ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

seminar lecture 00

সে মি না র : মূ ল প্র ব ন্ধ

আজহার ফরহাদ

১.
বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রথমেই হোঁচট খেতে হবে ধর্ম-আধুনিকতা-প্রগতিশীলতার একটি অপরিণত সহাবস্থানে। যেখানে দাঁড়িয়ে ‘না ধর্মে না জিরাফে’, এমন একটি ভ্রান্তিমূলক সংস্কৃতি-পরিচয় পাওয়া যায় যার ভেতর অসংখ্য স্ববিরোধিতা ও শেকড়হীনতা বিদ্যমান।
সংস্কৃতির স্বভাবের ভেতর অভাব থাকতে পারে। যে কোনো অভাবের ওপর ভর করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল কেন? সাংস্কৃতিক স্বভাবের ভেতর আত্মপরিচয়ের অভাববোধের কারণে। এই অভাব একটা সংকটের নাম; না পাওয়া বেদনার হতাশা নয়। এটিকে আরো একটু গভীরে বলা যেতে পারে ‘স্বভাবের অভাব’; অভাবের স্বভাব নয়!

এই ‘স্বভাবের অভাব’ হতে জেগে উঠেছে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনা। এটিকে কেবল আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ‘ডিসকোর্স’ দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। রাষ্ট্র ও জনপদের লোকমানসে প্রবাহিত দীর্ঘ এক ধারাবাহিক জীবন-পরম্পরা যখন আঘাত পেতে থাকে তখনই ব্যাপারটি ঘটে। আমাদের মুক্তির সংগ্রাম তারই ফলশ্রুতি। কিন্তু দেশ-কাল-সময়ের স্বাধীনতাকে আমরা কেন মুক্তি বলবো? এখানে মানুষ কোথায়? প্রকৃতঅর্থে মানুষের মুক্তি কতখানি সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাবে রাজনৈতিক সংগ্রাম ও স্বাধীনতার মূলে সাংস্কৃতিক শক্তিমত্তাকে অনুধাবন করতে পারলে।
সংস্কৃতিচর্চা আর সাংস্কৃতিক চেতনা এক নয়। চেতনাহীন সংস্কৃতিচর্চার ভেতর চিত্ত-বিনোদন থাকতে পারে, জাগরণ সম্ভব নয়। আর কোনো জাগরণই জেগে ওঠা বা সচেতনতা নয়, যতক্ষণ না আত্মজাগরণ ঘটাতে পারছে। আমরা এখন এই আত্মজাগরণের পথ ও পরম্পরাটিকেই আমাদের আলোচনার মূলাধার হিসেবে দেখতে পারি।

মানুষের আচরণ ও চরিত্রের ভেতর দিয়ে সভ্যতার স্বভাব গড়ে ওঠে। এ স্বভাবের ভেতর যেসব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকে তা যেমন সভ্যতার সম্ভাবনা তেমনি সংকটও। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে থিতিয়ে ওঠা মাখনের মতো বিবেচনা করলে পচে যাওয়া দুধের ছানার ভয়ও থেকে যায়। এখানেই সংস্কৃতির সংকট। বড় বড় সভ্যতার সুবর্ণ সময়েও ভেতরে ভেতরে ঘটেছে অমানবিক, নিষ্প্রাণ, আত্মজাগরণহীন সমৃদ্ধি; যার তলে শেষে মানুষই হারিয়ে গেছে। উনিশ শতকের পশ্চিমা চিন্তাকাঠামোর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ছিল ‘ঈশ্বরের মৃত্যু’। মানবসত্তার বিকাশে কাল্পনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঈশ্বরভাবনা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এসেছিল। বিজ্ঞানের সত্যানুসন্ধান, ধর্মের জিজ্ঞাসাহীন প্রচলিত কাঠামোকে ভেঙে দিতে তৎপর হয়েছিল। মানুষ চাঁদের আলোয় মুগ্ধ না হয়ে চাঁদকে ছুঁয়ে দেখবার স্বপ্ন দেখেছে। যার ফলে বিশশতকে মহাকাশযাত্রা বা চাঁদে অবতরণের মতো বিস্ময়কর ঘটনা সম্ভব হয়েছিল। উনিশ শতকের বিজ্ঞানমনষ্কতা এবং পরবর্তীতে গড়ে ওঠা প্রচলিত ধর্ম-প্রাতিষ্ঠানিকতার আধিপত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বিংশ শতাব্দীকে মানুষ পেয়েছে সংগ্রাম ও মুক্তির শতক হিসেবে।

