ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

একজন সুলেখক ব্লগারের একটি নিবন্ধ পাঠ করিয়া অত্যন্ত মর্মবেদনাক্রান্ত হইয়া পড়িয়াছি। পোস্টটির শিরোনাম, “আমাদের দেশের নারীরা কবে বিশ্বমানের হবে?”। মন্তব্যের ঘরে লিখিতে যাইয়া দেখিলাম শব্দ সংখ্যার আধিক্য, সিদ্ধান্তে উপনীত হইলাম পোস্ট আকারে দেওয়া অনুচিত হইবেনা।

শিরোনাম পাঠ করিবার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়বস্তু পাঠ করিব মনস্থ করিলাম, সেইমতে পাঠ করিয়া আমার মনের মধ্যে কেমন জানি একটি অস্বস্তিকর বোধ জন্মাইলো। অনেক ভাবিয়া দেখিলাম আমার বোধটি সম্ভবত হীনমন্যতাবোধ। সত্যি বলিতে কি, নিজেকে একটু পরশ্রীকাতরতায়ও আক্রান্ত বোধ হইতে লাগিলো।

অতীব চমৎকার নিবন্ধখানা পাঠ করিয়া ভাবিতে বসিলাম, হায় অদৃষ্ট! ইহাই ছিলো আমাদের কপালের লিখন। সত্য সত্যইতো এযাবৎ আমাদিগের মানস চক্ষুর অন্তরালেই রহিয়া গিয়াছিলো বিষয়টি যে, আমাদের দেশের নারীজাতিকূল হতাশাজনকরূপে আধুনিক বিশ্বের রমনীকূলের মত আধুনিক বিশ্ব-ধরিত্রীর তাবৎ কর্মকাণ্ড হইতে বহুক্রোশ পশ্চাতে হাটি হাটি পা পা করিয়া ধুঁকিতেছে। সত্যইতো তাহারা আধুনিক বিশ্বের সহিত তাল মিলাইয়া চলিবার ন্যায় চলনসই কোনও মানদণ্ডেই বিশ্বমানের নারী হইতে পারে নাই। ধিক ধিক, আমাদিগের অদৃষ্ট। হায় বিধাতা, আমরা এখন আমাদিগের এই মুখ কোথায় লুকাইব?

গতকল্য মার্কিন মুল্লুকের রাজধানী ওয়াশিংটন নগরীতে সহস্র-লক্ষ নারীকন্ঠের সোচ্চার উপস্থিতি প্রকম্পিত করিয়া দিয়াছে বর্তমান বিশ্বের সর্ব-উচ্চ শক্তিধর দেশটির আকাশ বাতাস জলরাশি। সেই জলোচ্ছ্বাস এর ঊর্মি আঘাতের পর আঘাত করিয়া ছড়াইয়া পড়িয়াছে সমস্ত বিশ্বচরাচরে। আধুনিক বিশ্বের আনাচে কানাচে অবস্থানরত সমুদয় বিশ্বমানের নারীগণের টনক নড়িয়া গিয়াছে। তাহারাও ওয়াশিংটনের বিশ্বশ্রেষ্ঠ নারীকুলের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করিয়া শ্লোগানে মিছিলে প্রকম্পিত করিয়া বুঝাইয়া দিয়াছে তাহারা বিশ্বমানের নারী হইয়া উঠিয়াছে।

আর এইদিকে আমাদের এই বঙ্গললনা ‘ঘরবইঠা’ নারীগণ? ছিঃ ছিঃ! কি লজ্জা— তাহারা কিনা প্রাতঃভোজনের সংস্থান এবং বরতন মাজুনির কর্ম করিয়াই সময় ক্ষেপন করিয়া চলিয়াছে। কিরূপে উন্নতি হইবে এই বঙ্গনারী জাতির? কিরূপে তাহারা মার্কিন নারীকুলের কাতারভূক্ত হইয়া বিশ্বমানের নারীতে উন্নীত হইবে? নাহ! আর বুঝি মান রক্ষা হইলনা। অতীব লজ্জার কথা– এমনকি একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসেও এই বঙ্গললনার দলভুক্ত কেহ জানান দিলোনা যে তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ বিশ্ব মানের নারী হইয়া উঠিয়াছে। আহ কি লজ্জা!

