ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

সংস্কৃতি কী?

মানুষের বিশ্বাস ,আচারআচরন এবং জ্ঞানের একটি সমন্বিত কাঠামোকে সংস্কৃতি বলা যায় ভাষা,সাহিত্য,ধারনা,র্ম ওবিশ্বাস ,রীতিনীতি,সামাজিক মুল্যবোধ ও নিয়মকানুন, উৎসব, শিল্পকর্ম এবং দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার হয় এমন জিনিসপত্র বা হাতিয়ার ইত্যাদি সব কিছু নিয়েই সংস্কৃতি। এমনকি সমাজের সাথে সম্পৃক্ত মানুষের শিক্ষা, সামর্থ যে সব মানুষ আয়ক্ত করে কিংবা র্চা করে সেই সবই সংস্কৃতি।সর্বপরি সংস্কৃতি হচেছ মনুষ্যত্বেরই নির্যাস।বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে বিভিন্ন ভাবে এই সংস্কৃতিকে বুঝানো যায়।যেমন মানুষের প্রতি মানুষের জীবনবোধ বিনির্মানের কলাকৌশল , মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানান আচার আচরনকে প্রকাশের একটি শৈল্পিক প্রয়াস সংস্কৃতি।সামাজিক ক্ষেএে একটি সমাজের স্বচ্ছ র্পন। যে র্পনের দিকে তাকালে সেই সমাজের মানুষের জীবন আচার ,জীবনবোধ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।সমাজ বিজ্ঞানের মতে সংস্কৃতির র্থ প্রয়োগ নানান বিধ হয়ে থাকে এমনকি সংস্কৃতির প্রকৃত মান সম্পন্ন সংজ্ঞা নিরুপন খুব কঠিন।তবে প্রচীন সভ্যতার ইতিহাস প্রর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমেই প্রতিটি সভ্যতা এগিয়ে গিয়েছে এবং উন্নত জাতির জন্ম হয়েছে।তাই বলতে হবে সংস্কৃতির উন্নত রুপই হল সভ্যতা।এই সভ্যতাই কোন জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়।সুতারাং সভ্যতা বা আধুনিকতা যাই হোক না কেন সংস্কৃতিই একটি সমাজের পূণ্র্যঙ্গ র্পন যার মাধ্যমে সমাজের সম্পূর্ণ চেহারাটা দেখা যায়

সংস্কৃতি   ধর্ম

বাঙালি সংস্কৃতি একটি আর বাঙালি ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন। তাহলে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে আমরা সকলে (বাঙালিরা) একটিকে বেছে নিব নাকি ভিন্ন ভিন্ন বেচে নিব। স্বাভাবিকভাবে একটিকে বেছে নিতে হবে। আর সেটি হল বাঙালি সংস্কৃতি। সংস্কৃতি ও ধর্মের মধ্যে সম্পর্কের আলোচনার প্রথম দিকে আমাদের এই উপমহাদেশের বিগত কয়েক শতক ধরে যে সংস্কৃতি পূর্ণাঙ্গ চর্চা হয়ে এসেছে সেই সংস্কৃতির সাথে আপোষ ও বিরুদ্ধতার একটি নমুনা উপস্থাপন করলাম। এটি কোন নতুন বিষয় নয়। যুগ যুগ ধরে ধর্ম নিয়ে যে অতিরঞ্জিত বারাবারি, ধর্মের কুসংস্কার ও ধর্মীয় আধিপত্যবাদের যে প্রভাব আমাদের জনজীবনকে আক্রান্ত করেছে সেগুলো থেকে মুক্তির একমাত্র পথই হচ্ছে সংস্কৃতির বিকাশ ও চর্চা। কারণ সংস্কৃতি নিয়ে এই পর্যন্ত যারাই লেখালেখিতে মেতেছিলেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবু জাফর শামসুদ্দীন, আহম্মদ শরীফ, আবুল কাশেম ফজললু হক, যতিন সরকার, বদরুদ্দীন উমর সহ সকলেই শিকার কারেছেন যে-ধার্মিকের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে শাস্তির ভয় আর পুস্কারের লোভ। সংস্কৃতিবান মানুষের জীবনে ও সবের বালাই নেই। তারা সব কিছুই করে ভালবাসার তাগিদে। সত্যকে ভালবাসা, সৌন্দর্যকে ভালবাসা, ভালবাসাকে ভালবাসা, বিনা লাভের আশায় ভালবাসা -এর নাম সংস্কৃতি। তাই ধার্মিকদের পুরস্কারটি যেখানে বহু দূরে থাকে, সংস্কৃতিবান মানুষ সেখানে তার পুরস্কারটি পায় হাতে হাতে, কেননা কাজটি তার ভালবাসার অভিব্যক্তি বলে তার আনন্দ, আর আনন্দই তার পুরস্কার। সে তার নিজের স্বর্গটি নিজেই সৃষ্টি করে নেয়। বাইরের স্বার্গের জন্য তাকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে হয় না। সুতরাং বোঝা যায় যে সংস্কৃতি ও ধর্মের  সম্পর্কটি সম্পূর্ণভাবে বিপরীত বিশেষ করে সামাজিক দৃষ্টিকোন থেকে। যদিও দুটির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এক ও অভিন্ন শুধুমাত্র চর্চার পথ দুইটি ভিন্ন ভিন্ন।