বিশ শতকে এসে বিজ্ঞানচেতনা প্রযুক্তির চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নিজেই যেন ঈশ্বরের স্থান দখল করে বসেছে। ঈশ্বরচেতনা ও আধ্যাত্মিকতা যেমন ধর্মকাঠামোর ভেতর হারিয়ে যায় তেমনি বিজ্ঞানচেতনাও প্রযুক্তির অমানবিক উন্নয়নে কোথায় আড়ষ্ট হয়ে পড়েছে। বিশ শতকে দেখা যায় ‘মানুষই মৃত’। মানুষের মুক্তি ধর্মের বদলে বিজ্ঞান দিয়েও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আজকের একবিংশ শতক আমার কাছে উনিশ শতকের ‘মৃত ঈশ্বর’ ও বিশ শতকের ‘মৃত মানুষের’ পুনর্জাগরণের সময় হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। চার্চ, পুরোহিত, মোল্লাতন্ত্রে বন্দী যে ঈশ্বরকে আধুনিক মানুষ মৃতজ্ঞান করেছে; পুঁজি, বাজার অর্থনীতি, প্রযুক্তিবিদ্যার অমানবিক সমৃদ্ধিতে যেখানে ব্যক্তিসত্তা গৌণ ও মূল্যহীন কর্পোরেট দাসে পরিণত হয়েছে, মৃতবৎ সে মানুষকে যৌথভাবে জেগে ওঠা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এই প্রয়োজন মানুষের ভেতর আত্মবিশ্বাস ও আত্মসংগ্রামের। মানুষ যে অর্থহীনভাবে ধর্ম ও বিজ্ঞানচিন্তার সংঘর্ষে ক্ষত-বিক্ষত অসহায় প্রাণীতে পরিণত হচ্ছে সেখান থেকে তার মুক্তির প্রয়োজন। এ উভয়সংকট হতে না বেরুতে পারলে তার জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমৃদ্ধি কোনো সফলতা বয়ে আনবে বলে মনে করতে পারি না।

পশ্চিমা সভ্যতার এই উন্নয়ন প্রকল্প যে সংকটকে সঙ্গী করে বেড়ে উঠেছে সেখান থেকে সহজে বের হওয়া তার জন্য সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অনগ্রসর ও প্রান্তিক বিশ্বেও এর প্রভাব স্বভাবতই পড়েছে, কিন্তু সেখানে ঘটনাটি ঘটেছে আরোপিতভাবে। রাষ্ট্র ও সমাজপ্রকল্পের বিভিন্ন মডেল অনুসরণ করতে গিয়ে একদিকে ধর্মান্ধতা অপরদিকে অন্ধ-প্রগতিশীলতা মানুষকে ভেতরে ভেতরে রসহীন, অনুভবহীন, দুরন্ত রোবটে পরিণত করেছে। আমরা দেখছি নিষ্প্রাণ রোবটদের আদর্শ ও মতবাদের সংঘাত, মানুষের পায়ের আওয়াজ যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্তর্গত সভ্যতার দিকে না গিয়ে মতাদর্শিক সংঘাতময় অপসংস্কৃতির সংকট তৈরি করছি। পশ্চিমের নিজস্ব বিকাশের পথটিকে পোশাকের মতো পরিধান করে অগভীর সভ্য হয়ে ওঠা–একে সংস্কৃতির সংকট না বললে আর কী বলবো?

মানবিক পৃথিবীর জন্য সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল কতখানি জরুরি তা বিবেকবান মানুষমাত্রেই উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু সংস্কৃতি বলতে আমরা কী বোঝাচ্ছি; তা কি কেবল উপভোগ করে সময় কাটাবার বস্তু নাকি এগিয়ে যাবার, উদ্বুদ্ধ হবার অনুপ্রেরণামূলক তৎপরতা সেটি বোঝা দরকার। সংস্কৃতির অন্তঃধর্মকে না চিনতে পারলে সভ্যতার মর্মে পৌঁছানো যায় না। বিরাট সব সভ্যতাকে মানুষ চিনতে পেরেছে, মর্ম উপলব্ধি করতে পেরেছে সংস্কৃতির ধ্যান-ধরন-ধারাবাহিকতা দিয়ে। এটিই সংস্কৃতির ধর্ম, যা মৌলিক জীবনবোধ ও দর্শনের ছায়াস্বরূপ দেশ-কাল-সমাজে রূপান্তর হয়। যাকে পারলৌকিক ধর্মকাঠামোর মতো নির্দ্দিষ্ট একটি গণ্ডীর ভেতর আবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়, এই তার সৌন্দর্য। মানবসভ্যতার উত্থান-পতনেও এই সৌন্দর্য হারিয়ে যায় না; পৃথিবীর আদিতম সুর হয়ে গেঁথে বসে অপরিবর্তনীয় বিবর্তনের গভীরে। কিন্তু কথা হলো সংস্কৃতির এই মৌলিকত্ব আসলে কি? কোথা হতে এটি জন্মলাভ করে? ক্ষেত্রভেদে ধর্মের সাথে তার দ্বন্দ্ব ও প্রীতির কারণ কি? কখনো দেখা যায় ধর্মীয় সংস্কৃতির ভেতর তার ঢুকে পড়া, কখনো প্রবল বিরোধ। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকাঠামো যখনই অমানবিক ও আগ্রাসী হয়ে উঠতে চেয়েছে ঠিক তখনই দেখা গেছে কোনো না কোনো সাংস্কৃতিক শক্তি তাকে রুখে দাঁড়িয়েছে। এই শক্তিটি কী?

