ক্যাটেগরিঃ কৃষি, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

আমার যখন ৭-৮ বছর বয়স তখন আমাদের গারো এলাকায় জুম শব্দের সাথে পরিচিত হবার কোন সুযোগ ছিলোনা। অভাবে জর্জরিত গারোদের দেখা যেতো অন্যের জমিতে সারাদিন  খাটছে  দৈনিক ৩০ টাকা বা ২০ টাকা পাবার আশায়। এমনও ছিলো ধান লাগানোর সময় আসার আগেই পেট পুজো করতে  অগারোদের কাছ থেকে সিজন আসলে ধান লাগানোর প্রতিশ্রুতিতে টাকা নিয়ে নিতো। সেক্ষেত্রে টাকার পরিমাণ যেতো কমে । যেমন দৈনিক ৩০ টাকা পাওয়ার কথা থাকলে অগ্রীম নিলে দেওয়া হতো ২০ বা ২৫ টাকা। কিন্তু উপায়হীনরা বেঁচে থাকার তাগিদে তবুও টাকা নিয়ে নিতো। ভাগ্য চক্রে কিছু গারোদের বসতবাড়ির আশেপাশে শাকসবজির  চাষ দেখা গেলেও জায়গার অভাবে বৃহৎ আকারে কোনরকম চাষাবাদ চোখে পরতোনা। ছোটবেলা শুধু দুজন বৃদ্ধ/বৃদ্ধাকে দেখেছি যারা তাঁদের অল্প জায়গায় পাহাড়ের ঢালে গারোদের ঐতিহ্যবাহী “মিশি মি” (এক প্রকারের ধান) চাষ করতেন এবং পরের বছর ধান লাগানোর সময় হলে আবারও পাহাড় পুড়ে আগাছা পরিষ্কার করে চাষাবাদের আয়োজন করতেন। গারোদের জুম চাষের অল্প এই উদাহারনটি দেখার সৌভাগ্য আমার হলেও হয়তো অনেকেরই হয়নি। গারোদের ইতিহাসে জুম চাষ এবং গারো শব্দটি অতোপ্রতো ভাবে জড়িত । এমনকি জুম চাষের পরিচিতিকরনের অংশবিশেষ হিসেবে একটি ঐতিহ্যবাহী নাচও রয়েছে। যা এখন বিভিন্ন স্ট্যাজে পার্ফর্ম হয় কিন্তু সত্যিকারের জুম চাষ এখন শুধুই ইতিহাস। কিন্তু কেনো এই বাংলাদেশী গারোদের জুম চাষ বন্ধ হয়ে গেলো ? সেই কথা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে আরও একশো বছর কিংবা তারও আগে। যখন বৃটিশ বনবিভাগ বন সংরক্ষনের নাম করে শেরপুর, নেত্রকোনা এবং মধুপুর ভাওয়াল  এলাকার বনাঞ্চলগুলো  সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষনা করে।  তখন থেকেই এই এলাকার গারোরা জুম চাষের জায়গা হারিয়ে শুধু মাত্র বেঁচে থাকার জন্য নামে মাত্র ভিটামাটি নিয়ে জীবন কাটাতে শুরু করে। আর তখনই জুম চাষের কবর দেওয়া তো হলোই ভেঙ্গে পরলো গারোদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড।

পরবর্তিতে বনাঞ্চল সরকারের হলো। গারোরা বন ধ্বংশের বানোয়াট খল নায়ক হিসেবে আখ্যায়িত হতে শুরু করলো। বন দস্যুদের কবলে সংরক্ষিত বনাঞ্চল কখনও কখনও উজাড় হয়ে গেলেও মিথ্যা মামলা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী বন দস্যুদের দাপটে  জন্মভূমি পাহাড়টিই গারোদের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠলো। একজন জুম চাষি কি করে হঠাৎ বাঙালি কায়দায় আয় রোজগার করতে শিখে গেলো তা জানার অভিপ্রায়ে মাঝে মাঝে অনেকের সাথেই কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু  এখন যারা বেঁচে আছে তাঁদের কাছে এই ব্যাপারে কোন ভাল তথ্য পাওয়া যায়না। কারন প্রায় একশো বছর আগের ইতিহাস গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। জুম চাষ ছাড়িয়ে গারোদের দিনমজুরি খাটতে শেখানো হয়েছে কৌশলে। হয়তো প্রয়োজন হলেও গারোরা এই অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রাচীন পদ্ধতির পুনরাবৃতি কেউ হতে দেবেনা। কারন মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যাদের নিরুপায় করা হয়েছে তাঁরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠুক তা এই দেশ চাইবেনা। বরং বন ধ্বংশের নামে অনেক গারোদের  মিথ্যা মামলা দায়ের করা থেকে শুরু করে সরকারী জমিতে বসবাসের কথা উল্লেখ করে তাঁদের জীবন যাপনকে সংকীর্ন করে দিয়েছে।

