ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

চেম্বারে যাওয়ার সুবাদে প্রতিদিন দুই বার করে গুলিস্থান এর চিরচেনা রূপ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়। চেম্বারে যাওয়ার সময় আর ফেরার সময়। গতকাল (১২ ই মার্চ, ২০১৭) চেম্বার থেকে রাত ৮ টার দিকে বাসায় ফেরার জন্য গুলিস্থান থেকে লেগুনায় চেপে বসলাম। দেখলাম লেগুনার কিছু যাত্রী বিষন্ন মনে কোন একটি বিষয়ে আলাপ করছেন। তারাও আমার মত বাসায় ফেরার জন্য গুলিস্থান থেকে লেগুনায় উঠেছেন। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। একজন মাঝ বয়সী ভদ্র লোক  ক্ষোভের সাথে বলে উঠলেন- মহিলাটি মরবে কেন? যাত্রী ছাউনি থাকলে তিনি তো যাত্রী ছাউনিতে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে পারতেন। অথবা তিনি ফুটপাত ঘেষে দাড়াতে পারতেন। অথবা ফুটপাতে দাড়াতে পারতেন।  কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। কারণ সেখানে কোন যাত্রী ছাউনি নেই। রিককশাওলারা যাত্রী দের দাড়ানোর যায়গা দখল করে তাদের রিকশা পার্ক  করে রেখেছে। হকার রা অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করে রেখেছে। আজ যদি যাত্রী ছাউনি থাকত বা ফুটপাত হকার মুক্ত থাকত তাহলে হয়তো মহিলা টি বেচে থাকত। আরেকজন বলে উঠলেন- যার যখন মৃত্যু লেখা রয়েছে তার তখন মৃত্যু হবেই। যাত্রী ছাউনী থাকলেও হবে না থাকলেও হবে। অন্য আর এক যুবক লোক বললেন- আমি ভাবছি যে জায়গায় দুঘর্টনাটি ঘটেছে সেখানে আসলে তো দুঘর্টনা ঘটার কোন সুযোগই নেই। কারণ মাযারের সামনে সব গাড়ি দাড়ায়। রাস্তায় এত ভিড় থাকে যে কোন গাড়িই দ্রুত যেতে পারে না। এই সমস্ত ড্রাইভারের চৌদ্দবার করে ফাঁসি হওয়া উচিত।

পাশের একজনের কাছে জানতে চাইলাম কি হয়েছে। লোকটি বলল- কিছুক্ষন আগে গুলিস্থান মাযারের ওখানে একজন মহিলা বাস চাপায় মারা গেছে। মহিলাটি কোথাও যাওয়ার জন্য বাসের অপেক্ষা করছিল। শুনে মনটা ভিষন খারাপ হয়ে গেল। যে মানুষটি কিছুক্ষণ আগেও পৃথিবীর আলো বাতাসের ভাগিদার ছিল সে আর এই পৃথিবীতে নেই। এমনিভাবে প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই কমপক্ষে ৮-১০ টা মৃতুর খবর পায় যেগুলি সড়ক দুঘর্টনার কারনে হয়েছে। কখনো কখনো এমনও হ্নদয় বিদারক ঘটনার খবর পাই যে সড়ক দুঘর্টনায় একই পরিবারের সবাই নিহত হয়েছে।

আসলে এর জন্য মূলত দায়ী কে? বা কারা? খুব সহজেই হয়তো আমরা বলব এর জন্য দায়ী অযোগ্য আর বেপরোয়া চালক। চালক তো অবশ্যই দায়ী। তবে যদি আমরা একটু গভীর ভাবে চিন্তা করি তাহলে দেখব যে, এখানে শুধুমাত্র চালককে দায়ী করে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা ঠিক হবেনা। একজন চালক  ৫০ থেকে ১০০ জন ব্যক্তির জীবনের দায়িত্ব নিয়ে গাড়ি চালায়। সেই চালককে তো অবশ্যই দক্ষ হতে হবে, সুস্থ হতে হবে, শান্ত হতে হবে এবং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তাকে  আইনের সকল বিধান মেনেই রাস্তায় গাড়ি চালাতে হবে। এক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হলেই তাকে অনায়াসেই দায়ী করা যায়। কোন এক যাত্রীর মুখে শুনেছিলাম উন্নত বিশ্বে গাড়ি চালানোর অনুমিত মানে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া আর বাংলাদেশে বিসিএস পরীক্ষায় কৃতকার্য্য হওয়া সমান কথা। তার মানে উন্নত বিশ্বে গাড়ী চালনার অনুমতি পাওয়া কত কঠিন একটি বিষয়। অথচ বাংলাদেশে যাকে তাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে আইনের বিধানাবলী যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই যাকে তাকে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। তাহলে ঐ অযোগ্য লোক যে টাকা দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেল সে যদি গাড়ি চালাতে গিয়ে দুঘর্টনা ঘটিয়ে কারো প্রাণ নেয় তাহলে ঐ প্রাণ নেওয়ার পিছনে যদি শুধুমাত্র চালকের অদ্ক্ষতাকে দায়ী করা হয় তাহলে এক্ষেত্রে আমি মনে করি তাকে যে লাইসেন্স ইস্যু করেছিল তাকেও সমভাবে দায়ী ভাবা উচিত।