আমাদের আলোচ্য বিষয় বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বাউল-ফকির সমাজ ও তার গভীর মানবতাবাদী জীবনদর্শনকে মুখ্য ধরা হয়েছে। যার পরিচয় না পেলে সংস্কৃতির নিজস্ব ধর্মকে আমাদের চিনতে ভুল হবে। আমরা এমন একটি জাতি যার রয়েছে বিস্তৃত সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য, যার ভেতর প্রচ্ছন্ন রয়েছে লোকায়ত ও লোকোত্তর চেতনার সুদীর্ঘ পরম্পরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার একটি আড্ডায় বলেছিলেন,

মানবপন্থী বাংলাদেশ প্রাচীনকালেও ভারতের শাস্ত্রপন্থী সমাজ-নেতাদের কাছে নিন্দনীয় ছিল। তার মানে বাংলাদেশ চিরদিনই শাস্ত্রগত-সংস্কারমুক্ত। বৈষ্ণব ও বাউলদের মধ্যেও দেখা যায় সেই স্বাধীনতা। তাদের সাহিত্যে ও গানে অলঙ্কার বা শাস্ত্রের গুরুভার তারা কখনও সইতে পারে নি। শাস্ত্রের বিপুল ভার নেই অথচ কি গভীর কি উদার তার ব্যঞ্জনা। এদেশের কীর্তন-বাউল-ভাটিয়ালি প্রভৃতি গানে খুব সাদা কথায় এমন অপূর্ব মানবীয় ভাব ও রস সাধকেরা ফুটিয়ে তুলে গেছেন যে কোথাও তার তল মেলে না, কূল মেলে না। অপার মানবীয় ভাবের কোথায় সীমা কোথায় শেষ? প্রাণের মতোই তা সর্বভারমুক্ত ও সহজ তার অতল অপারতার রহস্য।

—ক্ষিতিমোহন সেন; বাংলার সাধনা।

মুহম্মদ মনসুর উদ্দিনের হারামণি গ্রন্থের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ আরো বলছেন–
‘আমাদের দেশে যাঁরা নিজেদের শিক্ষিত বলেন তাঁরা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের নানা কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অন্য দেশের ঐতিহাসিক স্কুলে তাঁদের শিক্ষা। কিন্তু, আমাদের দেশের ইতিহাস আজ পর্যন্ত, প্রয়োজনের মধ্যে নয়, পরন্তু মানুষের অন্তরতর গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেছে। বাউল-সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের সেই সাধনা দেখি–এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই; একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করে নি। এই মিলনে সভাসমিতির প্রতিষ্ঠা হয় নি; এই মিলনে গান জেগেছে, সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে, কোরান পুরাণে ঝগড়া বাধে নি। এই মিলনেই ভারতের সভ্যতার সত্য পরিচয়, বিবাদে বিরোধে বর্বরতা। বাংলাদেশের গ্রামের গভীর চিত্তে উচ্চ সভ্যতার প্রেরণা ইস্কুল-কলেজের অগোচরে আপনা-আপনি কিরকম কাজ করে এসেছে, হিন্দু-মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেছে, এই বাউল গানে তারই পরিচয় পাওয়া যায়।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সময়ে, যে কালে এই কথাগুলি বলেছিলেন সেই সময়কাল ও বাস্তবতা আজ আর নেই কিন্তু বাউলসাধকগণ রয়েছেন স্বমহিমায়। তিনি বাউলসাধকদের শক্তিমত্তা ও বিশেষত্ব সম্পর্কে যে মূল্যায়ন করেছেন তা কেবল ভারতবর্ষ নয় সমগ্র পৃথিবীর বিবেচনায় অত্যন্ত বিষ্ময়কর ও মূল্যবান। বাউল ও ফকির সমাজ সময়ের হাল-হকিকতকে কতখানি সমঝদারিত্বের সাথে মোকাবেলা করেন এবং মানুষকে মহত্ত্বর জীবনবোধ ও উপলব্ধির আত্মসংগ্রামে টেনে নিতে চান তা আজকের প্রযুক্তিদাসত্ব ও পুঁজিকৈবল্যর যুগে দাঁড়িয়েও আমরা অনুধাবন করতে পারি।

সূক্ষ্মতম জীবনবোধের সাথে সরস দার্শনিকতা যে পরিমাণ সমৃদ্ধ করেছে বাউল গানকে তা বিরল। বাঙালির এতবড় জাগরণের পরম্পরাটিকে পশ্চিমের দার্শনিক পরাকাষ্ঠার সাথে তুলনাযোগ্য করে তোলেন অনেকেই। কিন্তু এই দর্শনচর্চা কেতাবী নয়, মানুষের অন্তর্গত বিশ্বাস ও উপলব্ধির সাথে মিলিত পরমসত্যের অনুসন্ধানী হয়ে ওঠা মানুষেরই জয়গান গেয়ে। মনে রাখতে হবে এখানে দেবতার চেয়ে, কল্পিত ঈশ্বরের চেয়ে মানুষই মুখ্য। বাউলের ধর্ম তাই মানুষের আরাধনা করে। যে মানুষকে বাউল সজ্ঞানভাবে ঈশ্বরের প্রতিরূপ ভাবতে পছন্দ করেন, আদমসুরতই এখানে স্রষ্টার আদল।

ক্ষিতিমোহন সেন বলছেন,
‘দার্শনিক সব গভীর তত্ত্ব এদেশে প্রচারিত হয়েছে কবিতায় ও গানে। দর্শনে-সঙ্গীতে যে বিবাদ তা এদেশে নেই। বাংলাদেশের বাউলেরা সুরে তালে যে-সব গভীর তত্ত্বগান করেছেন তা আর কোনো ভাষায় বা আর কোনো প্রকারে প্রকাশ করাই অসম্ভব। কাজেই এদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান-কাব্য-সঙ্গীত পরস্পরে পরস্পরকে আশ্রয় করে এগিয়ে চলেছে। ধর্মে ও জ্ঞানে এদেশে বিরোধ ঘটে নি। এই দুয়ের মধ্যে বিরোধ ঘটলে দুঃখের আর অন্ত থাকে না।’ —বাংলার সাধনা; পৃ.২০।

