবে,নেশার নির্ভরশীলতাকে পুরোপুরি সমাজ থেকে হটানো দুঃসাধ্য। তাছাড়া বর্তমান কবি, লেখক, ব্যান্ডদলসহ সমাজের তারুণ্যনির্ভর উচ্চমার্গীয় চিন্তাশীল ক্ষেত্রগুলোতে নেশাদ্রব্যের বিচরণ চোখে পড়ার মত।

এক্ষেত্রে তরুণসমাজে দেশীয় নেশা গাঁজার প্রাধান্য লাভ সংস্কৃতির তীব্র অন্ধকারে ভেন্টিলেটরের ছিদ্র ঘেঁষা একফোঁটা ভোরের হলুদে আলোর মতন। এই স্বাপেক্ষে সাহিত্যে গাঁজার অবস্থান আগামী কয়েকদশক পর্যন্ত বিরাজ করবে স্বাভাবিকভাবেই।

নেশার বিলুপ্তি ঘটানো দুঃসাধ্য-ধরে নিয়েই গাঁজার স্বাস্থ্যগত আপাত কম ক্ষতির ব্যাপার বিবেচনা করে তাই পদক্ষেপ নেওয়া যেতেই পারে! আর নেশাগতভাবে আমাদের নবীন শিল্পসাহিত্যের ধারকরা এবং গোটা তরুণসমাজের বর্তমান অবস্থা চিন্তা করে পুরোপুরি মাদকবর্জনের চেষ্টাকরণ অলীকতা মনে হয়। পূণ্য লাভের থেকে পাপ ত্যাগ করাটা অধিক ফলপ্রসূ বিধায় নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করাটা সমীচীন হবে।