ধর্মেরও ধর্মীয় সংস্কৃতি রয়েছে কিন্তু এই ধর্মীয় সংস্কৃতি আমাদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির সাথে মিল খাবে না। বাঙালি সংস্কৃতি আমাদের জাতিগত সংস্কৃতি কিন্তু ধর্মীয় সংস্কৃতি ভিন দেশী। আমরা বাঙালি মুসলমানেরা ইসলামী সংস্কৃতিকে গ্রহন বা চর্চায় জড়াতে পারি না। কিংবা বাঙালি,হিন্দু,বৌদ্দ্ব,খৃষ্টানরাও তাদের নিজস্ব ধর্মীয় সংস্কৃতিকে্ চর্চার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতে পারে না বাঙালি সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে। সামগ্রিক ভাবে সংস্কৃতিই হতে পারে বাঙালির শুদ্ধতম জীবনের একক অবলম্বন। প্রতিটি ধর্মই পৃথক ভাবে শুদ্ধতার চর্চা করে, কিন্তু সামগ্রিকতার ক্ষেত্রে একক সিধ্যান্তে আসতে পারে না। কিন্তু সকল বাঙালির ক্ষেত্রে একক সংস্কৃতি এই স্থম্ভে এক শুদ্ধতার চর্চায় এক হয়ে যেতে পারে। তাই বলে ধর্মকে উপেক্ষা করার উপায় নাই। ধর্মের মূল বিষয় ধর্মীয় সংস্কৃতি নয়। ধর্মের মূল বিষয় হচ্ছে মানুষ ও মানুষত্বের ইহলোক ও পরলৌকিক শান্তি ও আনন্দ লাভ। তাই নিজ নিজ ধর্ম চর্চা কখনও একক বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তবে বাঙালি সংস্কৃতি ও ধর্মের থেকে পৃথক কোন বিষয় নয়। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিতে ধর্মের প্রভাব রয়েছে। যাকে বলা যায়- ধর্ম, ভাষা, লোকাচার – সব কিছুর সমন্নয়ে আমাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, বাঙালি সংস্কৃতি। আমাদের বাংলা ভাষায় যেমন বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণ ঘটেছে ঠিক তেমনি ভাবে বাঙালি সংস্কৃতিতে বিভিন্ন ধর্মের সংমিশ্রণ ঘটেছে। ধর্মের সাথে সংস্কৃতির একটা বিশেষ যোগাযোগ বা সম্পর্ক রয়েছে বলেই সংস্কৃতিতে ধর্মের প্রভাব লক্ষনীয়। আমাদের এই উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ধর্ম বিভিন্ন সময়ে বাঙালিদের সমাজ ও সংস্কৃতি বিশেষ করে ভাষা ও সংস্কৃতিতে মিশে গিয়ে নিজস্ব একটা স্বাকীয়তা লাভ করেছে।যেমন উদাহরণ হিসাবে বলা যায়- মুসলমানদের ঈদ উৎসব ওয়াজ-মাহফিল, মহরম ইত্যাদ। হিন্দুদের দূর্গাপূজা, স্বরস্বতী পূজা, বৌদ্ধদের বৌদ্ধ পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা, খৃষ্টানদের বড় দিনের উৎসব ইত্যাদি। সুতরাং একটি জাতিতে ধর্ম বহু থাকতে পারে কিন্তু জাতিগত ভাবে সংস্কৃতি এক। সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলে জাতি নির্মানে সংকট সৃষ্টি হয়। তাও যদি হয় সেই সংস্কৃতি ধর্মের ভিত্তিতে। আমরা বাঙালিরা সেই সংকট পেরিয়ে এসেছি অনেক পূর্বে। কিন্তু বর্তমান কালে ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে সেই সংকটটি প্রকট আকার ধারণ করে আছে তা হচ্ছে ধর্মের মুখুশে ধর্মান্ধতা। অর্থাৎ প্রগতি, আধুনিকতা, সভ্যতার বিপরীতে ধর্মান্ধতা একটি প্রকট সংকট। যেমন নাম ও ডাকে মুসলমান ও ইসলামের ধারক ও বাহক বলে পরিচয় দিয়ে ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে ব্যক্তি স্বার্থে কিংবা রাষ্ট্রীয় শাসনের স্বার্থে। অতি সম্প্রতি জঙ্গি তৎপরতা এই ধর্মান্ধতার পরিনতি।

ধর্মকে সংস্কৃতির সাথে এক করে চিন্তা করাটা এক ধরনের বোকামি। ধর্মের একটা আর্ন্তজাতিকতাবাদ রয়েছে কিন্তু সংস্কৃতির রয়েছে জাতিয়তাবাদ। সাংস্কৃতিকতা বাদ একটি অঞ্চলের আর ধর্ম সমগ্র মানবজাতির । বাঙালি মুসলমান আর আরবদেশের মুসলমানদের সাংস্কৃতিক সম্মন্নয়ের একাত্ততা খুঁজলে ভুল করা হবে। ঠিক তেমনি অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রে তাই। ভারতীয় হিন্দু কিংবা বৌদ্ধ ও খ্রীষ্টানদের সাথে ইউরোপিয় হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীষ্টানদের সাংস্কৃতিক সমন্নয় খোঁজা বোকামিরই কাজ। তাই বলে ধর্মের সাথে সংস্কৃতির কোন বিরোধ নেই। ধর্মকে ধর্মের জায়গায় রেখে নিজ নিজ সংস্কৃতিচর্চা করতে কোন সমস্যা হয় না।

 

slide