DSC_0359

পার্বত্য এলাকায় এখনও জুম চাষ টিকে আছে। বংশানুক্রমে জুম চাষের দক্ষতা থাকায় সেখানকার পাহাড়িরা সমতল আদিবাসী বা গারোদের চাইতে অর্থনৈতিক দিকদিয়ে কিছুটা হলেও এগিয়ে। কিন্তু যে পরিমানে জুম তা টিকে আছে সেক্ষেত্রে বলা যায় পাহাড় হয়তো একসময় জুম শুন্য হয়ে পরবে। পুনর্বাসনের নাম করে, পর্যটন এলাকার নাম করে ইতিমধ্যে অনেক জুম এলাকা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জুম চাষ থেকে প্রতিবছর যে হারে আয় আসে সে বিষয়ে কারোর ভ্রূক্ষেপ নেই !  আদিবাসীদের জনজীবনে সংরক্ষন উন্নয়নের নাম করে যে সমস্ত অভিশাপ লেগে আছে তাঁর মধ্যে জুম চাষ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াটা অন্যতম। কিন্তু  কেউ নেই তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর।

লাকড়ি কেটে ফিরছে গারো নারী
কিছুদিন আগের ঘটনা শেরপুরের একটি পাহাড়ে গিয়েছিলাম বেড়াতে। চোখে পড়ল অনেক গারো আদিবাসী জংলী ছোট্ট ছোট্ট গাছের ডাল কেটে লাকড়ির বোঝা বানিয়ে মাথায় করে ফিরছে। আরও গভীরে গিয়ে দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র। একদল মানুষ (গারো নয়) ঠেলাগাড়ি নিয়ে এসে বন বিভাগের বড় বড় গাছের ডাল কেটে ঠেলাগাড়িতে ভরছে। কিছু গারোর সাথে কথা বলে জানা গেলো ওরা পার্টিসিপেন্ট। মানে বনবিভাগ তাদেরকে বন সংরক্ষনের জন্য পাহাড় ভাগ করে দিয়েছে। এবং তারা তাঁদের নিজের এরিয়ার ডাল কেটে বন পরিষ্কার করছে। এক্ষেত্রে গারোরা একটা মাঝারী সাইজের ডাল কাটতে গেলেই পরছে অনেক সমস্যায়। মিথ্যা মামলা তো আছেই সাথে হচ্ছে সহিংসতার শিকার। কিন্তু  যখন আর  পাহাড়িদের পাহাড় নয় সেখানে স্বল্প আয় বা দারিদ্র্যতার সীমায় বসবাস করা এই আদিবাসীদের বেঁচে থাকার উপায় কি হতে পারে ?

পুর্ব পুরুষদের শিখিয়ে যাওয়া জুম বেঁচে নেই। অল্প সমস্যাতেই বসত ভিটা কেড়ে নেওয়ার আশংকায় জীবন যাপন। মিথ্যা মামলার ভয়। সব মিলিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক সমস্যার কথা একশো বছর আগের জুম পাহাড়গুলিতে ধ্বনিত হয়। প্রতিধ্বনি হয়। প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে কষ্টের চিৎকার। শুধু একটু ভাল হয়ে বাচার প্রয়োজনে। একটা ভাঙ্গা মেরুদণ্ডকে কোথাও ঠ্যাস দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা হয়ে । কিন্তু আদৌ সেই জুম শতাব্দীর সুসময়গুলি গারো পাহাড়ে ফিরে আসবে কিনা তা কেউ জানেনা হয়তো।