কিন্তু ধর্মে ও জ্ঞানে এখন বিরোধ বিস্তর। এই বিরোধ যত না ধর্মের কারণে তারচেয়ে বেশি অজ্ঞানতা ও সংস্কৃতিহীনতার জন্যে। এত সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরও কেমন করে ঘটে এমন দুর্ঘটনা, তা বিশেষ চিন্তার বিষয়। তবে কি মানুষ এগোয়নি একটুও, পেছনের সংস্কার ও কূপমণ্ডুকতাকে আগলে ধরে আছে! ঠিক তা নয়। সময় এগিয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। সময়ই তার সমসাময়িকতার ভেতর থেকে বের করে আনে দারুণ সব স্বর্ণশস্য। আমাদের কেবল তার বাঁক-বদল ও দিকপরিবর্তনকে ধরতে হয়। বাংলার বাউলধর্ম তা সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করে থাকে। বাউল কতখানি সমসাময়িক তা একটি গানে টের পাওয়ার চেষ্টা করি।

ও দেশে মোবাইল এসেছে, চিঠি বন্ধ হইয়াছে
ভালোবাসার কথা এখন আসে বাতাসে।।
আমার অভাবের সংসার
বন্ধুর সনে প্রেম করিলে মোবাইলের দরকার,
ওরে বন্ধে বলছে বেইল নাই আমার মোবাইল না লইলে।।

আমার বন্ধুয়া শোনাইছে
মোবাইল একটা লইলাম হাতে হালের বলদ বেঁচিয়ে,
ওরে মাসে মাসে কার্ড ভরিয়া ঘরবাড়ি গ্যাছে।।

আমার বন্ধু কালাচাঁন
একমাত্র মোবাইল না হইলে বাঁচে না পরাণ
ওরে বন্দে বলছে পোস্ট অফিসতো বন্ধ হইয়াছে।।

সমসাময়িকতার অনবদ্য এই উপলব্ধি সম্প্রতি রচিত বাংলাদেশের খ্যাতিমান কবি নির্মলেন্দু গুণের মুঠোফোন কাব্যের চাইতে অনেক অনেক বেশি সমসাময়িক, দার্শনিকভাবে উপলব্ধ এবং সাধারণ মানুষের নিকটবর্তী। বাউল-ফকির সাধক ও শিল্পীগণ কোনো মতেই জনবিচ্ছিন্ন নন, গণমানুষের উচ্ছ্বাস-আবেগ-ফুর্তিকে উসকে দেবার বদলে তাদের ভেতর একটা গভীরতর জীবনবোধ অনুসন্ধানের চেষ্টা সবসময়ই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। শোনামাত্রই গানটিকে চটুল মনে হলেও ভাল করে শুনতে গেলে সে গভীরের স্পর্শ অনুভব করা মোটেও কঠিন কিছু নয়। এখানেই বাউলের সমসাময়িকতা এবং শক্তিমত্তা। যার পক্ষে সময়ের সকল অভিব্যক্তিকে ধরে ফেলা সম্ভব এবং আখেরে সে সম্ভাবনার দিকে মানবসত্তাকে এমন একটি পথে টেনে নিয়ে যাওয়া যেখানে তার অচেতনা কাটে, আত্মচেতনা জাগ্রত হয়।

২.
কথা বলতে পারাতেই ভাষার জন্ম নয়। ভাষা গড়ে ওঠে মনের ভাব প্রকাশে। বর্ণ ও শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন ভাষায় পরিচয় না, ভাষা তাকেই বলে যা জীবনভাষ্য হয়ে উঠবার কলকব্জা। বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছে ভাষাভিত্তিক আত্মপরিচয়ের দৃঢ় অবস্থান থেকে। এইরকম একটি জাতি বিশ্বে বিরল। ভাষাতো সকলেরই রয়েছে। বহু ভাষাই আগ্রাসনের করালগর্ভে বিলীন হয়েছে। পৃথিবীর অনেক বড় বড় ভাষার মানুষজন নানানভাবে সমঝোতা করেছেন সে আগ্রাসনের সঙ্গে। কিন্তু বাংলাদেশে তা হয় নি কেন? আমরা ভাষাগত বিশেষত্বের ভেতর দিয়ে অস্তিত্বরক্ষার জন্য জীবনদান করেছি, এ কি শুধুই ভাষার প্রতি প্রেম বা আচ্ছন্নতা?
তা নয়। বাংলা ভাষা যে গড়েপিঠে তৈরি হয়েছে সাধকের হাতে। আদি হতে আদিতম রূপটিকে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় তার সমৃদ্ধি। ছন্দময়, কাব্যময়, গভীর অনুসন্ধানের গূঢ় হতে গূঢ় দার্শনিকতার চর্চা হয়েছে এই ভাষায়। অথচ তা গানের সুরেই। এ ভাষায় প্রাচীনতম ইতিহাস পাওয়া যাবে গানের ভেতর। এখানে ভাষা-গান-সুর একসূত্রে গাথা। তাই আমাদের লিপিবদ্ধ ইতিহাস দুর্বল কিন্তু মৌখিক ইতিহাস সমৃদ্ধ।

