ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

কথায় আছে মানুষ স্বর্গে যেতে চায় কিন্তু মরতে চায় না। না মরলে যে স্বর্গে যাওয়া যায় না তা আমরা সবাই জানি। তবুও আমরা মরতে চাই না।

“মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই”- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয় একটি কবিতার লাইন। এখানেও ফুটে উঠেছে মানবজাতির বেঁচে থাকার আকুলতা। অর্থাৎ সুখে থাকি আর দুঃখে থাকি আমরা বাঁচতে চাই। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশের আইনেই মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। জীবনটা আপনার, তবুও আপনি চাইলেই নিজেকে হত্যা করতে পারেন না। দেশের প্রচলিত আইনে এমনকি ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকেও এটা বেআইনী। আপনি নিজেকে হত্যা করতে গিয়ে যদি বেঁচে যান তাহলে আপনাকে দেশের প্রচলিত আইন মোতাবেক শাস্তি পেতে হবে। আর যদি মারা যান তাহলে আপনার অপরাধও মারা যাবে। আইনাঙ্গনে একটি বিশেষ বিধান মেনে চলা হয়, তা হলো একজন অপরাধীর মৃত্যুর সাথে সাথে তার অপরাধেরও মৃত্যু হয়। কারণ মৃত ব্যক্তির বিচার করা সম্ভব নয়।

একজন মানুষের হত্যাকান্ড দু’ভাবে হতে পারে। এক, একজন অপরাধীকে অপরাধের বিবেচনায় বিচার পরবর্তী মৃত্যুদন্ডের সাজা দিয়ে তা কার্যকর করা হয়। এটা এক ধরনের হত্যাকান্ড।  সে ক্ষেত্রে এটিকে বিচারিক হত্যাকান্ড বলা হয়। বিচারিক হত্যাকান্ড যে কোন দেশের প্রচলিত আইন ও ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা স্বীকৃত ও সমর্থিত। যদিও বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে পৃথিবীর কোন কোন দেশে মৃত্যুদন্ডের সাজা রহিত করা হয়েছে।

দুই, অন্য যে কোন হত্যাকান্ড বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে যে হত্যাকান্ড সংঘঠিত হয় সেটা কোন বিচার ছাড়াই হয়। সে হত্যাকান্ড কোন সাধারণ ব্যক্তি কর্তৃক হোক, সন্ত্রাসী কর্তৃক হোক বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক হোক। তবে আমরা এখানে বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড বলতে ক্রসফায়ারকে বুঝবো। বিচার বর্হিভুত হত্যাকান্ড যে কোন দেশের প্রচলিত আইন ও ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা অস্বীকৃত ও অসমর্থিত। কারণ একজন মানুষ যদি কোন অপরাধ করে থাকে তাহলে প্রকৃত বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে বিচার করে তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সন্দেহাতীত ভাবে  প্রমাণ স্বাপেক্ষে তাকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হত্যা করতে হবে। আর এজন্যই বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই বিচার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আমাদের সংবিধানের ৩১ নং ধারায় বলা আছে যে, আইন অনুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।

যদিও বাংলাদেশের প্রচলিত আইন মোতাবেক বিচার বর্হিভুত হত্যাকান্ড শাস্তি যোগ্য অপরাধ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড লাগামহীনভাবে দিন দিন বেড়েই চলেছে। এসব হত্যাকান্ড এমন সব ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত হচ্ছে যাদের হাতে সাধারণ মানুষের জান ও মালের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থ্যাৎ ব্যাপারটি যেন শিয়ালের কাছে মুরগী পাহারা দেওয়ার দায়িত্বের মত। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ যে নামেই ডাকা হোক না কেন- কাহিনী সব একই, ফলাফলও একই। বাংলাদেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার বন্দুক যুদ্ধের গল্প শিশু কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবারই মুখস্ত হয়ে গেছে।

তবে হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়। মানে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন অপরাধীকে হত্যা করা ছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে বিকল্প থাকে না। সেক্ষেত্রে অবশ্যই ঐ হত্যাকান্ডের যথাযথ তদন্ত হতে হবে। আইন এরও সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কখন আপনি বিচার বর্হিভুতভাবে হত্যা করলে আপনাকে শাস্তি পেতে হবে না। এ বিষয়ে দন্ডবিধির ধারা ৯৭–এ মনুষ্য দেহ ক্ষুন্নকারী যে কোন অপরাধের বিরুদ্ধে তার স্বীয় দেহ ও অন্য যে কোন ব্যক্তির দেহের প্রতিরক্ষার অধিকার দেয়া থাকলেও সে অধিকারের ব্যাপ্তি এতটুকু বিস্তৃত নয় যে, এ যাবৎকাল ক্রসফায়ারের নামে যে অসংখ্য হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়েছে তাতে একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তিতে ক্রসফায়ারের যৌক্তিকতা ও গ্রহণযোগ্যতার সৃষ্টি হয়।

সংবিধানের ৩৩(২) অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৬১ তে সুষ্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, গ্রেপ্তারকৃত একজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘন্টার মধ্যে যাত্রার সময় ব্যতিরেকে ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে হাজির করতে হবে। কিন্তু র‌্যাব বা পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার পরবর্তী যে সব ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে সে বিষয়ে নিহত ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজন, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় সংবিধানের ৩৩(২) অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৬১ এর বাধ্যবাধকতা অনুসরণ না করেই অপরাধীদের এ দু’টি বাহিনী গ্রেপ্তারের সঠিক দিন–তারিখ গোপন রেখে ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা সংগঠনের প্রয়াস নিয়েছে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, ক্রসফায়ারের এক ধরনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আছে। আপনি যে কোনো সময় জনমত যাচাই করলে দেখবেন, ক্রসফায়ারের পক্ষে ভোট বেশি। আর এই জনমতের জোরে সবসময়ই সরকার এই অস্ত্রটির বহুল অপব্যবহার করে আসছে। বিএনপি আমলে প্রথমে অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে এবং পরে র‌্যাবের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের সূচনা। শুরুতেই এটি তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। ফলে এর বিপক্ষে কোনো ভয়েস ছিল না। তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ক্রসফায়ারের বিপক্ষে বলতে চাইলে দলের নেতারা তাকে বোঝান, ক্রসফায়ার খুব জনপ্রিয়, এর বিরুদ্ধে বলা ঠিক হবে না। কিন্তু শেখ হাসিনা কারো কথায় কান দেননি। তিনি ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে বলেছেন। আমরা অপেক্ষায় ছিলাম, কোনো একদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বন্ধ হবে ক্রসফায়ার। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো আওয়ামী লীগ আমলেও ক্রসফায়ার বন্ধ হয়নি। আমাদের দেশের প্রতিটি সরকার ভুলে যাচ্ছেন ক্রসফায়ার বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড কোন সমাধান নয়। যদি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড তাকে বৈধতাই দেওয়া হয় তাহলে দেশে হাজার হাজার কোটি ব্যয় করে বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে লাভ কি?

ক্রসফায়ারের কোন বিচার হয়না বলেই আজ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যাকে তাকে তুলে এনে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে নিরীহ জনতার কাছ থেকে। বাধ্য করছে মিথ্যা স্বাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। হুমকি দিয়ে সত্য বলা থেকে চুপ করিয়ে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। জনগণ প্রতিবাদ করতে ভয় পাচ্ছে। তাই একটি সুন্দর বাংলা গড়তে ক্রসফায়ার নামক ব্যাধি থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে যে টা একমাত্র সরকারের সদিচ্ছা থাকলেই সম্ভব।