এরূপ আসমান জমিন ভাবিতে ভাবিতে হতাশ হইয়া মুহ্যমান হওয়ার উপক্রম হইয়াছে আমার। মনের ভিতর কোথা হইতে কি আসিয়া জড়ো হইতে লাগিল। মন বলিতে লাগিল, ওহে কেন তুমি পরদেশী নারীদের এহেন উচ্চমানের কার্যকলাপের সহিত তোমার মাতা ভগ্নি কন্যা এমনকি অর্ধাঙ্গিনী সাধ্বী স্ত্রীর তুলনা করিয়া দিশাহারা হইতেছ। খোল তোমার মুদিত আঁখি, সন্মুখপানে চাহিয়া দেখ। দেখ তোমার মানসচোখে। তোমার দেশের চেনা অচেনা কতজন মহীয়সী ললনার কথা মনে আছে তোমার। তোমার জন্মদানকারী মাতা কে নিয়াই ভাবিতে আরম্ভ কর। কত যাতনা সহিয়া “নাস্তা বানাইয়া খাওয়াইয়া, বরতন মাজিয়া, নিজের সুখ তুচ্ছ জ্ঞান করিয়া” আজিকার তোমাকে গড়িয়া তুলিয়াছে। তোমার আজিকার অবস্থানের পিছনে তোমার পিতার চাইতে নেহায়েত কম নয় বরঞ্চ বেশীই হইবে তোমার মাতার অবদান।

নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করিতে লাগিলাম, আমার দেশের ক’জন নারী নিজ ভোগ বিলাসের চিন্তায় নিজ সন্তান-সংসার ত্যাগ করিয়া পশ্চিমের সেই বিশ্বমানের নারীদের ন্যায় ‘জীবন-মান উন্নয়ন’ ঘটায়? ভাবিতে লাগিলাম, আমার দেশের নারী নিজ সংসার, নিজ সমাজ সর্বোপরি নিজ দেশের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল? আর উহারা? চারিত্রিক অবক্ষয় ও নৈতিক স্খলনের প্রসঙ্গ টানিয়া আমাদের দেশের নারীদের সঙ্গে তুলনা নাই বা করিলাম।

ধীরে ধীরে আমার সম্বিত ফিরিয়া আসিতে লাগিল, রক্তে আমার প্রাণ সঞ্চার হইতে আরম্ভ করিল। আজিকার এই বাঙ্গালী পরিবার, বাঙ্গালী সমাজ এবং পরিশেষে আজিকার অবস্থানে একটি বাঙ্গালী জাতি তৈয়ার করিতে শত শত বর্ষ ধরিয়া অবদান রাখিয়া গিয়াছেন বাঙ্গালী “পূর্বনারী”, (পূর্বপুরুষ হইলে পূর্ব নারী কেন নয়?)

এরুপে একের পর এক ভাবনায় আসিতে লাগিল, পরিবারের পর সমাজে। এ কি- চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিতে লাগিলো বাঙ্গালী নারীদের বিশালতা। আমাদেরতো প্রীতিলতা আছে, আমাদেরতো বেগম রোকেয়া আছে, আমাদেরতো সুফিয়া কামাল আছে। আমাদেরতো জাহানারা ইমাম আছে। আমাদেরতো বীরাঙ্গনা মাতা আছে, যাহারা এই বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে গর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ করিয়াছে। ইহারা কি তা হা হইলে বিশ্বমানের নারী নয়? কি করিলে তাঁহারা বিশ্ব মানের নারীর মর্যাদা পাইতেন? সেইযুগেতো ফেসবুক প্রচলিত হয়নাই, তাঁহারাতো ‘স্ট্যাটাস’ দিয়া বিশ্বমানের মহীয়সী নারী হন নাই।

বুকে আরোও সাহস সঞ্চার হইল। ১৯৭১ সালে বাঙ্গালী জাতি যখন মরণপণ লড়াই করিতেছিলো পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে, সেই লড়াইএ শামিল হইতে সন্তানকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন কে? নিজ মনে জবাব আসিল- বাঙ্গালী নারী, বাঙ্গালী মাতা।