মুখে মুখে বয়ে চলা গীতিময় এ ইতিহাস সুগভীর ও আত্মানুসন্ধানী। আমাদের নাথসাহিত্য, চর্যাগান, বৈষ্ণবগীতি এ ধারাবাহিকতার ফসল। কিন্তু যে ভাষার ভেতর এত ঐতিহ্যমণ্ডিত দর্শনপাঠ ও জীবনজিজ্ঞাসা রয়েছে গানের মাধ্যমে, তা কেন শিক্ষিত বাঙালি জীবনকে নাড়া দিতে পারে নি? কারণ, এ শিক্ষালাভ আরোপিত ও অনুকৃতিময়। বাঙালির আত্মপরিচয়ের উদাসীনতার এ এক ভিন্ন নজীর। অধিকাংশের কাছে বাউল-ফকিরগণ আত্মভোলা উদাসীন শিল্পীমাত্র। জীবন বহির্ভূত প্রান্তিক উপজীবী। মধ্যবিত্তের বৃহৎ শিক্ষিত সমাজ এই ঐতিহ্য সম্পর্কে মূলত উদাসীন, তার আত্মসংকটের অন্যতম কারণও এটি।
কিন্তু বাউল-ফকির সমাজ প্রান্তিক হয়েও কতখানি অগ্রসর আমরা তা জানি না। তার সাধনা নিছক ব্যক্তিগত সাধনা নয়। তারা মানবজীবন ও মানুষকেই প্রধান অবলম্বন মনে করেন। শাস্ত্র ও ধর্মীয় জটিল ও কুটিলতর আচারসর্বস্বতা হতে মুক্ত মানবতাবাদী দার্শনিক,প্রেমিক,ভক্ত ও দাস। এরা মানুষের দাসত্ব করেন, যে মানুষের ভেতর মনের মানুষের দেখা মেলে। সে মনের মানুষ কোনো বিমূর্ত চরিত্র নয়, ক্ষুদ্র ‘আমি’র ভেতর সুপ্ত থাকা ‘পরম-আমি’; যে ‘আমি’ আমার ভেতর সীমাবদ্ধ নই, সর্ব-আমি’র ঐকতান। সে ঐকতানে একটা বিশ্বময় বিরাট মানুষ্যত্বের অভিন্ন পরিচয় পাওয়া যায়। এ পরিচয়ই বাউলের আরাধ্য, তার ধর্ম। এ কারণে বাউল পরম্পরাকে ‘মানবধর্ম’ আখ্যা দেওয়া হয়।

বাউল আর ফকির একটু আলাদা। বাউল বলে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মাচার নেই, সম্প্রদায়ও নেই; এ হলো নানান ধর্ম ও মতের মানুষের উচ্চতর আত্মানুভবের মিলনস্থল। এরা পরমতসহিষ্ণু ও লোকায়ত। যেমন করে একজন বৈষ্ণব বাউল হন, একজন শাক্ত বা শৈব বাউল হতে পারেন; এমনকি খুঁজে দেখলে খ্রিস্টানদের ভেতরেও বাউল পাওয়া যাবে, তেমনি একজন ফকির লালন শাহও বাউল। মধ্যযুগের সন্তমত, সুফিবাদ কিংবা বৌদ্ধদের ভেতর বাউল ছিল। বাউলিয়ানা নির্দিষ্ট কোনো আচরণ নয়, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মরমীবোধের বহুবর্ণিল চিহ্নপরিচয় যা মূলত দমসাধনা ও মানুষগুরুর আরাধনানির্ভর বিষয়-বিরাগী সঙ্গীতমুখী পরম্পরা। রবীন্দ্রনাথ এই বাউলচেতনাকে ‘মানুষের সহজধর্ম’ বলে মত দিয়েছেন। এই চেতনাই বাংলার সবচেয়ে নিকটতর ও জনভিত্তিপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক শক্তিমত্তার ভিত্তিমূল। ইসলামের সুফি-ফকিরী পরম্পরার মানবতাবাদী দর্শনের যে প্রভাব বাংলাদেশে সুদীর্ঘকাল হতে বিদ্যমান তার ভেতর দিয়ে সে একই বাউলিয়ানাই প্রকাশ পায়। চরম সাম্প্রদায়িক ও আচারসর্বস্ব ধর্মান্ধতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাউল-ফকিররাই প্রশ্ন করতে ও উত্তর দিতে সক্ষম। তাদের এই সওয়াল-জওয়াব শাস্ত্রানুগত হলেও যুক্তিপ্রবণ।