যদি কোন গাড়ির ফিটনেস না থাকার কারনে দুঘর্টনার শিকার হয় তাহলে ঐ গাড়ির মালিক কে এবং একটি গাড়ির ফিটনেস ছাড়া চলছে কিনা এটা দেখার দায়িত্ব যে কর্মকতা বা কর্তৃপক্ষের উপর বর্তায় তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে। অনেকেই বলতে পারেন যে, রাস্তায় চলাচলরত লক্ষ লক্ষ গাড়ীর ফিটনেস পরীক্ষা করা কর্তৃপক্ষের কাছে এক রকম অসম্ভব। আমি বলি কি আপনি দায়িত্ব যখন নিবেন সেটা অবশ্যই আপনাকেই পালন করতে হবে। কোন অজুহাত চলবে না। তাছাড়া দেশের মানুষের প্রতি ভালবাসা থাকলে, নিজের দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন হলে অসম্ভব কিছুই নয়।

অনেক সময় দেখেছি রাস্তায় যে সকল আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে একটি গাড়ির ফিটনেস আছে কিনা, চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কিনা, অতিরিক্ত মালামাল বা যাত্রী বোঝাই কিনা, গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা বা চালক আইনগত বিধান মান্য করে গাড়ি চালাচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব রয়েছে, সেই সকল দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে ঘুষ নিয়ে তাদের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করেন না। কারও ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে, বা তার গাড়ির কাগজপত্র না থাকলে ঘুষের বিনিময়ে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাহলে সেই গাড়ি যদি দুঘর্টনার কবলে পড়ে, দায়িত্বে অবহেলা করার কারনে এসব আইনশৃংখলা রক্ষাকারী সদস্যদের বিরুদ্ধে কি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না?

তাছাড়া যদি কোন সৎ পুলিশ অফিসার তার দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠাবান হয়ে ঐ সকল গাড়ি বা ড্রাইভারের বিরুদ্ধে মামলা করেন তাহলে দেখা যায় ঐ সকল চালক বা তার গাড়ির উল্লেখযোগ্য কোন সংশোধন হয় না । কারণ তাদের বিরুদ্ধে যে মামলা দেওয়া হয় তার জরিমানার পরিমান এত কম যে, জরিমানার ঐ টাকা তাদের উপর কোন প্রভাব ফেলে না। এজন্য আইনটি সংশোধন করে জরিমানার পরিমান বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। যাতে করে চালক বা মালিক বাধ্য হয় তাদের গাড়ি ঠিক করতে বা ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে।

আবার অনেক সময় দেখা যায়, আমরা যারা পথচারী বা আমজনতা আছি, তারা সময় বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে যত্রতত্র রাস্তা পার হতে চাই। অসচেতনভাবে গাড়ির সামনে চলে আসি। যেখানে ফুটওভার ব্রীজ আছে সেখানে ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হই না। ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করাকে ঝামেলা মনে করি । এর ফলেও অনেক দুঘর্টনা ঘটে। এজন্য প্রয়োজন সাধারন মানুষের সচেতন হওয়া। দুঘর্টনা হলেই শুধুমাত্র চালককে দায়ী করে তাকে গণপিটুনি দেওয়া ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে আমরা নিজেরাও দায়ী থাকি সড়ক দুঘর্টনার জন্য। পরিশেষে বলতে চাই উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে না চাপিয়ে, আমাদের সকলকে আমাদরে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তাহলে হয়তো সড়কে  মৃত্যুর মিছিল কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

slide