কেহ কি এরূপ শুনিয়াছে আজ অবধি, ৭১ এ কোন টগবগে যুবা গেরিলা যোদ্ধা হইতে পারেনাই তাহার মাতা- ভগ্নি- স্ত্রীর বাধা দেওয়ার কারণে? যুদ্ধে সন্তান হারাইয়া মাতা, ভ্রাতা হারাইয়া ভগ্নি, অথবা বিধবা হওয়া শহীদের স্ত্রী কখনো কি আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছে- এই দেশের জন্মের জন্য আমরা সব হারাইয়াছি? জবাব- না না এবং না। আমাদের দেশের নারীদের ন্যায় আর কয়টি দেশের নারী মুক্তিযুদ্ধে সন্মুখ সমরে অংশ নিয়াছে, অকাতরে প্রাণ-সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়াছে? তাঁহারা যে আমার বাংলাদেশের মাতা ভগ্নি স্ত্রী মমতাময়ি নারী। দরকার নাই তাহাদের ওয়াশিংটনের নারীগণের ন্যায় “বিশ্বমানের” নারী হওয়া।

আজিকার বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির দেহে প্রাণরসের ধারা সচল রাখিতে যাহারা দৈনিক ১৮ হইতে ২০ শ্রমঘন্টার নিবিড় শ্রম দান করিয়া কল কারখানায় জীবনের তিন-চতুর্থাংশ সময় কাটাইয়া দিতেছেন তাঁহারা আমার দেশের নারী। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়া উৎসবের সাজে মিছিলে শামিল হইয়া বিশ্বমানের নারী হইবার সময় কোথায় তাঁহাদের? নাই-বা হইল তাহারা বিশ্বমানের নারী, আমার কোন আক্ষেপ নাই।

আজিকার উন্নত বিশ্বের প্রাচুর্যময় জীবনে অসুখী পরিবার, বিপথগামী সমাজ, তুচ্ছ কারণে অথবা সুখ বিলাসের খোঁজে পারিবারিক বিচ্ছেদের কারণে অসহায় সন্তান, বৃদ্ধ পিতা মাতাকে অমানবিক নির্জনবাসে পাঠাইয়া সাময়িক আত্মসুখের সাগরে ভাসিয়া বেড়ানো যাহাদের কারণে (৫০% এর কারণ নারী), তাঁহারা যদি বিশ্বমানের নারী হন, তাহা হইলে প্রয়োজন নাই আমাদের এইরূপ “বিশ্ব মানের” খেতাবপ্রাপ্ত নারী।

শিক্ষায় দীক্ষায় গত অর্ধ শতকে আমাদের নারীরা কতটা অগ্রসর হইয়াছেন তাহা বর্ণনা করিতে হইলে রীতিমত পরিসংখ্যানবিদের সাহায্য লইতে হইবে। জীবনের কোন ক্ষেত্রে আমাদের নারীগণ আগাইয়া যান নাই? রাজপথে পেশাদার গাড়িচালক হইতে আসমানে উড়ান দেওয়া উড়োজাহাজ চালনা করা আমাদের দেশের নারীদের হাতের তুড়ি। দক্ষ পোশাকশিল্পকর্মী হইতে স্বনামধন্য চিকিৎসক, বিজ্ঞানী হইতে সমরনেতা, শিক্ষক হইতে সফল ব্যবসায়ী, পুলিশ কন্সটেবল হইতে উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা, মন্ত্রী হইতে সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেত্রী হইতে সংসদ স্পীকার, বিরোধী দলীয় নেত্রী হইতে প্রধানমন্ত্রী। কোথায় নাই আমাদের নারীদের অগ্রযাত্রার ঝান্ডা?

তাহা হইলে কেন আমরা এই হীনমন্যতায় ভুগিতেছি? কেন আমাদের এই পরশ্রীকাতরতা? কেন আমাদের মানসিকতার এইরূপ অধোগতি?

অতঃপর আমি বাংগাল সব কিছু বিবেচনা করিয়া লজ্জিত হইলাম, হীনমন্যতাবোধ ঝাড়িয়া ফেলিলাম এবং আমাদের নারীজাতির জন্য গর্বিত হইলাম।

ভাবিলাম ওয়াশিংটনের জমায়েতে প্ল্যাকার্ডে লেখা সেই বাক্য “তুমি আমার ভ্যাজাইনা দিয়া আসিয়াছ”- হা হা হা ………উহাদিগকে সত্যই বিশ্বমানের নারীতে পরিণত করিয়াছে।