বাউল-ফকির পরম্পরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, তা প্রাতিষ্ঠানিকতা দোষে দুষ্ট নয়। বাংলার প্রতিষ্ঠানবিরোধী একমাত্র পূর্ণাঙ্গ শক্তিই এটি। সুদীর্ঘকাল ধরে বাউল-ফকিররা আধুনিক সভ্যতা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের নানান চাপান-উতোর প্রচেষ্টা হতে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছেন। সমসাময়িক জীবন ও জগত সম্পর্কে অংশগ্রহণমুলক ভাবনা রেখেও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নয় কেবল, প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রচিন্তা ও সামাজিকতার সাথেও বিনয়ের সাথে একই দূরত্ব রক্ষা করে থাকেন। কিছুকাল আগেও বাংলাদেশের বিদ্বৎসমাজে এমন একটি ভাবনা প্রচলিত ছিল যে বাউলরা বিশেষ করে ফকির লালনের গান সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে। যা একেবারেই সাধকের সাধনসঙ্গীত। কিন্তু এ ধারণা নিতান্ত অজ্ঞানমুলক। লোকসমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আত্মিক ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞানতাই এমন ধারণার মূল। এমন চিন্তা আমাদের লোকজীবনের অত্যন্ত সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আঘাত করে এবং গ্রামীন জনপদ ও প্রান্তিক মানুষদের অবমূল্যায়িত করে। আজকের এই পুঁজিবাদী ও কর্পোরেট আগ্রাসনের ভেতর দিয়ে খুব কমসংখ্যক শিক্ষিত মানুষ রয়েছেন যারা বাউল-ফকিরদের তথাকথিত সাধনসঙ্গীতকে সর্বব্যাপকতা দিয়ে দেখতে পান। এর অধিকাংশই নিম্নআয় ও শ্রেণীর। যাদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা সুখকর নয়।

গ্রন্থগত বিদ্যাকে চরম পরাকাষ্ঠা হিসেবে দেখছি বলে লোকজীবনের সুদীর্ঘ সঙ্গীতময় চিন্তা ও জ্ঞানপরম্পরাকে উপেক্ষা করবার ধৃষ্টতা রয়েছে আমাদের। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা ও গবেষণার পর দেখতে পাওয়া যায় একাডেমিক জ্ঞানচর্চার মাপকাঠিতে দর্জির এক কাপড় বহুবার কাটবার গল্পের মতো গৌণ হয়ে পড়ে বাউল চেতনা। আমরা নিজেরা বিভ্রান্ত ও স্ববিরোধী হয়ে উঠি; না বর্তমান, না অতীত, না ভবিষ্যৎ–না ধর্ম, না আধুনিকতা, না উত্তরাধুনিক ভাবনাপ্রকল্প–না বিশ্বব্যাপী চালু হওয়া কর্পোরেট ধ্যান-বাণিজ্য, না আরব জাতীয়তাবাদী উগ্র ওহাবী মতবাদ, কোনটিই ভাল করে বোঝাপড়া হয়ে ওঠে না। কিন্তু আমরা সাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করতে চাই, যে সংস্কৃতির সাথে আমাদের বিস্তর দূরত্ব। সংস্কৃতির ঘনীভূত হওয়া নিছক কিছু উপাদানকে মণ্ডা-মিঠাইয়ের মতো উপভোগ করতে উদগ্রীব হই কিন্তু দুধেল গাভীটি কোথায় আছে? কি খাচ্ছে? তার প্রতি উদাসীন। রূপকথার ডিমপাড়া হাঁসের মতোই বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিচার করছি। যেন চিরকালই আমাদের সোনার ডিম উপহার দেবে। কিন্তু সে হাঁস যে রক্তমাংসের এবং লোকজীবনের খোয়াড়েই বসত করছে, সে জ্ঞান আমাদের আজও হলো না।

প্রথাগত কিংবা প্রথাবিরুদ্ধ, যে কোনো অর্জনেরই একটা ধর্ম থাকে। ধর্মহীন কোনো অস্তিত্ব নেই। ধর্ম হলো স্বভাব, ধারণ-আচরণ। তা যখন বৈচিত্র্যকে দমন করতে চায়, তখন সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে। বাউল-ফকিরগণ ধার্মিক কিন্তু সাম্প্রদায়িক নন। তারা বৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা করেন, সময়কে ধারণ করেন এবং সামনের দিকে এগিয়ে চলেন। এই সামনের দিকে এগিয়ে চলা মানে সমসাময়িক হয়ে ওঠা, বর্তমান নিয়ে বাঁচা; অতীত বা ভবিষ্যতের কল্পনা-জল্পনা দিয়ে নয়। বর্তমানের মুখোমুখি হওয়া, প্রশ্ন করা এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। তার কাছে দুনিয়াই সারবস্তু; এখানেই স্বর্গ-নরক, এখানেই বিচার ও মুক্তি। গৃহ ও সংসারত্যাগী বাউল হওয়া হয়তো সহজ কিন্তু গৃহে ও সংসারে যার বাউলমন সদাজাগ্রত তাঁর পথ বড় কঠিন। পালিয়ে বেড়াবার সুযোগ কই? যুদ্ধই তাঁর নির্বাণের শহীদানা পরিণতি।

আজকের বিশ্বব্যাপী সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ইসলাম ও ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মহড়া ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। বোদ্ধাগণ যতই একে সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক অপশক্তির খেলাচ্ছল হিসেবে দেখুক না কেন, এতো সত্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির চরম পরাকাষ্ঠার যুগে বিপুল পরিমাণ মানুষ ধার্মিকতার নামে ধর্মান্ধ এক অপতৎপরতায় যুক্ত হচ্ছে। একদিকে অপরিণত ও আরোপিত ইয়োরোপীয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ অন্যদিকে অচেতন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ধর্মচিন্তার নতুন বিন্যাস আমাদেরকে শঙ্কিত করছে। না বুঝতে পারছি ধর্মনিরপেক্ষতা, না ধারণ করতে পারছি প্রকৃত ধর্মবোধ। অথচ আমাদের নিজেদেরই রয়েছে বোঝাপড়ার লোকায়ত ও লোকোত্তর দেশনা।

ধর্মে ও প্রগতিশীলতায় আমরা এমনই প্রশ্নহীন বোবায় পরিণত হয়েছি যে কথা বলার অন্তর্গত শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছি। লোকসমাজের প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাউল-ফকিরগণ এখনও পর্যন্ত জিইয়ে রেখেছেন সে পরম্পরা, যেখানে আত্মিক ও পারমার্থিক অনুপ্রেরণার মাধ্যমে জীবন ও জগতকে প্রেম ও আত্মজিজ্ঞাসাময় সম্ভাবনার দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া। দার্শনিকভাবে সমাজ ও জীবনকে মূল্যায়ন করা। জীবনের গভীরতা ও অর্থবহতা অনুসন্ধানে বাংলার প্রকৃত বরপূত্র এরাই। বাঙালির সাংস্কৃতিক ধর্মকে চিনতে হলে এর ভেতর দিয়ে যেতে হবেই।

সমাজসচেতনতার রাজনৈতিক ভূমিকায় বাউল-ফকিরদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ। মূঢ় সামাজিকতা ও ধর্মান্ধতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ফকির লালন যে যুগান্তকারী বৈপ্লবিক মানবতাবাদী আত্মদর্শনের প্রচার করেছেন তাকে কেবলমাত্র গুহ্য সাধনতন্ত্রের একজন সাধক হিসেবে বিবেচনা করা নির্বুদ্ধিতা। লালন ফকির সেই শিরদাঁড়া খাড়া করবার চেষ্টা করেছেন যা নুয়ে পড়েছিল সমাজ-সভ্যতা-মতাদর্শ-প্রাতিষ্ঠানিকতার ছায়াতলে। এর আগে ফকির মজনু শাহ তৈরি করেছিলেন বাংলার মানুষের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক আত্মসংগ্রামের ভিত। তার আগে এত সুনিপুণভাবে কোনো বিদ্রোহ বা সংগ্রাম ভারতবর্ষ দেখতে পায় নি। ১৭৬০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪০ বছরের এই ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহই ভারতবর্ষকে বিশেষ করে বাংলার সাধারণ মানুষের মনে আত্মজাগরণের রাজনৈতিক সূচনা ঘটাতে পেরেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা সংগ্রাম, তার সাথে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সেই পুরনো আত্মসচেতন বিদ্রোহচেতনা হতেই আসা। বাংলাদেশের মানুষের লড়াই করবার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য তার সংগ্রামী জীবনকে এতটাই মহত্ত্বপূর্ণ করে তুলেছে যে একটি জাতি একসাথে একটি যোগে যুক্ত হতে বেশি সময়ের প্রয়োজন পড়ে না। সুযোগ্য নেতৃত্ব ও অনুপ্রেরণায় তাকে একতাবদ্ধ করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় না। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ফকিররা ছিলেন মাদারীয়া সিলসিলার সুফিসাধক। সমাজকাঠামোর অগ্রহণযোগ্য পরিবর্তন ও বিভেদ-রাজনীতির মূলোৎপাটনে যে সমাজসচেতনার ভিত তারা গড়ে দিয়েছিলেন তা অদ্যাবধি বিদ্যমান। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের লোকজীবনে সুফি-ফকির প্রভাবিত মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি বিরাজমান। আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও আত্মনির্ভরতার হাতেখড়ি এখানেই। এ পরম্পরাটি তারও আগে নাথযোগীদের হাতে তৈরি করা। গোরক্ষনাথ ও মীননাথের চারণভূমি এই বাংলা। নাথযোগী ও সুফি ফকিরীমত এতটাই নিকটতর হয়ে এসেছিল যে পরবর্তীতে গড়ে ওঠা দিগম্বর ফকির বা ল্যাংটা ফকিররা বিশেষ করে সোলায়মান শাহ ল্যাংটার সাধনজীবনকে এরই ধারাবাহিকতা বলে ধারণা করা যায়।

বাংলার আত্মশক্তি অনুধাবণে বাউলচেতনা কতভাবে নানান সাধনা ও জ্ঞানমার্গকে আত্মস্থ করে টিকে আছে আজ পর্যন্ত তা বড় বিস্ময় জাগানিয়া। কিন্তু এই বিস্ময় আমাদের কাছে রহস্যময় এক ধোঁয়াশা অধ্যায় বলে মনে হয়। আমাদের সাংস্কৃতিক শক্তিমত্তার প্রতিকৃতি অঙ্কনে আর কোন কোন চেহারাকে আঁকতে পারি যা এতটা বিবর্তনের ভেতর দিয়েও বর্তমান! পাঞ্জাবে বুল্লে শাহ প্রগতিশীলদের কাছে মহান বিপ্লবী, বাংলায় ফকির লালন বাউলমাত্র। সংখ্যালঘুর প্রগতিচেতনা দিয়ে সংখ্যাগুরুর প্রতিনিধিত্ব হলো অংশিদারিত্বহীন সমাজচিন্তা। যার খেসারত আমরা দিনের পর দিন দিয়ে যাচ্ছি। মত ও পথের সংঘাত যতখানি বড় হয়েছে ততখানি অনুসন্ধানী হতে পারে নি মানুষের মন।

কাল পরিবর্তন ছাড়া মহাকালকে ধরতে পারে না। প্রতিটি কালই একেকটি পরিবর্তনের মাধ্যমে মহাকালে যুক্ত হয়। এই যেমন একটা ছোট পুকুর কতকাল আর টিকে থাকে; কিন্তু বড় বিলের মাঝখানে যেসব ছোট ছোট জলাশয় থাকে তা কখনও মরে না। ওতে সংযোগ থাকে নদীর। কালকে অবশ্যই কোন বৃহত্তর অর্থবহতার সাথে যুক্ত হতে হয় নইলে তা মরে যায়, মহাকালের মহানদী-সঙ্গমে যুক্ত হতে পারে না।

আত্মময়তার সবচাইতে বড় সমস্যাটি হলো তা অত্যন্ত গভীর হতে বাস্তবতাকে ঝাপসা দেখে। কিন্তু যে আত্মসচেতন, সে কিন্তু সমাজ কাঠামোর সাথে একটি যৌক্তিক সম্পর্ক রাখতে জানে, বুঝতে পারে ঠিক কোন দিক দিয়ে গল্পটা শেষ হবে আর শুরু হবে নতুন কোন গল্পের। বাউল-ফকিররা কালপর্বের পরিবর্তন সম্পর্কে অত্যন্ত সতর্ক। এই পরিবর্তন কীভাবে ঘটবে, কে ঘটাবে এসব বিষয়ও তারা আলোচনা করেন। ওদের সমাজবিশ্লেষণের রয়েছে নিজস্ব পদ্ধতি, যা তাঁরা অত্যন্ত সহজভাবে করতে জানেন। পৃথিবীজুড়ে যে অস্থিরতা ও সংকট তার পরিবর্তন কিভাবে ঘটবে সে ফর্মূলা তাঁরা জানেন না কিন্তু এটুকু বুঝতে পারেন যে কাল ঠিক কোনসময়ে তার দিক বদলায়, মহা পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়। আমরা এমনই এক পরিবর্তনের মহাকাল-দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছি যেখান থেকে সরে যাবার উপায় নেই । কিন্তু খুব কম মানুষই এই পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন।

এখন প্রস্তুতি নেবার সময়। যার পক্ষে যতখানি সম্ভব ঠিক ততখানি নিয়ে রাখা। কিন্তু কথা হলো এটা তো বুঝতে হবে আসলে কি ঘটতে যাচ্ছে। কেউ যদি নাই বুঝতে পারে তবে কি করে ঠিক করবে যে সে আসলে কি চাইছে? ধরা যাক, কেউ একজন বললো আমি মিষ্টি খুব পছন্দ করি; এই কথায় এটা ঠিক পরিষ্কার হয় না যে তা চিনি, না মধু, নাকি মিষ্টান্ন? কেউ মিষ্টি খুব পছন্দ করতে পারে আবার পায়েসটা নাও করতে পারে, কারো হয়তো খেজুরের রস ভাল নাও লাগতে পারে আবার তালের রস পেলে কেউ কিছুতেই না খেয়ে থাকতে পারে না। এটা একটা কেন্দ্রবিন্দু, থেকে নানান দিকে তিনি রেখা টানতে পারে। আর বিন্দুরেখাগুলি হলো একেকটি মত, যা ওই মূলবিন্দু হতে সৃষ্ট। তাই লালনশাহী ফকিররা যা ভাবছেন, নাথসাধুরা যা ভাবেন, বৈষ্ণবসাধকরা যা ভাবেন, কপ্টিক খ্রিস্টান সাধু কিংবা সুফি ফকিররা যেমন করে ভেবে থাকেন তার ভেতর ওই রেখার পার্থক্যটি থাকবেই কিন্তু কেন্দ্রবিন্দুটি এক।
এই বিন্দু সম্পর্কে যদি আমরা জানতে চাই; এটি কি আসলেই সমস্ত রেখাগুলিকে উৎসমূলে ধরে টান দিতে পারবে?

কেন নয়? এটাইতো কাল নিয়ে মহাকালের খেলা। এর কেন্দ্রে যা ঘটে, সেখানে এমন একজন এসে দাঁড়ান যখন তার আপনা হতেই সকল গ্রন্থি খুলে যায়। এরকম ঠিক সবসময় হয় না। যখনই কোনো মহামানবের আগমন ঘটেছে যিনি কালপর্বকে যুক্ত করেছেন মহাপরিবর্তনের সাপেক্ষে তিনি হয়ে ‍ওঠেন সেই কেন্দ্রবিন্দুর কর্তা। কালে কালে নানান জাতিতে ঘটেছে এমন ধারা। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটটি ভিন্ন। আজ পৃথিবী এতটাই ছোট হয়ে এসেছে, মানুষ এতকিছু জেনেছে, একে অপরের প্রতি অনধিকার চর্চা এতটাই বেড়েছে যে এখনকার পরিবর্তনটি আর কেবল নির্দিষ্ট জাতির ভেতর সীমাবদ্ধ রইবে না, এটি হয়ে উঠবে সমগ্র পৃথিবীরই পরিবর্তন।

আমরা কি এই পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে?

দুয়ারটি খুললো বলে…

—————————————————————————–
৭ম কুমিল্লা সংস্কৃতি উৎসবের সেমিনারে পঠিত মূল প্রবন্ধ।